Editorial

ট্রা‍ম্পের ফাঁদে পা নয়

সম্পাদকীয় বিভাগ

এতদিন প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলী বর্বরতা ও গণহত্যাকে মদত ও বৈধতা দিয়ে এখন ধ্বংসের উপর শ্মশানের শান্তি প্রতিষ্ঠায় অতি সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর তাঁর সেই স্বপরিকল্পিত উদ্যোগের পোশাকি নাম ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পরিষদ। গোটাটাই ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কল্পনাপ্রসূত। কেমন শান্তি বা কেমন পুনর্নির্মাণ তার অ আ ক খ কোনও কিছুই কারও জানা নেই। এহেন এক অজ্ঞাত ও অজানা শান্তি পরিষদে যোগ দিতে তিনি ইতিমধ্যেই ৫০টিরও বেশি দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছে গুটিকতক দেশ। যত দেশ সম্মতি জানিয়েছে তার থেকে ঢের বেশি দেশ যোগ দিতে অস্বীকার করেছে। তবে বেশিরভাগ দেশই নীরব থেকে জল মাপছে। অবশ্য অনেক দেশই রাষ্ট্রসঙ্ঘকে এড়িয়ে ট্রাম্পের এমন উদ্যোগের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
এই উদ্যোগে ট্রাম্প পাকিস্তান, তুরস্ককে যেমন আমন্ত্রণ করেছেন তেমনি ভারতকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমন্ত্রিত চীন এবং রাশিয়াও। পাকিস্তান, তুরস্ক ইতিমধ্যেই সম্মতি জানিয়েছে। এখন ভারত যদি সম্মত হয় তাহলে পাকিস্তান, তুরস্কের সঙ্গে এক টেবিলে বসতে হবে। অপারেশন সিন্দুরের সময় তুরস্কের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে সাহায্য করার অভিযোগ তুলেছিল ভারত। একই অভিযোগ ছিল চীনের বিরুদ্ধেও। এখন দেখা যাক পাকিস্তানের সঙ্গে মোদীরা এক টেবিলে বসে গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা করেন কি না। অথবা ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনাকে পাক-ভারত এক যোগে হাত তুলে সমর্থন করবে কি না।
এখন প্রশ্ন হলো দু’বছর ধরে গাজার বুকে ইজরায়েল গণহত্যা ও ধ্বংসলীলায় কোনোদিন আমেরিকা বা ট্রাম্প আপত্তি জানায়নি। পাইকিরি হারে প্যালেস্তাইন নারী-শিশুকে হত্যা এবং বোমা-ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধূলিসাৎ করার পরও ইজরায়েলকে মদত দিতে দ্বিধা করেনি আমেরিকা। বস্তুত মার্কিন অস্ত্র, অর্থ ও কূটনৈতিক সাহায্য ছাড়া ইজরায়েলের পক্ষে এমন গণহত্যা চালানো সম্ভব ছিল না। দু’বছর ধরে শান্তির কথা ট্রাম্পের মুখে শোনা যায়নি। সময় ও সুযোগ দিয়েছে অন্তত ৭৫ হাজার মানুষ খুন করে রক্তের লালসা পূরণ করতে। এখন বেশিরভাগ গাজাবাসীকে ভিটেমাটি ছাড়া করে তাদের বাড়ি-ঘর, স্কুল, হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দিয়ে তাদের জীবিকার সব উৎস ধ্বংস করে কার্যত তাদের সহায় সম্বলহীন শরণার্থী বানিয়ে ট্রাম্প মহান শান্তির পূজারি সাজতে চাইছেন।
অবশ্য তাঁর চাওয়া শান্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে প্যালেস্তাইনের জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র। অনেক আগেই ট্রাম্প তেমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন তিনি চান গাজা হোক বি‍‌শ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল রিয়েল স্টেটের‍‌ ঠিকানা। স্থানীয় মানুষদের বিতাড়িত করে সেখানে নতুন আভিজাত্য নির্মাণ হবে। পুঁজি ঢালবে বৃহৎ কর্পোরেটরা। ট্রাম্প স্বাধীন সার্বভৌম প্যালেস্তাইন চান না। প্যালেস্তাইন পুরোপুরি ইজরায়েলের দখলে যাক সেটাও চান না। চান তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে গাজাকে বিশ্বের ধনবানদের বিলাস ক্ষেত্র বানাতে। ইজরায়েলের আগ্রাসনে গাজা অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে। যাবতীয় নির্মাণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন সহজে সেখানে ট্রাম্প বিত্তশালীদের নয়া উপনিবেশ বানাতে পারবেন। একাজ রাষ্ট্রসঙ্ঘের মাধ্যমে হবে না। রাষ্ট্রসঙ্ঘ ইজরায়েল আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। তাই রাষ্ট্রসঙ্ঘকে বাদ দিয়ে ট্রাম্প একাই বিকল্প রাষ্ট্রসঙ্ঘ হয়ে উঠতে চাইছেন। নিজের মরজিমত কাজ করার জন্য সঙ্গী জোটাতে ‘বোর্ড অব পিস’-র সানবোর্ড লাগিয়েছে। এহেন উদ্যোগে ভারতের যোগ দেওয়া কোনও যুক্তিতেই সঙ্গত নয়। প্যালেস্তাইন প্রশ্নে ভারতের বরাবরের অবস্থানের বিরুদ্ধাচরণ হবে। সর্বোপরি রাষ্ট্রসঙ্ঘকে অস্বীকার করার মার্কিন ফাঁদে পা দেওয়া ভারতের পক্ষে বিক্রি হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

Comments :0

Login to leave a comment