বই
মুক্তধারা
উত্তমকুমার : ফ্লপ মাস্টার থেকে মহানায়ক
সঞ্চিতা সান্যাল
এই বছর উত্তমকুমারেরও জন্মশতবর্ষ। পঁয়তাল্লিশ বছর হয়ে গেছে তিনি নেই। কিন্তু অবাক লাগে ভাবলে, এক অভিনেতার ত্রিশ বছরের অভিনয় জীবন পঁয়তাল্লিশ বছর পরেও আলোচিত হয়। কেন হয়? উত্তমকুমারের স্মরণসভায় সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, উত্তম হলিউডের ব্যাকরণ মেনে আক্ষরিক অর্থেই তারকা। তাঁর প্রশ্ন ছিল, উত্তম কি অভিনেতা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন? সত্যজিৎ নিজেই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে গ্রেগরি পেকের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। বলেছিলেন, স্টারডামের তলায় পেকের অভিনয় ক্ষমতা চাপা পড়ে গেছিল। কিন্তু উত্তম তারকা হয়েও অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ‘নায়ক’ সিনেমায় সত্যজিতের কথা মেনে বসন্তের দাগ ঢাকতে মেকআপ করেননি। অভিনয়ের দক্ষতায় সব নেতি ঢাকা পড়তো তাঁর। সত্যজিৎ স্বীকার করেছিলেন, চরিত্রের গভীরে ঢুকে চরিত্র হয়ে উঠতে পারতেন উত্তম। নিজেকে একজন অভিনেতা করে গড়ে তুলতে সাঁতার, বক্সিং, কুস্তি, বিদেশি খেয়ায় নাচ, ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, পাশ্চাত্য উচ্চারণে ইংরেজি বলা, এমনকি রীতিমতো মাস্টার রেখে হিন্দি ও উর্দু শিখেছিলেন। শিখেছিলেন সন্তোষ সিংহের কাছে থেকে মুখের পেশি নাড়াচাড়া করে একুশ রকমের এক্সপ্রেশন। নিজের অভিনয় প্রতিভার বিকাশের জন্য নিয়মিত হলিউডের সিনেমা দেখতেন। উত্তম কুমার জীবনের প্রথম পর্বে পরপর ফ্লপ ছবি উপহার দিয়ে ফ্লপমাস্টার জেনারেল তকমা পিঠে এঁটেও হয়ে উঠলেন বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির অধিপতি! উত্তমকুমারের অভিনয় জীবনের এই যাত্রাটির একটি অসাধারণ ছবি এঁকেছেন লেখক। উত্তমের জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁকে মনে পড়ে আরও বেশি করে যখন আমরা দেখি এই ঘৃণাপ্রবণ সময়ে তাঁর অভিনীত সপ্তপদী কিংবা অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি!
উত্তমকুমারকে নিয়ে প্রায় ৪৯৫ পৃষ্ঠার একটি তথ্যসমৃদ্ধ ও সুখপাঠ্য বই ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি’। লেখক প্রথমেই জানিয়েছেন, পপুলার কালচার একটি গুরুত্বপূর্ণ চর্চার বিষয়। বাংলার সিনেমা মাধ্যমের এক অন্যতম অভিনেতাই শুধু না, উত্তম নিজেই হয়ে উঠেছিলেন এক ইন্ডাস্ট্রি। অভিনয়ের পাশাপাশি, সঙ্গীত পরিচালনা, চিত্রনাট্য লেখা সহ বাংলার সিনেমা শিল্প একটি দীর্ঘ সময় তাঁকে ঘিরে বেঁচেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা ও দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে বাংলার অর্থনীতি তখন জর্জরিত। দেশভাগের ফলে বাংলা সিনেমার বাজারও ছোট হয়ে গেল। অর্থনীতির এই করালছায়া পড়ল সিনেমা শিল্পেও। পেটের দায়ে বড়বড় লেখকগণ সিনেমার চিত্রনাট্য লিখতে এলেন। এই সময়ে সিনেমায় আবির্ভাব ঘটলো উত্তমকুমারের। প্রথমেই সাতটি ছবিই ফ্লপ করল। তবুও, সেই সময়ের এম পি প্রোডাকশন উত্তমকুমারকেই নায়ক চরিত্রে সুযোগ দিয়ে গেলেন। অরুণ কুমার নামটির পরিবর্তে নাম রাখা হলো উত্তমকুমার। একথা অস্বীকার করা যাবে না, পাঁচ ছয় সাতের দশকের অর্থনীতির উথালপাথাল সময়ে উত্তমকুমার বাংলার চলচ্চিত্র শিল্পের কান্ডারি হয়ে উঠেছিলেন। শুধুমাত্র রূপ নয়, তাঁর মেধা, বুদ্ধি, কঠোর অনুশীলন ও পরিশ্রমের ফল পেয়েছিল বাংলার মূলধারার বিনোদনের জগৎ। কেউকেউ বলেন, সেই সময়ের কঠোর আর্থ রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে থাকতে থাকতে মানুষ যখন হাঁপিয়ে উঠেছেন, তখন উত্তমকুমার অভিনীত পারিবারিক সিনেমা তাঁদের সাময়িক মানসিক মুক্তি দিতে পারতো। এও তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। তবে, যে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা হলো, অর্থনীতির বেহাল দশায় শিল্পসমৃদ্ধ ছবি করা সকলের পক্ষে যখন সম্ভব হচ্ছিলো না, এবং বাস্তবধর্মী ছবির বাজারও তেমন ছিল না, সেই পরিস্থিতিতে ঘর সংসার, মামলা মোকদ্দমা, প্রেম ভালোবাসা, মানুষের ঘরোয়া সুখদুঃখের গল্পের ভিতরেও এক ধরণের যে বাস্তবতা থাকতো, যা উত্তমকুমার অসাধারণভাবে আলোছায়ার দুনিয়ায় ফুটিয়ে তুলছিলেন। তাঁর অভিনীত ছবির জনপ্রিয়তা অনেকক্ষেত্রেই বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। অথচ, সেইসময়ে বুদ্ধিজীবী সমাজ তাঁকে অবহেলাই করেছে। কারণ, উচ্চশিক্ষিত বাঙালি আর্ট এবং পপুলার আর্টের মধ্যে বিভাজন রেখা টানতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো। উত্তম বারবার বিপন্ন ইন্ডাস্ট্রি ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাজ্যে খরা, বন্যা, দুর্ভিক্ষ হলে, বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে অর্থ তুলে দিয়েছেন সরকারের হাতে… কিন্তু সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হননি।
বাংলার বিড়ম্বিত হতভম্ব এক সময়ে ধুতি পাঞ্জাবি পরা সুঠাম বুদ্ধিদীপ্ত এক বাঙালির ইমেজ উত্তমের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছিল। শুধুমাত্র প্রেম ও পারিবারিক সম্পর্কের ছবির বাইরেও উত্তমকুমার অভিনয় করেছিলেন চোর পকেটমার, হকার, চাষি, চাকর, তাঁতি, শিকারি, খুনি, বিপ্লবী, কেরানি, কবি, শিল্পীর ভূমিকায়। কুড়িটি সিনেমায় ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বিভিন্ন নিম্নবর্গের মানুষের চরিত্রেও অভিনয় করেছেন। হয়তো এইসব কারণেও চল্লিশ থেকে সত্তরের দশকের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় বিত্তহীন সমস্যাসঙ্কুল বাঙালি জীবনের তিনিই হয়ে উঠলেন ‘নায়ক’।
চিত্রনাট্যের পরিধি ছাপিয়ে যাওয়ার অসম্ভব ক্ষমতা ও দক্ষতা ছিল তাঁর সহজাত। সেই সহজাত প্রতিভায় তিনি বাংলার হতশ্রী আটপৌরে জীবনের গল্পটি বলতে পেরেছিলেন অনেক সময়েই নিজের সাবলীল সাধারণ অভিনয় দক্ষতায়। জনগণ তাঁকে ইতিহাসের বাইরে নয়, ইতিহাসের ভেতরে খুঁজে পেয়েছিলেন। অনেক সিনেমার মেলোড্রামার ভেতরেও উত্তমকুমারকে মনে হয়েছিল তিনি যেন বাঙালির মুশকিল আসান।
যদিও উত্তমকুমার অভিনীত কোনও চরিত্র সিস্টেমকে প্রশ্ন করেনি। তবুও, একথা বলা যায়, মানুষের সংসারের ভিতরের দুর্দশা, খুব আটপৌরে কিছু সমস্যা কোথাও গিয়ে যেন সমাধান খুঁজে পেতো। পোশাক, উচ্চারণ, সংলাপ, আভিজাত্য, বাঙালিয়ানায় উত্তম ছুঁয়ে যাচ্ছিলেন ভেঙে দুমড়েমুচড়ে পড়া একটি জাতির আবার উঠে দাঁড়াতে পারার স্বপ্নকে।
কান্তি রঞ্জন দে অসম্ভব তথ্যের সমাহারে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন, দেশভাগ পরবর্তীকালে সমস্যায় জেরবার বাংলায় যে বাঙালি জাতি অন্তত রুচিশীল সংস্কৃতির চর্চাটুকু বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন তার সিংহভাগ কৃতিত্ব উত্তমকুমার ও তাঁকে ঘিরে যে শিল্প, তার। বিভিন্ন পর্বে ভাগ করে বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেছেন তিনি। উত্তম বিষয়ে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নও তুলেছেন। উত্তরও দিয়েছেন। এইভাবেই প্রায় প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গিতে বইটি লেখা হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে উত্তমকুমার বিষয়ক বইয়ের দীর্ঘ তালিকা। তাঁর অভিনীত সিনেমার তালিকা।
বইটির আকর্ষণীয় দিক হলো এই যে উত্তমকুমারের বাল্যকাল থেকে জীবনের শেষপর্যন্ত সময়ে তাঁর ‘উত্তম’ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে একজন শিল্পীর নিবিড় কঠোর অনুশীলন, চর্চার এক অসাধারণ বর্ণনা। শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে যে সংগ্রাম …যে দীর্ঘ যাত্রাপথ, সে পথের প্রায় পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য এখানে লেখক হাজির করেছেন। তাঁর অভিনীত প্রতিটি সিনেমার পর্যাপ্ত তথ্য লেখক দিয়েছেন। যদিও পুনরাবৃত্তি আছে কিছু। তবে সেটুকু অবশ্যই প্রধান বিষয় নয়। এই বইটি সেই সময়ের বাংলার জনপ্রিয় বিনোদন জগৎটি কেও বুঝতে সাহায্য করবে।
অরুণ আলোর অঞ্জলি
মহানায়কের অভিনয় জীবনের আলেখ্য
কান্তি রঞ্জন দে। জানুয়ারি ২০২৫। সিমিকা পাবলিশার্স। ৬০০
Comments :0