নতুনপাতা
শারদ ১৪৩৩
বইকথা
শেষ যাত্রায় বই হোক আমার সঙ্গী : অরুণ দে
২৬ অক্টোবর ২০২৬ - ৪র্থ বর্ষ
সম্প্রতি ‘বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদে’র উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে একটি শতবর্ষ স্মারক গ্রন্থ। যার মূল ভাবনা হচ্ছে ‘আমার জীবনে গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার’। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট মানুষ গ্রন্থাগার ও গ্রন্থের ব্যবহার নিয়ে কি চিন্তা-ভাবনা করছেন বা বইকে কাজে লাগিয়ে একজন ব্যক্তি কিভাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন সেকথা সমাজের বৃহত্তর অংশে পৌঁছে দিতে সংকলিত হয়েছে এই বই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ‘বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদে’র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর। তার শতবর্ষ উপলক্ষে এমন একটি স্মারক গ্রন্থের ভাবনা নিঃসন্দেহে অভিনব। বিশেষ করে আজ যখন গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকে উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত, তখন এই প্রেক্ষাপটে বাংলার বরণীয় মানুষজনের ভাবনাগুলিকে একত্রিত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। বাংলার বিশিষ্ট গ্রন্থাগার বিজ্ঞানী অসিতাভ দাশ ও প্রদোষ কুমার বাগচী এই গ্রন্থের সম্পাদনা করেছেন। তাঁদের ধন্যবাদ জানাই।
এই বইয়ের সৌজন্যে বহু মানুষের স্মৃতি সান্নিধ্য পেয়েছি। কত কী জেনেছি। অবাক হয়েছি। কর্ণেল বোধিসত্ত্ব চক্রবর্তীর লেখায় আছে প্রত্যেক মিলিটারি ছাউনিতে লাইব্রেরি থাকা আবশ্যক। এখানে সব বয়সীদের জন্য নানারকম বই থাকে। দুবাইতে সমুদ্রতীরের লাগোয়া লাইব্রেরিতে একমাত্র পড়ুয়া ছাড়া দেখভাল করার লোক নাকি নেই। রতনতনূ ঘাটী লিখেছেন সমুদ্রে মাছ ধরতে এসে বই পড়ছে তরুণী। অপূর্ব। শুধু সমুদ্র বা মিলিটারি ছাউনিতে নয়, বই কত রকমভাবে মানুষের কাছে ধরা দেয় এই বইয়ের নানা লেখায় ছড়িয়ে আছে তার পরিচয়।
ফুটবলার অতনু ভট্টাচার্যের তো জীবনে বইয়ের চেয়ে বড় বন্ধু আর কিছু ছিল না। খেলার মতো জীবনের ভারসাম্য রাখতেও যে বই দরকার তাঁর ফুটবল জীবনই তার পরিচয়বাহী। কিন্নর রায়ের কথায় বইয়ের বিকল্প কিছু নেই। অনিরুদ্ধ চক্রবর্তীরও একই মত। অরিন্দম গাঙ্গুলী সেটাকেই ব্যাপক অর্থে বলেন যে মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু বই। আর রঙের কোম্পানি বার্জার পেইন্টসের গ্রন্থাগারিক গৌতম গোস্বামীর মতে, বই মানুষের পরম বন্ধু। অবাক করা ব্যাপার। রঙের কোম্পানিতে একটি গ্রন্থাগার আছে, তার একজন গ্রন্থাগারিক আছেন ভাবতেই পারছি না। আবার জেনে মুগ্ধ হয়েছি যে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের বিশাল লাইব্রেরির বই পড়ার সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিলেন মন্দাক্রান্তা সেন।
সামগ্রিকভাবে এই বইটি নতুন বোধে জারিত করেছে আমার দেহ ও মন। চারদিকে যে হানাহানি, যত বিরোধ,সাধারণ মানুষের ওপর যত অন্যায় চাপ, তার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের একমাত্র হাতিয়ার হচ্ছে সেই জ্ঞানের মূর্ত প্রতীক যাকে আমরা বলছি বই। স্বীকার করতে লজ্জা নেই এমনভাবে কোনোদিন ভাবিনি। জীবনে বেঁচে থাকতে গেলে কত কিছুই তো অর্জন করতে হয়। আমার মাস্টারমশাই একবার এম এ পাস করার পর বলেছিলেন : আজ থেকে তুমি পড়া লেখার যোগ্যতা অর্জন করলে। ময়ূরী মিত্র বলছেন — বইকে অর্জন করতে হয়। তোমার পড়ার ইচ্ছে সুতীব্র হলেই তো বই আসবে তোমার কাছে। কথাটা আমার জীবনেও অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়ে আছে। তবে বই যে জীবনকে বেপরোয়া হতে দেয় না সেকথা জানতে পারলাম কিশোরকৃষ্ণ ব্যানার্জির লেখা থেকে। আবার খেয়ালি ঘোষ দস্তিদার লিখেছেন তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরিই তাঁকে সব সময় আগলে রাখে। আর মনের ভূবনে ডুবে বই থেকে সান্ত্বনা খোঁজার উপায় বাতলেছেন অনুপ মতিলাল। একথা সত্যি যে লাইব্রেরির কাজ পড়াশোনার নেশা জাগানো। তবে বই পড়া যে নেশা নয় একটা চমৎকার রোগ, এবং ভালো বই পড়া ও পড়ানো যে একটা পরম ধর্ম হতে পারে তার ইঙ্গিত পাওয়া গেল যথাক্রমে বিশিষ্ট ভাষাবিদ পবিত্র সরকার ও প্রবাজিকা প্রদীপ্তপ্রাণার লেখায়। আর অমৃতের খোঁজ দিলেন বিনায়ক মিশ্র। তাঁর কথায় পুস্তক পাঠ আনন্দপাঠে পরিণত হলে অমৃতের স্বাদ মেলে। সেকারণেই বোধহয় ক্রিকেটার ও কোচ রাজু মুখার্জি বলতে পারেন আই অ্যাম আ লাকী ম্যান, খেলার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর পড়েছি। আমার মৃত্যুটাও যেন হয় বই বুকে নিয়েই। তাঁর এই ভাবনা আমাকে খুবই প্রভাবিত করেছে।
সমাজের যেসব বিশিষ্ট মানুষ এই স্মারক গ্রন্থের জন্য কলম ধরেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন— শিল্পী, সাহিত্যিক, প্রশাসক, আইনজীবী, ভাষাবিদ, সরকারি উচ্চপদস্থ আধিকারিক, সাংবাদিক, সমাজহিতৈষী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, অধ্যাপক-শিক্ষক-গবেষক থেকে শুরু করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামরিক বিভাগ, সঙ্গীতজগৎ, চলচ্চিত্রজগৎ, নাট্যজগৎ, এমনকি ক্রীড়াজগতেরও স্বনামধন্য বিশিষ্ট কিছু মানুষ। এমন একটি বই উপহার দিয়ে বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদ আমাদের কৃতজ্ঞ করে রাখল।
বইটির সম্পাদকীয় অংশটি জানাচ্ছে যে এখানে ৬৬ জনের ভাবনায় তৈরি হওয়া জ্যোতিষ্মান বলয়ের একদিকে রয়েছে বর্তমানের ইঙ্গিত, অন্যদিকে উদীর্যমান ইতিহাসের আলোকধারা, কোথাও শোনা যায় ভবিষ্যতের নির্ঘোষ, কোথাও বা অনুভূত হয় গ্রন্থবোধের চিচ্ছায়া। এত বৈভিন্ন্যের মধ্যেও পাঠক কিন্তু নিঃসন্দেহে পৌঁছে যাবেন চেতনার সেই ঈপ্সিত বিন্দুতে, যা এই বইয়ের একটি বিশিষ্ট দিক বলে আমারও মনে হয়।
বইটির লেখক নির্বাচন বইটির ছাপা ও বাঁধাই এবং দেবব্রত ঘোষের প্রচ্ছদ এক কথায় অনবদ্য।
বইটি ঘরে ঘরে স্থান পাক। ছেলেমেয়েদের হাতে উঠুক। গ্রন্থাগারগুলিতে সংগৃহীত হোক এই আশাই করি।
আমার জীবনে গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার : বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদ : শতবর্ষ স্মারক গ্রন্থ
সম্পাদনা : অসিতাভ দাশ ও প্রদোষকুমার বাগচী। বঙ্গীয় গ্রন্থার পরিষদ। পি-১৩৪, সিআইটি স্কিম-৫২, কলকাতা—১৪। ৫৫০ টাকা
Comments :0