সুদীপ্ত বসু:: তুফানগঞ্জ ও ফালাকাটা
বাংলার রাজনীতিতে নয়া অভিধান হাতে নিয়েই প্রথম দিন উত্তরবঙ্গের ৬৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করল ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’।
নয়া অভিধান কী? যাত্রা পথের রঙই বা কেমন? জনস্রোতের আলাদা কোনও রঙ হয় না, উত্তাল ঢেউ রাশিই তার পরিচিতি। শুধু যাত্রা পথের রুট ম্যাপে দেখা যাচ্ছে— বিবর্ণ বাংলার যন্ত্রণা আর মরিয়া প্রতিরোধের চিহ্ন আঁকা নদী-জঙ্গল-জমি-বনবস্তি-চা বাগিচার প্রতিটি প্রান্তর শুনছে ‘নয়া অভিধান’।
নদী বেষ্টিত সীমান্তের কৃষি বলয় তুফানগঞ্জ থেকে ধান,আলু চাষের সঙ্কটের সঙ্গে যুঝতে থাকা ভাটিবাড়ি, বনবস্তি, চা বাগিচার শ্রমিক মহল্লার উষ্ণতা মেখে দিনের আলো ফুরিয়ে রাতে যখন ফালাকাটায় এসে পৌঁছালো বাংলা বাঁচানোর যাত্রা, ততক্ষণে যেন ‘মেঘ পিওনের ব্যাগের ভিতর’ বিবর্ণ বাংলাকে বদলানোর হাজারো আর্তি জমা হয়েছে।
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কলমের অনুরণন নয়া বাংলা গড়ার সেই লড়াইয়ে- ‘তার ঘর পুড়ে গেছে/ অকাল অনলে, তার মন ভেসে গেছে/ প্রলয়ের জলে/ তবু সে এখনও মুখ দেখে চমকায়, এখনও সে মাটি পেলে প্রতিমা বানায়’।
যাত্রাপথের সূচনা সমাবেশে তৃণমূলী রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দিনহাটা থেকে তুফানগঞ্জের দোলামেলার মাঠে ঘাসের ওপরেই কাগজ পেতে জাহিরুদ্দিন মিঞার উচ্চারণ— এক ছেলে দিল্লিতে, দুই ছেলে বেঙ্গালুরুতে মজুরের কাজে, ঘরে রয়েছি কেবল আমি। ১ বিঘায় আলু চাষে ৩৬০০ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এই লাল ঝান্ডার মিটিং ছাড়া কোথায় নিজের যন্ত্রণার কথা বলবো? কে শুনবে? ৬৫ কিলোমিটার দূরে ফালাকাটা মোড়ে ঠায় দু’ঘণ্টা বাংলা বাঁচাও যাত্রার জন্য রাস্তায় অপেক্ষারত কাদম্বিনী বাগানের মহিলা শ্রমিক বিফেন মুণ্ডা বললেন— ওঁরা আসুক, ওদের সঙ্গে একটু পথ যাব। চা-পাতি আর মজুরি ছাড়া তো কিছু মেলে না। আমাদের ন্যূনতম মজুরির কথা সরকারের কানে কবে পৌঁছাবে জানি না, তাই এদের কাছেই জানাতে এসেছি। আর তো কেউ শোনেও না।
জীবন যন্ত্রণার এই ভাষাকেই এবার প্রতিরোধের স্তরে উন্নীত করার ডাক দিয়ে, শনিবার দুপুরে শুরু হলো পথ-চলা। দুপুরে তুফানগঞ্জে আর রাতে ফালাকাটায় উপচে পড়া জনস্রোতের সামনে সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বললেন, এটা সবে শুরু। আগামী কয়েক মাস গোটা রাজ্যজুড়ে প্রচার আন্দোলনের তুফান তুলবে সিপিআই(এম)। অনেক হিসাব ওলটপালট হবে। ওদের ছায়া যুদ্ধ, মেকি লড়াইকে কোণঠাসা করেই সামনে আসবে মানুষের ইস্যু। রাজনীতির ভাষা, রাজনীতির ইস্যু তৈরি হবে ধ্বংসের মুখে টেনে নিয়ে আসা বাংলার প্রতিটি প্রান্তরের জনজীবনের ভাষা থেকেই। দেশকে বাঁচাতে হলে বাংলাকে বাঁচাতে হবে। বাংলাকে বাঁচানো মানে বাংলায় বামপন্থার পুনরুত্থান ঘটাতে হবে। বাংলাকে বাঁচানো মানে বাংলার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-কর্মসংস্থান- মহিলাদের নিরাপত্তা, ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই। সেই লড়াইয়ের অভিন্ন অংশ হলো লুটের রাজনীতি, বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই। তৃণমূল-বিজেপি’কে কোণঠাসা করে মানুষের ইস্যুকে চালকের আসনে বসাতে হবে। ওরা ভয় পাচ্ছে, তাই যাত্রার প্রথম দিনেও আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। কিন্তু বিজেপি, আরএসএস এবং ওদের দুর্গা মমতা ব্যানার্জির সন্ত্রাসের ভয় আর কাজ করবে না। প্রত্যাঘাতে প্রস্তুত মানুষ।
সূচনার সমাবেশে আগামী ১৯দিনের যাত্রার সূর বেঁধে দিয়েই মীনাক্ষী মুখার্জি বলেন, লক্ষ লক্ষ যুবক কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে। কাজ নেই বাংলায়, আছে কেবল লুটের কাঁচা টাকা। এটা সুস্থ বাংলার চেহারা? ৩৮২২ টা প্রাথমিক স্কুল বন্ধ হয়ে যায়, ২২ হাজার মদের দোকান খোলে, এটা সুস্থ বাংলা? মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত হিমঘরে আলু রাখার পরে এক মাস আরো রাখতে পারার কথা জানানোর পরে বস্তা পিছু ১১ টাকা ৩৩ পয়সা বাড়িয়ে দেওয়াটা সুস্থ বাংলার লক্ষণ? ওরা জনগনের গদ্দার। গদ্দারদের কোনও ধর্ম হয় না। সহজ কথা— শাসক দল রাজনীতিতে এই ইস্যুগুলোই আনতে দিতে চায় না। বিজেপি চায় বলেই তৃণমূল সরকারে আছে। যদি তৃণমূলকে উৎখাত করতে হয় তাহলে সিপিআই(এম)’কে শক্তিশালী করুন। আজ থেকে আমরা সকলে, গোটা রাজ্যে লড়তে থাকা প্রতিটি চেতনাই বাংলা বাঁচানোর সৈনিক।’
তুফানগঞ্জে দুপুর ২টোয় সূচনা সমাবেশ। সকাল ৯টায় মাঠে এসে হাজির ষাটোর্ধ্ব গোবিন্দ পাল। মাটি কাটেন এই বয়সেও। রেগার কাজ বন্ধ। দিনমজুরি করেই ভাতের দাম জোগাড় করেন। তবুও কেন এসেছেন? বললেন, ‘‘ওরা ১৯ দিন ধরে রাস্তায় থাকবে তো আমাদের কথাই বলতে। আমরা না এলে ওদের জোর বাড়বে কী করে? এই বৃদ্ধ বয়সে তুই তোকারি করে তৃণমূল-বিজেপি তোলা তুলতে আসে। আমাদের অপমানের জবাব দিতে হবে তো লাল ঝান্ডাকেই।’’ লাল ঝান্ডার কাছে এভাবেই আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়ে দিলেন প্রবীণ মানুষটি।
শুধু কী তাই? তুফানগঞ্জ থেকে যখন কোচবিহার জেলায় ২০০টি বাইক সহযোগে কর্মীরা আলিপুরদুয়ার সীমান্তে ভাটিবাড়িতে ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’-কে পৌছে দিল, তখন সেখানে এক ঘণ্টা আগে থেকে রাস্তার দু’পাশে হাজার হাজার মানুষ। সেই ভিড়েই মহাকালগুড়ির কৃষক অধীর চন্দ্র বর্মণ জানালেন আমন চাষের ক্ষতির কথা। শ্রাবণে বৃষ্টি ছিল না, খরচ করেই জল কিনতে হয়েছে। গোটা কোচবিহার, আলিপুরদুয়ারে সাম্প্রতিক বন্যার পরে কয়েক হাজার বিঘার পর বিঘা জমির ফসল নষ্ট করে চোষক পোকা। ভয়াবহ ক্ষতির মুখে কৃষক। কৃষি দপ্তর উদাসীন। সরকারের তরফে চোষক পোকা ঠেকাতে এডামা কোম্পানির নিম্নমানের কীটনাশক দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের দাবি, শস্যবিমা দ্বিগুণ করো।
উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণে শূন্যপদ অবলুপ্ত করে কীভাবে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা মাত্র ৩৫৫তে নামিয়ে, ঠিকা শ্রমিকের সংখ্যা ধাপে ধাপে দেড় হাজারে নিয়ে এসে এনবিএসটিসি’কে বেসরকারিকরণের পথে ঠেলে দিয়েছে সরকার, সেই বর্ণনা দেওয়া রামপ্রসাদ সরকার আর চোষক পোকা ঠেকানোর নামে সরকারি দুর্নীতির অভিযোগ তোলা অধীর বর্মণ এসে দাঁড়িয়েছেন একই প্রান্তরে। বাংলা বাঁচাও যাত্রাপথে এই রঙিন কোলাজই দেখা গেলো দিনভর।
তুফানগঞ্জে সূচনা সমাবেশ শেষে মহম্মদ সেলিম, মীনাক্ষী মুখার্জি, আভাস রায়চৌধুরি, জিয়াউল আলম রক্তপতাকা তুলে দেন সিপিআই(এম)’র কোচবিহার জেলা সম্পাদক অনন্ত রায়ের হাতে। দুপুরে সমাবেশ শেষে বর্ণাঢ্য বাইক মিছিল সহযোগে অভিযাত্রীদের বাস বিকালে পৌঁছায় ভাটিবাড়িতে। সেখানেই রক্ত পতাকা কোচবিহার জেলার তরফে তুলে দেওয়া হয় আলিপুরদুয়ারের সিপিআই(এম) জেলা সম্পাদক কিশোর দাসের হাতে। এভাবেই ১১টি জেলা পেরিয়ে তা পৌঁছাবে কামারহাটিতে। ভাটিবাড়ি থেকে চেকো নদী পার হয়ে আলিপুরদুয়ার চৌপথী, বীরপাড়া মোড় হয়ে শালকুমার হাট হয়ে ফালাকাটায় পৌঁছায়। সেখানে রাত নটা পর্যন্ত চলে সমাবেশ। ৬৪টি চা-বাগিচা, ৪৪টি বনবস্তির লড়াইয়ের ওম মেখেই আলিপুরদুয়ারে এদিন রাতে থামল তা।
তুফানগঞ্জে ও ফালাকার দুটি সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মহম্মদ সেলিম, মীনাক্ষী মুখার্জি। এছাড়াও তুফানগঞ্জের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন প্রণয় কার্যী, আকিক হাসান, ফালাকাটার সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জিয়াউল আলম, ঈশ্বর রায় ও তিতাস রঞ্জন দাস।
Bangla Banchao Day 1
বামপন্থার পুনরুত্থানের বার্তা নিয়েই শুরু ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’
×
Comments :0