বই
মুক্তধারা
তথ্য এবং যুক্তির আয়নায় মরিচঝাঁপি পর্ব
অর্ণব ভট্টাচার্য
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বর্ষ ৩
মরিচঝাঁপি পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত সুন্দরবনের এক প্রত্যন্ত দ্বীপ যার সাথে জড়িয়ে আছে উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের এক বিতর্কিত অধ্যায়। এখনো পর্যন্ত মরিচঝাঁপিতে উদ্বাস্তু আগমন এবং তার সাথে সম্পর্কিত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে যে সকল লেখা প্রকাশিত হয়েছে তার অধিকাংশই তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের তীব্র সমালোচনায় মুখর এবং একপেশে। এই সমস্ত বইগুলিতে মরিচঝাঁপি দ্বীপে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন নিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের নীতিকে অতীতের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং উদ্বাস্তুদের স্বার্থের পরিপন্থী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।আর এই কাজ করতে গিয়ে মিথ্যে এবং তথ্য বিকৃতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বারেবারে। অথচ পশ্চিমবঙ্গে দেশভাগের পর উদ্বাস্তু আগমন, উদ্বাস্তুদের অধিকার রক্ষার জন্য বামপন্থীদের লড়াই, দণ্ডকারণ্যে উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন এবং সেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসা ও ফিরে যাওয়া- এই ঘটনাপ্রবাহকে যদি বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে যে বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি কতটা সারবত্তাহীন। নিছক রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য অসহায় উদ্বাস্তুদের কিভাবে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল মরিচঝাঁপি পর্ব তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সেই নিরিখে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক হরিলাল নাথের লেখা "মরিচঝাঁপি:কি ঘটেছিল?" বইটি তথ্য এবং যুক্তির আয়নায় মরিচঝাঁপি পর্বকে তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস।
১৯৭৮ সালে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মানুষের প্রচার ও প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হয়ে দণ্ডকারণ্য থেকে লক্ষাধিক বাস্তুহারা পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। পশ্চিমবঙ্গে তখন ৮০ লক্ষ বাস্তুহারা রয়েছেন যাঁদের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই সদ্য নির্বাচিত বামফ্রন্ট সরকারের অগ্রাধিকার ছিল রাজ্যে বসবাসকারী উদ্বাস্তুদের সুষ্ঠু পুনর্বাসন। এই সময় দণ্ডকারণ্য থেকে লক্ষাধিক উদ্বাস্তু এসে পড়ায় যে সমস্যার সৃষ্টি হয় তা দণ্ডকারণ্য থেকে চলে আসা বাস্তুহারা জনতার কাছে ব্যাখ্যা করে তৎকালীন রাজ্য সরকার। তাদের কাছে আবেদন রাখা হয় যাতে তারা দণ্ডকারণ্যে ফিরে যান। ইতিমধ্যে পশ্চিমবাংলার সরকার দণ্ডকারণ্য কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলায় উদ্বাস্তুদের স্বার্থে সেখানে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।অধিকাংশ উদ্বাস্তু রাজ্য সরকারের সীমাবদ্ধতার কথা উপলব্ধি করে এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে পুনরায় দণ্ডকারণ্যে ফিরে যান।কিন্তু দণ্ডকারণ্য থেকে যে উদ্বাস্তু উন্নয়নশীল সমিতির নেতৃত্ব পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে পুনর্বাসনের মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়ে এই বিপুলসংখ্যক বাস্তুহারাকে পশ্চিমবাংলায় নিয়ে এসেছিলেন তারা অত সহজে হাল ছাড়তে রাজি ছিলেন না। তাই অধিকাংশ বাস্তুহারা আবার দণ্ডকারণ্যে ফিরে গেলেও কয়েক হাজার বাস্তহারাকে নিয়ে সুন্দর বনের গভীরে তারা মরিচঝাঁপি দ্বীপে বসতি স্থাপন করেন। রাজ্যের সরকারের পক্ষ থেকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে মরিচঝাঁপি পুনর্বাসনের জন্য অনুপযুক্ত এবং তা সংরক্ষিত বনাঞ্চল। কিন্তু উদ্বাস্তু উন্নয়নশীল সমিতির নেতৃত্ব এই সমস্ত কথা শুনতে রাজি ছিলেন না এবং তারা মরিচঝাঁপি দ্বীপে প্রশাসনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেন। কোনও রাজ্য সরকার রাজ্যের বুকে সমান্তরাল প্রশাসন চলতে দিতে পারেনা। তবু বামফ্রন্ট সরকার এবং মূলত উদ্বাস্তুদের কাছে আবেদনের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। বাস্তুহারাদের বৃহত্তম সংগঠন সংযুক্ত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদ (ইউসিআরসি)-র পক্ষ থেকেও দণ্ডকারণ্য ফেরত উদ্বাস্তুদের পুনরায় দণ্ডকারণ্য ফিরে গিয়ে পুনর্বাসনের অধিকার বুঝে নেওয়ার আবেদন করা হয়।অন্যদিকে উদ্বাস্তু উন্নয়নশীল সমিতির নেতৃত্ব মরিচঝাঁপিকে কেন্দ্র করে সরকারের সাথে সংঘাতের পথ বেছে নেন। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এবং জনতা পার্টির নেতৃত্ব এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি করে এবং ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত হয়। প্ররোচিত উদ্বাস্তুদের একাংশ কুমিরমারিতে অবস্থিত পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করলে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। দুজন স্থানীয় অধিবাসী মারা যান। এই দুঃখজনক ঘটনাকেই পরবর্তীকালে গণহত্যা বলে প্রচার করা হয়েছে। মরিচঝাঁপির বাসিন্দাদের সাথে বামপন্থীদের কোনো বৈরিতামূলক সম্পর্ক ছিলনা।ঐ বিপদসংকুল দ্বীপে বসবাস করার সমস্যা নিয়ে তাদের অবহিত করানোর কাজ তাই চলতে থাকে। শেষপর্যন্ত ১৯৭৯সালের মে মাসে প্রশাসনিক উদ্যোগে ঐ দ্বীপের বাসিন্দারা দণ্ডকারণ্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
"মরিচঝাঁপি:আসলে কি ঘটেছিল?" বইটিতে এই সমস্ত ঘটনাবলিকে আঠারোটি পর্বে বিভক্ত করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যাবতীয় মনগড়া কাহিনি ও কুৎসাকে লেখক বলিষ্ঠ যুক্তি ও তথ্য দিয়ে খন্ডন করেছেন। মরিচঝাঁপি নিয়ে যারা প্রকৃত তথ্য জানতে আগ্রহী তাদের এই বইটি চিন্তার খোরাক যোগাবে এবং বিভ্রান্তি কাটাতে সহায়তা করবে।
মরিচঝাঁপি : আসলে কি ঘটেছিল?
হরিলাল নাথ। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি। ১২এ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট।কলকাতা-৭০০ ০৭৩। ১৩০ টাকা।
Comments :0