নতুনপাতা
শারদ ১৪৩৩
নতুন বারান্দা — ধারাবাহিক
মা, আমারও তো বাড়ি ফেরার কথা ছিল : সৌম্যদীপ জানা
১ নভেম্বর ২০২৬ - ৪র্থ বর্ষ
বিজয়ার সাত দিন পর কলকাতার রাস্তায় দাঁড়ালে বোঝা যায়, উৎসবেরও একধরনের মৃত্যু আছে।
সেই মৃত্যুর কোনও শোকসভা হয় না। আকাশ থেকে আলো নিভে যায়, বাঁশের কঙ্কাল খুলে নেওয়া হয়, দেবীর চোখ আঁকা চালচিত্রের জায়গায় পড়ে থাকে ধুলোর স্তর। কয়েক দিন আগেও যে রাস্তা মানুষের উল্লাসে নিজের অস্তিত্ব ভুলে গিয়েছিল, সেখানে এখন বাসের ধোঁয়া, অফিসফেরত মানুষের ক্লান্ত মুখ আর ট্রাফিক সিগন্যালের একঘেয়ে লাল-সবুজ চোখ।
শহর আবার কাজে ফিরে গেছে।
শুধু কিছু মানুষের কাছে কাজ কোনও দিন থামেইনি।
সন্ধ্যা সাতটা বেজে বারো মিনিট। শিয়ালদহ উড়ালপুলের নীচে লাল আলো জ্বলতেই মোটরবাইকটা থামাল অয়ন। পিঠে খাবার পৌঁছে দেওয়ার বাক্স, মাথায় হেলমেট, পকেটে স্মার্টফোন। ফোনের পর্দায় পরপর ভেসে উঠছে নতুন অর্ডারের বিজ্ঞপ্তি।
আরও একটি খাবার। আরও একটি ঠিকানা। আরও কিছু টাকা।
তার সামনে দিয়ে একটি মেয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। পরনে নীল জিন্স, সাদা কুর্তি, গলায় ঝোলানো ছোট্ট ক্যামেরা। ফোনে কথা বলতে বলতে সে হাসছিল। হাসির মধ্যে সেই অবাধ নিশ্চিন্ততা, যা অয়নের কাছে আজকাল অন্যের জীবনের দৃশ্য বলে মনে হয়।
মেয়েটি বলছিল, 'না রে, এ বছর পুজোটা সত্যিই জমে গিয়েছিল! দশমীর দিনও আমরা বেরিয়েছিলাম।'
অয়ন অনিচ্ছাসত্ত্বেও কথাটা শুনে ফেলল।
দশমী।
শব্দটা তার কানে এসে এমনভাবে বিঁধল, যেন কোনও পুরোনো চিঠির ভাঁজে রাখা শুকনো ফুল হঠাৎ ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল।
সে ফোনের পর্দার দিকে তাকাল।
নতুন অর্ডার।
অয়ন বাইক স্টার্ট দিল।
পুজো শেষ হয়েছে সাত দিন আগে। অথচ তার কাছে মনে হয়, পুজোটা যেন ঠিকমতো শুরুও হয়নি।
---
অয়নের বয়স তেইশ।
এই বয়সে মানুষের জীবনে অনেক কিছু প্রথমবার ঘটে। প্রথম চাকরি, প্রথম প্রেম, প্রথম নিজের উপার্জনে কেনা জামা, বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে শহর ঘোরা, পুজোর ভিড়ে হারিয়ে গিয়ে আবার খুঁজে পাওয়া। জীবনের সামনে তখনও এতগুলো দরজা খোলা থাকে যে কোন দরজা দিয়ে ঢুকবে, মানুষ বুঝে উঠতে পারে না।
অয়নের সামনে অবশ্য দরজা ছিল না, ছিল কয়েকটি দায়িত্বের হিসাব।
বাবা তিন বছর আগে একটি কারখানায় কাজ করতে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তারপর থেকে তাঁর নিয়মিত উপার্জন বন্ধ। মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করেন। ছোট বোন তিয়াশা একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। সংসার বলতে উত্তর কলকাতার একটি পুরোনো বাড়ির স্যাঁতসেঁতে ঘর, জানালার বাইরে অন্য বাড়ির দেওয়াল, আর মাসের শেষ সপ্তাহে ক্রমশ পাতলা হয়ে আসা টাকার হিসাব।
অয়ন কলেজে ইতিহাস নিয়ে পড়ত। একসময় ইচ্ছে ছিল, প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে পড়বে। পুরোনো মন্দিরের গায়ে খোদাই করা লিপি পড়বে, মাটির নীচে ঘুমিয়ে থাকা সভ্যতার দরজা খুলবে। ইতিহাসের বইয়ে আঙুল রেখে সে ভাবত, অতীতের মানুষেরাও নিশ্চয়ই আমাদের মতোই হেসেছে, কেঁদেছে, প্রেমে পড়েছে, উৎসব করেছে।
তারপর বাবার অসুখ হল।
চলবে
দশম শ্রেণী, কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ, উত্তর ২৪ পরগনা।
Comments :0