পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্পে বিরাট দুর্নীতি হয়েছে মমতা ব্যানার্জির শাসনে। সিএজি এই সংক্রান্ত রিপোর্টে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু যা আরও বিপজ্জনক তা হলো, বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ যে প্রকল্পের লক্ষ্য, সেই প্রকল্পে বিষাক্ত জল পৌঁছেছে রাজ্যের অনেকগুলি এলাকায়।
আরও ২৭টির মতো সিএজি’র এই রিপোর্টও চেপে রেখেছিল তৃণমূল। বিধানসভায় পেশ করেনি। সম্প্রতি বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকার তা পেশ করেছে। কিন্তু পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্পে এত অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে বিধানসভায় কখনও সোচ্চার হয়নি তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিজেপি।
প্রকল্পটির নাম জল জীবন মিশন। ২০২৪-এর মার্চের মধ্যে দেশের গ্রামীণ এলাকার প্রতিটি বাড়িতে পাইপের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ ছিল প্রকল্পটির ঘোষিত লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। পরিবারগুলি ছাড়াও একটি বড় অংশের স্কুল এবং অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে পানীয় জল পৌঁছায়নি। সিএজি রিপোর্ট বলছে, তৃণমূল শাসনে বিষাক্ত জল সরবরাহ হয়েছে। সিএজি’র অডিট টিম দেখেছে মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর ২৪ পরগনায় ১৬ কোটি ৭২লক্ষ টাকা খরচ করে স্বয়ংক্রিয় আর্সেনিক দূরীকরণ প্ল্যান্ট বসানো সত্ত্বেও প্রায় ৫৫ শতাংশ জলের নমুনায় অতিরিক্ত বিষাক্ত আর্সেনিক রয়ে গেছে। ব্যাকটিরিয়া বা ই-কোলাই পরীক্ষার ল্যাবগুলির কোনও উপযুক্ত অনুমোদন ছিল না। ৫গুণ চড়া দামে নিম্নমানের ও রাসায়নিকবিহীন টেস্টিং কিট কিনে ১১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা অপচয় করা হয়েছে। পাইপলাইনের জলে সঠিক ক্লোরিনেশন না করায় দূষিত জল খেয়ে বহু গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ মানুষ কলেরা ও জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছেন।
দুর্নীতি হয়েছে ব্যাপক। ৩৩৪ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার পাইপ ও টেন্ডার কেলেঙ্কারি হয়েছে বলে সিএজি তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে। ওপেন টেন্ডারের নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে। ডিকটাইল আয়রন পাইপ কেনার ক্ষেত্রে সেন্ট্রাল ভিজিল্যান্স কমিশনের নিয়ম ভাঙা হয়েছে। খোলা বাজার থেকে কম দামে পাইপ না কিনে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে চড়া দামে চুক্তি করা হয়। ভুয়ো চালান মিলেছে অডিটে। জলপাইগুড়ি এবং মালদহ ডিভিসনে সাইটে কোনও পাইপই যায়নি। অথচ ভুয়ো ‘মেটেরিয়াল চালান’ এবং জাল স্টক এন্ট্রি দেখিয়ে ৩৩৪ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা ভেন্ডরদের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়েছে।
সিএজি’র রিপোর্ট বলছে, রাজ্যে জল জীবন মিশনের পরিকল্পনা পদ্ধতি ছিল অপর্যাপ্ত এবং তা প্রকল্পের নির্দেশিকা মেনে তৈরি করা হয়নি। ভিলেজ অ্যাকশন প্ল্যান তৈরিতে বিলম্ব হয়েছিল। আবার ডিস্ট্রিক্ট অ্যাকশন প্ল্যানও তৈরি করা হয়নি। যার ফলে গ্রাম, জেলার প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা বিচার না করেই স্টেট অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে, এমন ঝুঁকি থেকে যায়। কাগজের সংযোগ ও ভুয়ো ডেটা এন্ট্রি হয়েছে রাজ্যে এই প্রকল্পে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ অর্থবর্ষের মধ্যে রাজ্যে অনুমোদিত মোট ৯,৩৩৬টি পানীয় জল প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ১,৩৭৫টি সম্পূর্ণ হয়েছে। বাকি ৭,৯৬১টি (৮৫.২৭%) প্রকল্প অসম্পূর্ণ ফেলে রাখা হয়েছে। ডিভিসনাল জালিয়াতি হয়েছে। বর্ধমান ডিভিসনে পাম্প বসানো বা বিদ্যুৎ সংযোগের মতো কোনও মেকানিক্যাল কাজ না করেই, স্রেফ পাইপলাইন দেখিয়ে ১৫,০৯১টি বাড়িতে সচল জল সংযোগের ভুয়ো ডেটা কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড করা হয়েছিল বলে সিএজি’র রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪,৮১১ কোটি টাকার তদারকিহীন বিল পাশ করানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, ঠিকাদারদের কাজের গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য একটি স্বাধীন থার্ড পার্টি ইন্সপেকশন এজেন্সির ছাড়পত্র পাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কোনোরকম বাধ্যতামূলক কোয়ালিটি চেক সার্টিফিকেট ছাড়াই ঠিকাদার সংস্থাগুলিকে ৪,৮১১ কোটি ৭ লক্ষ টাকার বিল সরাসরি নগদে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যে মাঝপথে অনেকগুলি প্রকল্প বাতিল হয়েছে। ফলে অনেক কোটি টাকার অপচয় হয়েছে। ইচ্ছাকৃত ডুপ্লিকেশনের কারণে অনুমোদন পাওয়ার পর রাজ্য জুড়ে ৭০৭টি পানীয় জল প্রকল্প মাঝপথে বাতিল করা হয়। সংবিধানের ২৪৩জি ধারা এবং পঞ্চায়েতীরাজ আইনের আওতায় গ্রামীণ পানীয় জল সরবরাহ সম্পূর্ণ জিএসটি মুক্ত। আইনের সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা খাড়া করে বিভিন্ন ঠিকাদার সংস্থাকে সরকারি তহবিল থেকে মোট ২৭ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকা বেআইনিভাবে জিএসটি বাবদ পেমেন্ট করা হয়েছে, যা আসলে একটি বড় ফান্ড ট্রান্সফার জালিয়াতি।
এই বিপুল কেলেঙ্কারির পর সিএজি রাজ্য সরকারের প্রধান সচিবকে যে সমস্ত কঠোর আইনি ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছিল সেগুলি হলো, ফৌজদারি তদন্ত ও এফআইআর করতে হবে। ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করতে হবে। যে সমস্ত ঠিকাদার সংস্থা এবং পিএইচইডি’র ডিভিসনাল ইঞ্জিনিয়াররা মিলে কোনোরকম থার্ড পার্টি ইন্সপেকশন ছাড়া ৪,৮১১ কোটি ৭ লক্ষ টাকার বিল পাস করিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করতে হবে। ডিকটাইল আয়রন পাইপ না কিনেও যে ৩৩৪ কোটি ৫০লক্ষ টাকার ভুয়ো সামগ্রীর চালান দেখানো হয়েছে, তার জন্য দায়ী ভেন্ডর এবং সরকারি আধিকারিকদের চিহ্নিত করে ফৌজদারি মামলা রুজু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
CAG report
মমতা-শাসনে বিষাক্ত জল খেয়েছেন বহু মানুষ, সিএজি রিপোর্টে ফাঁস দেদার দুর্নীতি, চুপ ছিল বিজেপি
×
Comments :0