প্রায় দু’দশক ধরে আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী দাবি করেছেন ভারতের জন্য এতটা ‘লাভজনক’ বাণিজ্য চুক্তি অতীতে কোনোদিন কোনও প্রধানমন্ত্রীর আমলে হয়নি। তবে কোথায় কোথায়, কীভাবে ও কতটা লাভজনক তা খোলসা করেননি মোদী। সমগ্র চুক্তির বাছাই করা কয়েকটা অংশ নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। বাকি সব বিষয়গুলি অজ্ঞাত ও গোপনই থেকে গেছে। চুক্তিটি সত্যি সত্যি ভালো কিনা, হলে কতটা ভালো বোঝা যাবে সমগ্র চুক্তির বয়ান প্রকাশ্যে আনা হলে। মোদীরা যদি ইইউ’র সঙ্গে চুক্তি করে ভারতের জন্য বিপুল সুবিধার বন্দোবস্ত করে থাকেন তাহলে চুক্তিটি গোপন না রেখে প্রকাশ্যে আনতে অসুবিধা কোথায়। তাই সঙ্গতভাবেই চুক্তিটি সংসদের চলতি অধিবেশনে পেশ করার দাবি জানিয়েছে সিপিআই(এম)। চুক্তি ঘোষণার পর ইইউ’র পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে এর ফলে ভারতে তাদের রপ্তানি ১০৭ শতাংশ বাড়বে। কিন্তু পক্ষ থেকে ইউরোপে রপ্তানি কতটা বাড়বে তেমন কোনও আন্দাজ জানানো হয়নি।
চুক্তির যে অংশ নিয়ে সরকারি তরফে আলোচনার সূত্রপাত করা হয়েছে তা থেকে বোঝা যাচ্ছে সামুদ্রিক পণ্য, রাসায়নিক, চর্মজাত, প্লাস্টিক-রবারজাত, বস্ত্র-তৈরি পোশাক, রত্নালঙ্কার ইত্যাদি ইউরোপে শুল্কমুক্ত হবে। বিনিময়ে ইউরোপে তৈরি গাড়ি, মদ, স্পিরিট, বিয়ার, অলিভ অয়েল, লৌহ-ইস্পাত, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ভারতের বাজারে কার্যত অবাধে ঢোকার সুযোগ পাবে। ইউরোপের গাড়ির ওপর শুল্ক কমবে এর চেয়েও বেশি হারে। প্রক্রিয়াকৃত খাদ্য বর্তমান ৫০ শতাংশ ছাড পেয়ে বিনা শুল্কে ঢুকবে ভারতে। অর্থাৎ কৃষিজ ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারে বড়সড় থাবা বসাবে ইউরোপ।
মনে রাখতে হবে ইউরোপের যাবতীয় শিল্প প্রধানত পুঁজি নিবিড় ও প্রযুক্তি নিবিড়। তাই উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। তেমনি ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি বেশির ভাগ বৃহৎ এবং বহুজাতিক চরিত্রের। ভারতের শিল্প নিম্ন পুঁজি, নিম্ন প্রযুক্তি ও শ্রমনিবিড়। তাই উৎপাদন ব্যয় বেশি। বিদেশিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাই ভারতের পণ্য খানিকটা দুর্বল। তাছাড়া ভারতের শিল্পে পরিবেশগত বিধি দুর্বল। শিশুশ্রমও ব্যবহার হয়। এইসব কারণে বহু ভারতীয় পণ্য চুক্তি অনুযায়ী শুল্কমুক্ত হলেও অন্যান্য বিধি নিষেধের আওতায় পড়তে পারে। ফলে যত সুবিধার কথা বলা হচ্ছে সেটা নাও মিলতে পারে। তেমনি ইউরোপের লৌহ-ইস্পাত বিনা শুল্কে ভারতের বাজারে ঢুকলে মহাসঙ্কটে পড়বে ভারতের ইস্পাত শিল্প। দাম কমাতে গিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই, ঠিকা শ্রমিক বাড়াতে হবে। আবার ইউরোপীয় প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ভারতে ঢুকে দেশের মাঝারি, ছোট ও ক্ষুদ্র অসংখ্য সংস্থাকে বন্ধের মুখে ঠেলে দেবে। ভারতের যেসব পণ্য ইউরোপে শুল্কমুক্ত হবে সেগুলিও অন্য দেশের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে খরচ কমাতে বাধ্য হবে। ফলে ক্ষুদ্র শিল্পেও শ্রমিকের মজুরি কমবে। নেতিবাচক চাপ বাড়বে ছোট কৃষক ও পশুপালকদের উপর। মোদী যে দাবিই করুন বাস্তব হলো দেশের স্বার্থকে অনেকটাই বিসর্জন দিয়ে এই চুক্তি হয়েছে। বন্ধু ট্রাম্পের গুঁতোয় একরকম বাধ্য হয়েই ইউরোপের খপ্পরে পড়তে হয়েছে। ভারতের অর্থনীতিতে ইউরোপের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির এই চুক্তি জিডিপি কিছুটা বাড়ালেও মানুষের কাজের সুযোগ ও মজুরি বাড়াবে না। কমাবে জিনিসপত্রের দাম। তবে অবশ্যই বড়লোকদের সুবিধা হবে। মুনাফা বাড়বে মালিকদের।
India EU FTA
‘ঐতিহাসিক’ আত্মসমর্পণ
×
Comments :0