RSS

জরুরি অবস্থার সময় মুচলেকা দেওয়া সংগঠনের কর্মীদের ‘লোকতন্ত্র সেনানী’ উপাধি

রাজ্য

জরুরি অবস্থার সময় আরএসএস মুচলেকা দিয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। সেই আরএসএস’র ৩২৫ জনকে ‘লোকতন্ত্র সেনানী' উপাধিতে ভূষিত করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার নবান্নে এই উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাদের মাসে ১০ হাজার টাকা ভাতা সহ অন্যান্য সুবিধার ঘোষণা করেন বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী। সরকার এই ক্ষেত্রে আরএসএস’র সংগঠন লোকতন্ত্র সেনানী সঙ্ঘের সহায়তা নিয়েছে বলেও জানিয়েছেন অধিকারী। 
অনুষ্ঠানে কমিউনিস্টদের সমালোচনা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু জরুরি অবস্থার সময় গ্রেপ্তার হওয়া হাজারও কমিউনিস্ট তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের কাছে কোনও মুচলেকা দেননি। কিন্তু সঙ্ঘ দিয়েছিল। ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ, পি সুন্দরাইয়া, একে গোপালন, প্রমোদ দাশগুপ্ত, জ্যোতির্ময় বসু সহ অনেক কমিউনিস্ট নেতা, কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ সহ সারা দেশে তিন হাজারের বেশি সিপিআই(এম) নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জরুরি অবস্থার আগেই পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭২ সালের প্রহসনের নির্বাচনের পর নামিয়ে আনা ‌‌আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস নামানো হয়। এই চরম দক্ষিণপন্থী অভিযানে সিপিআই(এম)’র ১১০০ নেতাকর্মী শহীদের মৃত্যুবরণ করেন। হাজার হাজার কর্মী এলাকাছাড়া, বাড়িছাড়া হতে বাধ্য হন।     
১৯৭৫ সালের ২৫ জুন দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। বিরোধী দলের নেতাদের তো বটেই, সাধারণ মানুষও বহু গ্রেপ্তার হন, কংগ্রেস থেকে মোহন ধারিয়া ও চন্দ্রশেখর পদত্যাগ করেন, তাঁরাও গ্রেপ্তার হন। পুনের ইয়ারওয়াদা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি ছিলেন আরএসএস প্রধান মধুকর দত্তাত্রেয় দেওরস ওরফে বালাসাহেব দেওরস। তার সাথে গ্রেপ্তার হয়ে একই জেলে ছিলেন মহারাষ্ট্রের আরএসএস সংগঠক ভি এন ভিদে। গ্রেপ্তারের ১৫ দিন বাদে ভিদে ১৫ জুলাই, ১৯৭৫ লিখলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই বি চ্যবনকে - “সঙ্ঘ এমনকী দূর থেকেও সরকার বা সমাজের বিরুদ্ধে দূর কিছু করেনি। সঙ্ঘের কর্মসূচিতে এ জাতীয় জিনিসের কোনও স্থান নেই। সঙ্ঘ কেবল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত রয়েছে। ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ তারিখে দিল্লির লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। দেওরস ভাবলেন এই সুযোগ। তিনি ইন্দিরার এই বক্তৃতার প্রশংসা করে তাঁকে একটি চিঠি লিখলেন - “সপ্রেম নমস্কার, ১৫ আগস্ট তারিখে দিল্লির লালকেল্লায় রাষ্ট্রকে সম্বোধন করে আপনি যে ভাষণ দিয়েছেন, তা আমি আকাশবাণীতে এই কারগার থেকে মন দিয়ে শুনেছি। আপনার ভাষণ সময়োচিত এবং উপযুক্ত তার এর জন্য এই চিঠি লিখতে আমি প্রবৃত্ত হয়েছি”। 
এই চিঠিতে তিনি লিখেছেন - “১৫ই আগস্টে আপনার ভাষণে 'এই কাজে সমাজের সাচ্চা শক্তিগুলিকে নিজের নিজের ক্ষেত্র নিয়ে লেগে পড়া চাই' বলে যে আহ্বান আপনি সমস্ত সমাজকে করেছেন তা সময়োচিতই ছিল”। দেশের উত্থানের জন্য ইন্দিরা গান্ধীর এই দেশ গড়ার আহ্বানে সঙ্ঘ যুক্ত হতে চায় সে কথাই লিখলেন দেওরস - “দেশের উত্থানের জন্য সঙ্ঘের এই শক্তিকে জোড়ার আয়োজন হওয়া জরুরি”। চিঠি শেষ করেছেন ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করতে চেয়ে - “আপনি চাইলে, আপনার সাথে দেখা করতে আমার আনন্দই হবে”। ১৯৭৫ সালের ১২ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল যে, ১৯৭১ সালে লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর জেতা অবৈধ ও বিচারপতি তাঁকে ৬ বছর কোনও সরকারি পদ নেওয়া থেকে বিরত করেন। ইন্দিরা গান্ধী সুপ্রিম কোর্টে যান। ২৪ জুন সুপ্রিম কোর্ট ইন্দিরা গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রিত্ব চালাতে অনুমতি দেয়, কিন্তু বাকি বিষয়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। এরপরে সুপ্রিম কোর্টে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে বিষয়টি যায়। এই বেঞ্চ ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনে জেতাকে বৈধ ঘোষণা করে। সুযোগ পেয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি লিখতে বসলেন দেওরস। চিঠি পোস্ট হলো ১০ নভেম্বর, ১৯৭৫ - "সাদর নমস্কার, উচ্চতম আদালতের পাঁচ বিচারপতি আপনার নির্বাচনকে বৈধ ঘোষণা করেছেন বলে আপনাকে হার্দিক অভিনন্দন”। তিনি লিখলেন - "শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের প্রসঙ্গে সঙ্ঘের নাম নেওয়া হচ্ছে - এই আন্দোলনের সাথে সঙ্ঘের কোনও সম্পর্ক নেই... “আমার আপনার কাছে প্রার্থনা যে আপনি প্রকৃত পরিস্থিতি জানুন... সঙ্ঘের সম্বন্ধে সঠিক ধারণা বানান... সঙ্ঘের কয়েক হাজার লোককে মুক্তি দিন।... এটা করলে সঙ্ঘের লাখ লাখ স্বয়ংসেবকের নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার শক্তি সরকারি এবং বেসরকারি পথে রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য কাজে লাগবে ও আমাদের সকলের ইচ্ছা অনুসারে আপনার দেশ সমৃদ্ধ হবে। পত্রের উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।”এরপরে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী চ্যবনকে ২২ ডিসেম্বর, ১৯৭৫ লিখলেন দেওরস - "আমি দুটি চিঠি লিখেছি প্রধানমন্ত্রীকে। ...চিঠিগুলি দিল্লিতে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।... প্রধানমন্ত্রীর মনে আরএসএস সম্বন্ধে ভুল বোঝাবুঝি আছে। এটা দূর করা প্রয়োজন।... আমি তাই প্রধানমন্ত্রীর আরএসএস সম্বন্ধে ভুল ধারণা দূর করার জন্য উদ্যোগ নিতে ও চেষ্টা করতে এবং এইভাবে এর শক্তিকে নানা গঠনমূলক কাজে সহজে ব্যবহার করতে আপনাকে অনুরোধ জানাতে চাই"। ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা ঘোষণার সাথে ২০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, এই সমস্ত কর্মসূচিতেই যে আরএসএস কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়, তার ইঙ্গিত ছিল দেওরসের বিনোবা ভাবে-কে লেখা পরের চিঠিতে— ‘‘আমার আপনার কাছে প্রার্থনা যে আপনি দয়া করে সঙ্ঘ সম্বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর যে ভুল ধারণা আছে তা দূর করতে প্রয়াস নিন, আর যার ফলস্বরূপ সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা কারাগার থেকে মুক্ত হোক, সঙ্ঘের উপর নিষেধাজ্ঞা উঠুক আর এইরকম একটা পরিস্থিতি হোক, যাতে আজ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশে যে সর্বক্ষেত্রে উন্নতির পরিকল্পনা চলছে, তাতে সঙ্ঘ ও সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা যোগদান করতে পারে’’ 
এমন সংগঠনের নেতারা জরুরী অবস্থা জারির বিরুদ্ধে কোনও লড়াই করেননি তা সহজেই বোঝা যায়। 
তবু সেই সংগঠনের কর্মীদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। 
এদিনের অনুষ্ঠানে শিল্প মন্ত্রী, প্রাক্তন কংগ্রেসী তাপস রায়ও উপস্থিত ছিলেন। জরুরি অবস্থার সময় ওই ৩২৫ জন জেল খেটেছিলেন বলে জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এই ‘লোকতন্ত্র সেনানী’দের হাতে তাম্রপদক ও সম্মানসূচক শংসাপত্র তুলে দেন। 
সুবিধাগুলোর ঘোষণা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী অধিকারী বলেন, সম্মানিত ৩২৫ জনকে মাসিক ১০,০০০ টাকা সম্মান হিসাবে দেওয়া হবে। এছাড়া সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য তাদের ১,০০০ টাকা সহায়তা দেওয়া হবে এবং তারা সরকারি বাসে বিনামূল্যে ভ্রমণের অধিকার পাবেন। যদি কোনও স্বীকৃত লোকতন্ত্র সেনানীর মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী এই সুবিধাগুলো পাবেন বলেও মুখ্যমন্ত্রী জানান।
১৯৭৫ সালের ২৫ জুন জারি হওয়া জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ টেনে অধিকারী বলেন, ওই সময়ে দেশজুড়ে প্রায় এক লাখ মানুষকে জেলে রাখা হয়েছিল, তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকেই প্রায় ৫ হাজার জন। প্রসঙ্গত, লোকতন্ত্র সেনানী সঙ্ঘের ওয়েবসাইটে পশ্চিমবঙ্গে জেলে থাকা তাদের কোনও কর্মীর নামই নেই। মুখ্যমন্ত্রী লোকতন্ত্র সেনানী সঙ্ঘ-র দীর্ঘদিনের দাবি-আন্দোলনের প্রশংসা করে বলেন, রাজ্য সরকার ভবিষ্যতে তাদের গঠনমূলক পরামর্শও স্বাগত জানাবে।
 

Comments :0

Login to leave a comment