ভ্রমণ
মুক্তধারা
ষোলোআনা নিজমিয়ানা
অভীক চ্যাটার্জী
৭ মার্চ ২০২৬, বর্ষ ৩
এবার চারমিনার
আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করি। ফেলুদা কোন ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতো?মনে আছে? উত্তরটা অনেকেরই জানা। এবারে আমাদের গল্প হবে সেই চারমিনারকে নিয়েই।
তখন হায়দরাবাদের মসনদে কুতুব শাহী বংশের পঞ্চম সুলতান, মোহাম্মদ কুলি কুতুব শাহ। হঠাৎ তার রাজত্বে দেখা দিলো ভয়ানক প্লেগ মহামারি। সুলতান পরমেশ্বর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, যদি তার প্রজারা এই ভয়ানক মহামারি থেকে মুক্তি পায়, তাহলে তিনি একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে দেবেন শহরের মাঝে। সেই মানত রক্ষা করতে নির্মাণ করেন এই অমিতসুন্দর স্তম্ভ।
এই স্থাপত্যের চার কোণায় চারটি উঁচু মিনার রয়েছে, প্রতিটির উচ্চতা প্রায় ৫৬ মিটার। এটি তৈরি করা হয়েছে গ্রানাইট, চুন, মর্টার ও পিষে নেওয়া মার্বেল দিয়ে।
চারমিনারের উপরের তলায় একটি মসজিদ রয়েছে, যা হায়দরাবাদের প্রাচীনতম মসজিদগুলোর একটি।
চারমিনারকে কেন্দ্র করে পুরোনো হায়দরাবাদ শহর গড়ে উঠেছিল। এর চারদিকে চারটি প্রধান রাস্তা বের হয়েছে, যা তখনকার শহর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
চারমিনারের কাছেই বিখ্যাত বাজার অবস্থিত, যেখানে বিশেষ করে কাঁচের চুড়ি ও ঐতিহ্যবাহী গয়না পাওয়া যায়। এখানেই রয়েছে বিখ্যাত নিমরাহ্ ক্যাফে। যার বান মাস্কা আর কফি চেখে না দেখলে চরমিনারের বাজার দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সাথে আরও বিভিন্ন জিনিসের বাজার রয়েছে। সুগন্ধী আতরের নাম না করলে এই বিষয় সত্যিই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তবে একেবারে চারমিনারের নিচেই ফুটপাথে যারা আতর বিক্রি করে, সেখান থেকে না কিনে একটু এগিয়ে এসে কোনো পাকা দোকান থেকে নেওয়া অনেকটা বিশ্বাসযোগ্য। দরাদরি করার ক্ষমতা থাকলে আপনি অনেক ভালো জিনিস খুব কম দামে নিয়ে আসতে পারবেন এখন থেকে।
অনেকেই জানেন না এই চারটে মিনার ইসলামের চার খলিফার প্রতীকী। তারা হলেন যথাক্রমে আবু বাকর, উমর, উত্মান এবং আলী। বলা হয়, এই চারমিনারের আসে পাশে ও নিচে প্রচুর গুপ্তধন পোঁতা আছে। যদিও তা এখনও অনাবিষ্কৃত।
এই চারমিনারের পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক মক্কা মসজিদ, যেটি ভারতের প্রাচীন ও বৃহৎ মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম। তার গল্প পরে একদিন বলব না হয়।
ইতিহাস থাকবে আর মিথ থাকবে না, তা কখনও হয়?চারমিনার নিয়েও রয়েছে অনেকগুলো মিথ। প্রথমটি হলো একটি গুপ্ত সুড়ঙ্গ, যা চারমিনারে শুরু হয়ে গোলকোন্ডা দুর্গে শেষ হয়। যার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি কিম্বা অস্তিত্ব আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে দ্বিতীয় যে মিথটি রয়েছে, সেটি জব্বর। কিছু স্থানীয় দোকানদারের মতে বিশেষ করে মধ্যরাতের পর চারমিনারের আসে পাশে এক সাদা পোশাকের ছায়ামূর্তি দেখা যায়। অনেকের মতে এটি হলো চারমিনার এর এক প্রাচীন প্রহরীর প্রেতাত্মা। এখনও নাকি মধ্যরাতে এই মিনার এর আসে পাশে ফিসফাস শব্দ আর চুড়ির টুংটাং শব্দ পাওয়া যায়।
ইতিহাস ভূত খাবার আর রকমারি পসরা, সব মিলিয়ে চারমিনার এর নিচের পরিবেশ বড়ই চমৎকার। একটা সুন্দর বিকাল কাটিয়ে আসতেই পারেন এই ৫০০ বছরের প্রাচীন সৌধ টিতে। ভালো লাগবে। আর সময় পেলে উপরে উঠে দেখতে পারেন চারমিনার এর। সাড়ে পাঁচটার আগে গেলে উঠতে দেয়। হায়দরাবাদের প্রকৃত স্বাদ পেতে চারমিনার হলো আদর্শ জায়গা।
Comments :0