এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় নকল যেন প্রকাশ্য রীতিতে পরিণত হয়েছে ইসলামপুরে। অতীতের মাইক্রো জেরক্স বা হাতে লেখা নকলকে কার্যত হাস্যকর প্রমাণ করে দিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্র দখল নিয়েছে অত্যাধুনিক ডিজিটাল ট্রান্সপারেন্ট নকল। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের প্রলেপের উপর প্রশ্নোত্তর প্রিন্ট করে তা পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া, বেঞ্চের ভিতরে বা উপরের অংশে নিখুঁতভাবে লাগিয়ে দেওয়ার মতো ভয়ংকর কৌশল সামনে আসায় কার্যত স্তম্ভিত নজরদারি পরীক্ষকেরা।
নজরদার শিক্ষকদের দাবি, এই ধরনের স্বচ্ছ নকল সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। পরীক্ষার সময় ছাত্রছাত্রীরা অনায়াসে তা ব্যবহার করছে, অথচ তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। পরীক্ষার পর কেন্দ্রের বাইরে পড়ে থাকা ওই স্বচ্ছ নকলগুলি দেখেই আসল চিত্র সামনে আসে। প্রশ্ন উঠছে—পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতরে এত বড় কারসাজি চললেও নজরদারি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
উত্তর দিনাজপুর জেলার বিদ্যালয় পরিদর্শক (মাধ্যমিক) দেবাশিস সমাদ্দার বিষয়টিকে হালকাভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন, “নকল অতীতেও হতো, এখনো হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে।” তাঁর এই মন্তব্যেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন শিক্ষক মহলের একাংশ। তাঁদের প্রশ্ন, নকল যদি অবশ্যম্ভাবী হয়, তবে পরীক্ষা নেওয়ার অর্থ কী? শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য কি নকলকেই কার্যত বৈধতা দিচ্ছে না?
নজরদারি শিক্ষকদের একাংশ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, অতীতে এমন ডিজিটাল ও স্বচ্ছ নকলের নজির তাঁরা দেখেননি। আগে মাইক্রো জেরক্স বা ছোট কাগজে লেখা নকল ধরা পড়ত। কিন্তু এবছরের এই অত্যাধুনিক পদ্ধতির সামনে তাঁরা কার্যত অসহায়। তাঁদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সহায়তা বা নির্দিষ্ট নির্দেশিকা ছাড়া শুধুমাত্র সতর্ক থাকার কথা বলে দায় ঝেড়ে ফেলা হচ্ছে।
নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির উত্তর দিনাজপুর জেলা সম্পাদক ভাস্কর দাস সরাসরি শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন। তিনি বলেন, “ছাত্রছাত্রীরা নকল করতে যায় কেন— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই আসল সত্য সামনে আসবে। গ্রামীণ শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বহু বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা তলানিতে ঠেকেছে। পঠনপাঠন কার্যত বন্ধের মুখে। এই ব্যর্থ ব্যবস্থার ফল হিসেবেই ছাত্রছাত্রীরা নকলের পথে বাধ্য হচ্ছে।” তাঁর মতে, নকল নতুন নয়, কিন্তু ডিজিটাল যুগে তা ভয়ংকর ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অভিভাবকদের উদাসীনতাও এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের জেলা নোডাল এডভাইসারি কমিটির প্রধান ইজাহার আনোয়ার জানান, বিষয়টি এখনও তাঁর নজরে আসেনি, তবে নকল বন্ধে তাঁরা সচেষ্ট। যদিও শিক্ষামহলের প্রশ্ন—পরীক্ষা চলাকালীন এত বড় ঘটনা নজরে না আসাই কি প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রমাণ নয়?
ডিজিটাল ট্রান্সপারেন্ট নকলের এই ঘটনা শুধু পরীক্ষাকে কেবল প্রশ্নের মুখে ফেলেনি, বরং গোটা রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত যে কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে, তা নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিল বলে মনে করে নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি।
এবছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় এআই ব্যবহার করে নকল করার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে পর্ষদ। ভূগোল পরীক্ষার দিন রাজ্যের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে মোবাইল ফোনসহ মোট ১২ জন পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। পর্ষদের অভিযোগ এআই অ্যাপের সাহায্যে সঠিক উত্তর বের করছিল এনেকেই।
পর্ষদের সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার চার পরীক্ষার্থী ধরা পড়ে গার্ডেনরিচ এলাকায়। কোচবিহারে দুই, উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, হুগলি, বাঁকুড়া, বীরভূম ও পশ্চিম বর্ধমানে একজন করে পরীক্ষার্থী মোবাইল ফোনসহ ধরা পড়ে। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। নকল করার কারণে চলতি বছরে পরীক্ষা বাতিল হয়েছে ৩১ জন পরীক্ষার্থীর। চলতি বছরে রাজ্যজুড়ে মোট ৯ লক্ষ ৭১ হাজার ৩৪০ জন মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছে। তাদের মধ্যে ৪ লক্ষ ২৬ হাজার ৭৩৩ জন ছেলে। ৫ লক্ষ ৪৪ হাজার ৬০৬ জন মেয়ে। রাজ্যের ২ হাজার ৬৮২টি কেন্দ্রে পরীক্ষা চলছে।
Madhyamik Exam 2026
‘নতুন প্রযুক্তিতে’ টোকাটুকি ইসলামপুরে, বিপর্যস্ত স্কুল শিক্ষাকে দায়ী করছে এবিটিএ
×
Comments :0