মোদীর ‘ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায়’ আমেরিকা থেকে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বহু পরিযায়ী শ্রমিককে দেশছাড়া করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মঙ্গলবার ৩৬ জন বাংলাদেশি নাগরিককে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠালো আমেরিকার সরকার। বাংলাদেশের স্থানীয় সময় এদিন দুপুর ১২টা নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সামরিক বিমানে ঢাকার ৩৬ জন বাংলাদেশি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
এই ৩৬ জনের মধ্যে নোয়াখালী জেলার ২১ জন, লক্ষ্মীপুর জেলার ২ জন এবং মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা, লালমনিরহাট, শরীয়তপুর, বরগুনা, ফেনী, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও নেত্রকোনা জেলার একজন করে রয়েছেন।
দ্বিতীয় বাার ক্ষমতায় এসেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি থেকে আমেরিকায় আসা অন্তত ১ কোটি ‘অবৈধ’ অভিবাসীকে দেশছাড়া করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। ইতিমধ্যে ভারত থেকে আসা প্রায় ২০ হাজার ‘অবৈধ অভিবাসীকে’ ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী দফায়, আমেরিকায় বসবাসকারী আরও প্রায় সাড়ে ৭ লক্ষ ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিযায়ী শ্রমিককে চিহ্নিত করে ‘দেশছাড়া’ করার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। এই নিয়ে ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশীর সংখ্যা ২৯৩ জনে দাঁড়ালো।
বাংলাদেশ ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, এদিন দুপুর বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও এভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) সহায়তায় ব্র্যাকের পক্ষ থেকে ফেরত আসা কর্মীদের পরিবহনসহ জরুরি সহায়তা প্রদান করা হয়। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অধিকাংশই প্রথমে একটি সংস্থার ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অবৈধ পথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। সেখানে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করলেও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন প্রশাসন। ফেরত আসা নোয়াখালীর জাহিদুল ইসলাম জানান, দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আশায় তিনি দালালদের হাতে তুলে দেন প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা। গাজীপুরের সুলতানা আক্তার জানান, ব্রাজিল হয়ে মেক্সিকো সীমান্ত পার হতে দালালদের দেন ৩০ লক্ষ টাকা। কিন্তু সব অর্থ বৃথা গেল। এ ছাড়া নোয়াখালীর মীর হাসান ৫৫ লক্ষ, রিয়াদুল ইসলাম ৫০ লক্ষ ও রাকিব ৬০ লক্ষ টাকা খরচ করেও শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে হয়েছে ব্যর্থতার বোঝা কাঁধে নিয়ে।
শরিফুল হাসান বলেন, গত কয়েক দফায় যারা ফেরত এসেছেন তাদের অনেকেই প্রথমে ব্রাজিল গিয়ে সেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যান। প্রশ্ন হলো সরকার যখন ব্রাজিলে বৈধভাবে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দেয়, তখন তারা সত্যিই ব্রাজিলে কাজ করতে যাচ্ছেন নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছেন সেটি খতিয়ে দেখা উচিত। এই যে একেকজন জমি, গয়না বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে ৪০ থেকে ৫৫ লক্ষ টাকা খরচ করে শূন্য হাতে ফিরে আসছেন তার দায় কার? যেসব এজেন্সি এ কর্মীদের পাঠিয়েছে এবং যারা এ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।
পরিযায়ী শ্রমিকদের দেশছাড়া করার বিষয়ে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পরেই বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিওর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হয়েছে। তাতে নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছে ভারতের দেশের বিদেশ মন্ত্রক থেকে শুরু করে খোদ নরেন্দ্র মোদীও। এই বিষয়ে ট্রাম্প একাধিক বার সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন, ‘‘বেআইনি অভিবাসীদের দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে মোদী সমর্থন জানিয়েছেন। উনি একজন বিচক্ষণ মানুষ। এই বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের ঘনিষ্ঠ ভাবে সহযোগিতা করছেন। অভিবাসন দমন করতে আমেরিকার দক্ষিণে মেক্সিকো সীমান্তে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। ভারতের আগে লাতিন আমেরিকার পেরু, গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাসের থেকে আসা অভিবাসীদেরও ফেরত পাঠানো হয়েছে। আগে আমেরিকায় ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসাবে যাদের চিহ্নিত করা হতো, তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজেদের ‘বৈধতা’ প্রমাণ করতে না পারলে মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক বিভাগের পরিচালিত সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানে তাদের প্রত্যর্পণ করা হতো। ট্রাম্পের শাসনকালে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের গোটা দায়িত্ব সেনা বাহিনীকে দেওয়ায় যুদ্ধ বিমানে করে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানের তুলনায় তা অনেক বেশি খরচ সাপেক্ষ বলে জানা গেছে।
Illegal Immigration
৩৬ বাংলাদেশি পরিযায়ী শ্রমিককে ‘দেশছাড়া’ করল ট্রাম্প
×
Comments :0