তথ্য যাচাই করতে নেমে কৃষক বন্ধুতে ২৩ লক্ষাধিক নথিভুক্ত কৃষকের কোনও হদিশ পাচ্ছে না কৃষি দপ্তর!
রাজ্যের কৃষি দপ্তর কৃষকবন্ধু প্রকল্পের উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই করতে শুরু করে। গত আগস্ট মাস থেকে আবেদনপত্র নিয়ে কৃষকদের বাড়ি, বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার পর তা ব্লক অফিসে ফেরত আসার কথা। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রায় ২৩ লক্ষ ৭৯ হাজার নথিভুক্ত কৃষকবন্ধু প্রকল্পের উপভোক্তা কৃষকদের কাছ থেকে কোনও আবেদন আসেনি। ফলে তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে আগামী ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। তারমধ্যে কৃষকবন্ধু প্রকল্পের নথিভুক্ত কৃষকদের আবেদন পূরণ করে ব্লক অফিসে কৃষি দপ্তরের আধিকারিকের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।
কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে ১ কোটি ১০ লক্ষ ৯ হাজার ৫৭১ জন কৃষক সরকারের কৃষকবন্ধু আর্থিক অনুদান প্রকল্পে নথিভুক্ত ছিলেন। তারমধ্যে ৩৮ লক্ষ কৃষক ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী কৃষক সম্মান নিধি প্রকল্পে যোগ্য হিসাবে বিবেচিত হয়েছেন। ফলে কৃষকবন্ধু প্রকল্পে যুক্ত প্রায় ৭১ লক্ষ কৃষকের তথ্য যাচাই করার পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। ৭১ লক্ষ ৫৪ হাজার কৃষকের মধ্যে সরকারের কাছে যোগ্য বিবেচনার জন্য কতজন আবেদন করেছেন?
কৃষি দপ্তরের এক শীর্ষ আধিকারিকের কথায়, ‘‘ কৃষকবন্ধুতে নথিভুক্ত কৃষকদের মধ্যে ৪৭ লক্ষ ৭৪ হাজার পুনবৈধকরণের জন্য আবেদন করেছেন। তাদের মধ্যে ৪২ লক্ষাধিক আবেদনকারীকে দপ্তরের পোর্টালে আপলোড করার পর ৩৯ লক্ষ কৃষককে যোগ্য হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’’ যাচাই পর্বেই ২ লক্ষ ৯৮ হাজার কৃষকবন্ধুর উপভোক্তা ছাঁটাই হয়ে গেছে।
কিন্তু ৭১ লক্ষ উপভোক্তার তথ্য যাচাই করতে নেমে এখনও পর্যন্ত ৪৭ লক্ষ আবেদন জমা করেছেন। ফলে প্রায় ২৩ লক্ষ ৭৯ হাজার কৃষক এখনও সরকারের দেওয়া আবেদন পূরণ না করার জন্য সময় বাড়াতে হয়েছে। ২৩ লক্ষাধিক কৃষকবন্ধুতে নথিভুক্তির পরও কেন তথ্য যাচাই করতে আসছেন না, তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আধিকারিকরা বলেছেন,‘‘ অতীতে পরিবারের একাধিক সদস্য এই প্রকল্পে সুবিধা পেয়ে এসেছে। এমনকি কৃষক না হয়েও গ্রামে জমি থাকার সুবিধা নিয়ে আর্থিক অনুদান নিয়ে গেছে বহু মানুষ। এখন তারা অনাগ্রহ দেখিয়ে আবেদন পূরণ করছে না।’’ ২০১৯ সালে প্রথমবার এ রাজ্যে কৃষকবন্ধু প্রকল্প চালু করেছিল রাজ্য সরকার। পরবর্তীকালে ২০২১ সালে রাজ্যে কৃষকবন্ধু (নতুন) নাম দিয়ে প্রকল্পে অনুদানের পরিমাণ দ্বিগুণ করে দেওয়া হয়েছিল। এক একর বা তার বেশি জমি থাকলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হতো। রবি ও খরিফ মরশুমে দুই কিস্তিতে টাকা পেতেন কৃষকরা। ন্যূনতম চার হাজার টাকা বছরে পাওয়ার সংস্থান ছিল কৃষকবন্ধু প্রকল্পে। বিগত সরকারের আমলে চালু হওয়ার পর থেকে কৃষকবন্ধু প্রকল্পে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা রাজ্যে খরচ হয়েছে।
রাজ্যে ক্ষমতায় আসার প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে রাজ্য সরকার। একই সঙ্গে বিগত সরকারের আমলে কৃষকবন্ধু (নতুন) প্রকল্পকেও চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্যের কৃষি দপ্তর। তবে কৃষকবন্ধু প্রকল্পে এতদিন সর্বনিম্ন চার হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা দু’দফায় সহায়তা পেতেন নথিভুক্ত কৃষকরা। এবার সেই আর্থিক সহায়তা সর্বোচ্চ ১০ হাজার থেকে কমিয়ে ৬ হাজার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে অতীতে এক পরিবারের একাধিক ব্যক্তি কৃষকবন্ধু প্রকল্পের আর্থিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকার পরিবারকেই ভিত্তি করে কৃষকবন্ধু চালু করতে চলেছে। ফলে অতীতে এক পরিবারের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের আলাদা করে আর্থিক সহায়তা বন্ধ হতে চলেছে।
সোমবার নবান্নে রাজ্যের কৃষি মন্ত্রী দুধকুমার মণ্ডল একটি সাংবাদিক বৈঠক করেন। সেখানেই কৃষি মন্ত্রী জানান,‘‘ এতদিন সরকারি কর্মচারীও কৃষি জমির কাগজ দেখিয়ে কৃষকবন্ধু প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা নিতেন। এখন সরকার ঠিক করেছে, ইনকাম ট্যাক্স দেওয়া ব্যক্তি থেকে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের জন্য কৃষকবন্ধু প্রকল্প বন্ধ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি প্রকল্পের মতোই কৃষকবন্ধু প্রকল্পেও পরিবারকেই আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।’’ প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি প্রকল্পে তিন দফায় ৬ হাজার টাকা উপভোক্তারা পেয়ে থাকেন। রাজ্য সরকার অতিরিক্ত আরও তিন হাজার টাকা প্রতিটি বাড়তি সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কৃষকবন্ধু প্রকল্পে নথিভুক্ত – ১ কোটি ১০ লক্ষ
প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি- ৩৮ লক্ষ
তথ্য যাচাই প্রয়োজন- ৭১ লক্ষ
আবেদন করেছেন- ৪৭ লক্ষ কৃষক
হদিশ নেই- ২৩ লক্ষ ৭৯ হাজার
Comments :0