ভোটার তালিকায় অনিয়ম ও ‘ভোট চুরি’র অভিযোগকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধী মঞ্চ ইন্ডিয়া। তবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) বন্ধ করা এবং ব্যালট পেপারে ভোট ফেরানোর দাবিতে বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে অনিহা প্রকাশ করলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। তার বক্তব্য, বিষয়টি ইতিমধ্যেই বিচারাধীন। তাই স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পরিবর্তে বিরোধীদের আদালতে আবেদন জানানো উচিত।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করার জন্য চিঠি লিখেছিলেন। বিকেল ৪টে থেকে ৫টার মধ্যে বৈঠকের সময় চেয়ে তারা ‘ভোট চুরি’ বন্ধ করা, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং কাগজের ব্যালট ফিরিয়ে আনার দাবিতে স্মারকলিপি জমা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়নি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ৩৩তম প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, সুপ্রিম কোর্টের দরজা সকলের জন্য খোলা। যে কোনও সাধারণ নাগরিক কিংবা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আদালতে আবেদন জানাতে পারেন। প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার অধিকার রয়েছে। আইন অনুযায়ী তাদের বক্তব্য শোনা হবে এবং প্রাপ্য প্রতিকার দেওয়া হবে।
সূত্রের খবর, বৈঠকের আবেদন প্রত্যাখ্যান করার কারণ জানিয়ে বিরোধী নেতাদের ই-মেল মারফত বিস্তারিত উত্তর পাঠানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং তার প্রতিনিধিদলের উত্থাপিত বিষয়গুলি প্রশাসনিক পথে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পরিবর্তে বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিবেচনা করা উপযুক্ত।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও জোরদার করতে সোমবার সুপ্রিম কোর্টের দিকে পদযাত্রার ডাক দিয়েছে বিরোধীরা। কংগ্রেসের তরফে এই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘চলো দিল্লি—মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে দিল্লির কনট প্লেস ও বারাখাম্বা রোডের সংযোগস্থলে জমায়েত হওয়ার কথা আন্দোলনকারীদের।
সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাহুল গান্ধী। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, দল, লিঙ্গ, জাতপাত, সম্প্রদায় ও রাজ্যের বিভেদ অতিক্রম করে ভারতীয় হিসেবে এই পদযাত্রায় অংশ নেওয়া হবে।
রাহুলের অভিযোগ, শনিবার দিল্লিতে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমেছিলেন দেশের তরুণরা। তাদের মনে ঘৃণা বা ক্ষোভ নয়, বরং ভালোবাসা ছিল। কিন্তু পুলিশ এবং বিজেপির কর্মীদের হাতে তাদের মারধরের শিকার হতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রাহুলের বক্তব্য, তারা এমন ভারত চান না।
তিনি আরও জানান, যুবসমাজ, বিরোধী রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের সংগঠন এবং সংবিধান ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষ এই পদযাত্রায় অংশ নেবেন।
শনিবারের পুলিশি পদক্ষেপের প্রসঙ্গ তুলে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। রবিবার বেঙ্গালুরুতে তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দেশের পরিস্থিতি অস্থির করে তুলেছেন। দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের আটক করা এবং বিপুল সংখ্যায় নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের ঘটনাকে যুব সমাজের আন্দোলনের প্রতি সরকারের ভয়ের প্রতিফলন বলে দাবি করেন তিনি।
খাড়গের বক্তব্য, শনিবার দিল্লিতে প্রায় ৩২ হাজার পুলিশকর্মী এবং ৭,৫০০ সিআরপিএফ জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছিল। তার অভিযোগ, এই বিপুল নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে সরকার যুবসমাজের আন্দোলনকে ভয় পাচ্ছে এবং দেশে শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্রের চর্চা চলুক, তা চায় না।
গণতন্ত্র এবং মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন খাড়গে।
এর আগে শুক্রবার সংসদ থেকে বিজয় চক পর্যন্ত পদযাত্রা করেন ইন্ডিয়ার বিভিন্ন দলের নেতারা। পরে তারা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন। জুন মাসেও রাহুল গান্ধী ও খাড়গে-সহ বিরোধী নেতারা প্রধান বিচারপতিকে চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে ডিএমকে এবং আম আদমি পার্টিও স্বাক্ষর করেছিল।
ওই চিঠিতে এসআইআর প্রক্রিয়াকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিরোধী জোট। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হচ্ছে এবং একাধিক ক্ষেত্রে নির্বাচনের ফলাফল জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না।
বিরোধীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। যথাযথ নোটিশ ছাড়াই বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম ইচ্ছামতো বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। মৃত, পরিযায়ী ও একাধিকবার তালিকাভুক্ত ভোটারদের শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু হলেও বাস্তবে তা স্বচ্ছতা বজায় রেখে পরিচালিত হয়নি বলে দাবি বিরোধীদের।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে ঘিরেও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতবিরোধের ঘটনা ঘটেছে। এসআইআর-সহ একাধিক বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশি আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে এসআইআর-বিরোধী আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নিয়েছে ইন্ডিয়া। গত সপ্তাহেই এই ইস্যুতে যৌথ কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছে বিরোধীরা। তার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন জনসভা, পদযাত্রা এবং ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচি।
ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে বিরোধীদের এই আন্দোলন আগামী দিনে কোন পথে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
CJI
‘সুপ্রিম কোর্টের দরজা সবার জন্য খোলা’, ভোট চুরির অভিযোগে বিরোধীদের স্মারকলিপি নিতে অস্বীকার প্রধান বিচারপতির
×
Comments :0