বই
মুক্তধারা
বিগত যুগের প্রতিধ্বনি — বাস্টিডের কলকাতা
দেবাশিস ভট্টাচার্য
যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ বই পড়ার সময় তার ভূমিকা খুঁটিয়ে পড়া জরুরি। যদিও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভূমিকা হয় নীরস। অবশ্য, এমন গ্রন্থও থাকে যার ভূমিকা একাধারে রসত্তীর্ণ, অন্যধারে আকাদেমিয়ার আগ্রহের কারণ হয়। বাস্টিডের ‘ইকোজ ফ্রম ওল্ড ক্যালকাটা’ এমনই এক গ্রন্থ।
লেখক নিজে গ্রন্থের মূল অংশে লিখেছেন, ‘এমন এক অতীতের স্মৃতিচারণ, যা কিনা কোনোভাবেই ক্লান্তিকর নয়, তা মানুষকে নির্মল আনন্দ দিতে পারে।’ যদিও, ঔপনিবেশিক যুগের বিষয়, লেখকও ঔপনিবেশিক শাসকের শ্রেণির ও পক্ষের লোক, তবুও বক্তব্যের বিরোধিতা করা মুশকিল। নিজে পেশাদার ইতিহাসবিদ না হয়েও তিনি প্রকৃত অর্থে নির্মোহ বিশ্লেষণ করেছেন। খুঁটিয়ে দেখেছেন সম্ভাব্য সবরকমের প্রাথমিক সূত্র হিসাবে বিবেচিত হওয়া দলিল-দস্তাবেজ ও চিঠিপত্র।
অষ্টাদশ শতকের কলকাতা ছিল এমন এক শহর, যেখানে পরবর্তী দু’দশকব্যাপী ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি স্থাপনাকারীরা ছিলেন অস্থায়ী বাসিন্দা। যাঁদের পদচিহ্নগুলি মুছে গেছে। কিন্তু, তাদের যৌবন উচ্চাকাঙ্ক্ষার উর্ধ্বগতিতে এক এশীয় মঞ্চে হেঁটেছিল এবং তারপর অবসর নিয়েছিল। সম্ভবত বড় খ্যাতি অর্জন বা অন্য কোথাও একটি বিস্তৃত মঞ্চে নিজেদের চিত্রিত করতে চেয়েছিল তারা। লেখক এর পাতায় রোম্যান্স এবং অনুপ্রেরণা খুঁজেছিলেন। কারণ, বাংলায় ব্রিটিশ রাজত্বের প্রাথমিক দিনগুলির সঙ্গে বিখ্যাত পুরুষ এবং মহিলাদের ভাগ্য জড়িত ছিল।
উনিশ শতকের শেষভাগে প্রকাশিত বইটিতে ফোর্ট উইলিয়ামের প্রতিষ্ঠা, কলকাতার কুখ্যাত ‘ব্ল্যাক হোল’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি আলোচনা করেছেন। প্রাথমিক উৎস, উপাখ্যান এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির মিশ্রণের মাধ্যমে এর ঐতিহাসিক বাস্তবতা খুঁজেছেন।
বাস্টিড, ওয়ারেন হেস্টিংস, ফিলিপ ফ্রান্সিস, মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি, হেস্টিংস-ফ্রান্সিস ডুয়েল, এলাইজা ইম্পে, মাদাম গ্র্যান্ড এবং অন্যান্য ব্রিটিশ কুশীলবদের নির্মোহ আখ্যান তুলে ধরেছেন। হলওয়েল, প্রিন্সেস টালেরাঁ কেউই তাঁর নজর থেকে বাদ যাননি।
বইটি প্রারম্ভিক ঔপনিবেশিক কলকাতার সামাজিক জীবন চিত্র, বিস্তৃত ইউরোপীয় জীবনধারা এবং স্থাপত্য থেকে শুরু করে ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় ভারতীয় অভিজাতদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া পর্যন্ত আলোচনা করেছে। ঔপনিবেশিকতার জটিলতা এবং ঔপনিবেশিক শাসকের মধ্যে অসম গতিশীলতা স্বীকার করে লেখক স্থানীয় বাঙালি সমাজে ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রভাবকে স্পর্শ করেছেন।
ঔপনিবেশিক ভারতীয় ইতিহাস, বিশেষ করে কলকাতার প্রাথমিক বিকাশে আগ্রহীদের জন্য ‘সেকালের কলকাতার প্রতিধ্বনি’ একটি মূল্যবান সম্পদ। পাঠকদের উচিত ঔপনিবেশিক মানসিকতার বোঝার সঙ্গে এটি পাঠ করা।
হেনরি এমস্লে বাস্টিডের জন্ম ১৮৩৩ সালে। পেশায় সার্জন বাস্টিড, ১৮৫৫ সালে এমআরসিএস পাশ সহকারী সার্জন পদে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিসে যোগ দেন। সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে তিনি অশ্বারোহীবাহিনীতে ছিলেন। এরপর কাডালুরে সিভিল সার্জন পদে যোগ দেন। ১৮৬৫ সালে মাদ্রাজের টাঁকশালে যোগ দেন। তাঁর বাকি কর্মজীবন টাঁকশালেই কেটেছে। ১৮৭০ সালে তিনি কলকাতায় আসেন। মাঝেমধ্যে তাঁকে টাঁকশালের সর্বময় কর্তার ভূমিকাও পালন করতে হতো। ১৮৮৬ সালের ১ জুন তিনি কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯১২ সালে বাস্টিডের মৃত্যু হয়। লেখকের রচনার পরতে পরতে রয়েছে ‘উপযোগিতাবাদী’ দর্শনের ছাপ।
অনুবাদক তরুণ লেখক। যদিও, একাধিক মৌলিক ও অনুবাদের অভিজ্ঞতা তাঁর আছে। এই অতিকায় গ্রন্থ তিনি অনুবাদ করেছেন, শুধু এই কারণেই তাঁকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ। এমনকি, গ্রন্থের টিকা অনুবাদ করার ক্ষেত্রেও তিনি যথেষ্ট মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।
তবে, অনুবাদ কোথাও কোথাও দুর্বোধ্য। এর কারণ, উনিশ শতকের ব্রিটিশ রাজকর্মচারীর ইংরেজি বাক্য গঠন। এক্ষেত্রে নজর দেওয়া উচিত ছিল। তাছাড়া, মূল লেখক ব্রিটিশ বলে অনেক সময় ভারতীয় বা এশীয় নামগুলোর ইংরেজি বানান অন্যরকম। অনুবাদক সেই বানানবিধি অনুসরণ না করলেই ভালো করতেন। এছাড়া অনুবাদকের নিজস্ব টিকা থাকলে ভালো হতো। সব পাঠক উনিশ শতকের কলকাতা, ব্রিটিশ অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ইউরোপের অষ্টাদশ-উনিশ শতকীয় রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়।
সবশেষে, আলাদা প্রশংসা করতেই হয় সে যুগের কবিতা, কবরে লেখা খণ্ডকাব্যের অনুবাদকে।
সেকালের কলকাতার প্রতিধ্বনী
হেনরি এমস্লে বাস্টিড। অনুবাদ: দীপ্তজিৎ মিশ্র
অরণ্যমন প্রকাশনী। ৭৫০ টাকা।
Comments :0