নতুনপাতা
মণ্ডা মিঠাই
আমাদের ঝুলন
গৌতম রায়
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
সেকালের ঝুলন। আমার দিদিমা নিরুপমার ঠাকুরঘরের পাশের ছোট্ট বাগানে।
আজকের ঝুলন আমি চিনি না। আজকাল ঝুলন মানে থিম, লাইট, ইউটিউব দেখে বানানো পাহাড়। সেকালে ঝুলন মানে ছিল একটা পাড়া জড়ো হওয়া। ধর্মটা উপলক্ষ্য ছিল, মানুষটাই ছিল আসল।
আমার দিদিমা নিরুপমা। ভাটপাড়ার এই বাড়িতে, ঠাকুরঘরটা ছিল একতলার উত্তর কোণে। ঠাকুরঘরের পাশে হাত তিনেকের একটা বাগান। টকটকে লাল বোগেনভিলা, সাদা একটা কামিনী আর দুটো কি তিনটে সুপুরি গাছ নিয়ে ছোট্ট বাগান। সারা বছর ওইটুকু জায়গায় দিদিমা সন্ধেবেলা জল দিত। আর শ্রাবণ মাস এলেই ওইটুকু জায়গাই হয়ে উঠত আমাদের মনের আনন্দ,প্রাণের আরাম।
দিদিমা কোনোদিনই পটের র ঈশ্বর কে শুধু ঠাকুর ভাবেনি। বলতেন, "এরা আমাদের ঘরের ছেলে-মেয়ে, শ্রাবণে বৃষ্টিতে ভিজছে, এদের একটু দোলনা করে দে।" আর সেই দোলনা বানানোর ডাক পড়ত পাড়া জুড়ে।
তখনও ভাটপাড়ায় কাঁটাতারের বেড়া ওঠেনি মনে। হিন্দু পাড়া, মুসলমান পাড়া বলে আলাদা কিছু ছিল না আমাদের কাছে। ছিল গাম্বিলদের বাড়ি। আমাদের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকেই।
গাম্বিলদের বাড়ির ছেলেরা - রফিক, সফিক, আর ছোটটা জামাল। ওরা না এলে ঝুলনই হতো না।
ঝুলনের সাত দিন আগে থেকেই আমাদের অভিযান শুরু হতো। সকালবেলা দিদিমা একটা ঝুড়ি আর একটা ছোট কোদাল ধরিয়ে দিত। বলত, "যা, মাঠ থেকে ঘাসের চাপড়া নিয়ে আয়।"
আমরা দল বেঁধে যেতাম। কোথায়? কবরস্থান মাঠে।
এখন শুনলে কেমন লাগবে, কবরস্থান থেকে ঘাস আনতাম ঠাকুরের জন্য। কিন্তু আমাদের কাছে ওটা ছিল সবচেয়ে সুন্দর মাঠ। ওখানকার ঘাস ছিল মোটা, গাঢ় সবুজ, মাটি সমেত উঠে আসত চাপড়া হয়ে। কবরের পাশের শিরীষ গাছের ছায়ায় বসে রফিকদা কোদাল দিয়ে চৌকো করে কেটে দিত। আমরা হাত লাগিয়ে টেনে তুলতাম। ঘাসের নীচে কালো ভেজা মাটি, কেঁচোর গন্ধ, আর কত রকমের ছোট ছোট শেকড়। ওই চাঙড়গুলোই ছিল আমাদের পাহাড়, আমাদের মাঠ, আমাদের গঙ্গার পার।
ওখান থেকে ফিরে যেতাম গঙ্গার ধারে। ভাটপাড়ার গঙ্গার ঘাটে তখন পাটকল চলত পুরোদমে। ঘাটের পাশে যে নরম এঁটেল মাটি জমত, আর বর্ষার জলে ধুয়ে আসা ছোট ছোট নুড়ি, সাদা-কালো পাথর - ওগুলো ছিল আমাদের সম্পত্তি। গামছায় করে বয়ে আনতাম। জামাল ছিল পাথর চেনার ওস্তাদ। কোনটা দিয়ে গুহা হবে, কোনটা দিয়ে সিঁড়ি হবে, ও ঠিক বলে দিত।
দুপুরে বাড়ি ফিরলে দিদিমার বাগানে তখন কর্মযজ্ঞ। উঠোনের এক কোণে ইট পেতে, তার ওপর তক্তা দিয়ে দোলনা। দিদিমা তার পুরোনো শাড়ি ছিঁড়ে দোলনার দড়ি বানিয়ে দিত। আর আমরা?
আমরা ওই কবরস্থান মাঠের ঘাসের চাঙড় পেতে দিতাম। একটার পর একটা। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু। ঘাসের চাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে গঙ্গার সেই এঁটেল মাটি দিয়ে রাস্তা। নুড়ি পাথর দিয়ে পাহাড়ের গা। টগর গাছের ডাল ভেঙে ছোট ছোট গাছ বসানো হতো।
আর মাটির পুতুল?
কুমোর পাড়া থেকে কেনা হতো না। দিদিমার কুলুঙ্গিতে সারা বছর জমানো থাকত। একটা রাখাল, দুটো গরু, একটা কুঁজো বুড়ি, আর অনেকগুলো হাঁস। রফিকদের বাড়ি থেকে আসত আরও অবাক জিনিস - দেশলাই বাক্স দিয়ে বানানো ঘর, সিগারেটের প্যাকেটের রাংতা দিয়ে বানানো নদী। সফিকদা রাংতাটা এমন করে পেতে দিত, মনে হতো সত্যিই জল বইছে।
সন্ধে হলেই আসল ম্যাজিক।
ঠাকুরঘরের একটা ডুম জ্বেলে দিদিমা ওই বাগানে বসত। লোডশেডিংয়ের যুগ। চারিদিকে অন্ধকার। আর আমাদের ওই ছোট্ট বাগানে একটা হলুদ আলোয় জেগে উঠত একটা গোটা পৃথিবী। আমরা সবাই গোল হয়ে বসতাম। আমি, পাড়ার আরও কয়েকটা বাচ্চা, রফিকদা, সফিকদা, জামাল। দিদিমা মাঝখানে।
দিদিমা গল্প বলত না, গানও করত না। শুধু বলত, "দ্যাখ, বৃন্দাবনটা কেমন হলো?"
আর আমরা দেখতাম। ঘাসের ওপর শিশির পড়েছে। ছোট মাটির গরুগুলো যেন সত্যিই ঘাস খাচ্ছে। রাধা-কৃষ্ণ দোলনায় দুলছে। পাশে রফিকদা বিড়ি ধরালে তার ধোঁয়াটা ওই আলোর মধ্যে দিয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে উঠত, মনে হতো পাহাড়ে মেঘ করেছে।
কোনোদিন কোনো মন্ত্র শুনিনি ওখানে। কোনোদিন কেউ বলেনি ওটা হিন্দুর ঝুলন, ওটা মুসলমানের মাঠের ঘাস। ওই কবরস্থানের মাটির গন্ধ আর ঠাকুরঘরের ধূপের গন্ধ এক হয়ে যেত। গাম্বিলদের বাড়ির ভেতর থেকে ওদের মা ডাক দিত, "রফিক, ভাত খাবি আয়।" দিদিমা হাঁক দিত, "আর একটু বোস, মুড়ি মেখেছি।" একই মুড়ির গামলায় হাত ডুবত আমাদের সবার।
আজ দিদিমা নেই। নিরুপমার ঠাকুরঘরটা আছে, কিন্তু পাশের সেই বাগানে এখন সিমেন্টের বস্তা রাখা থাকে। গাম্বিলদের বাড়ির ছেলেরা কে কোথায় চলে গেছে। কবরস্থান মাঠে এখন পাঁচিল উঠেছে। গঙ্গার ধারে আর সেই এঁটেল মাটি পাওয়া যায় না, সব বাঁধানো।
আজকাল আমার ছেলেকে ইছাপুরে ঝুলন দেখাতে নিয়ে যাই। অনেক বড় প্যান্ডেল, অনেক দামি পুতুল। কিন্তু সেই ঘাসের চাঙড়ের ভেজা মাটির গন্ধটা পাই না।
আসলে সেকালে আমরা রাধা-কৃষ্ণকে দোলনা দিতাম না, আমরা নিজেরাই একটা দোলনায় দুলতাম। একদিকে আমার দিদিমা নিরুপমা, আর একদিকে গাম্বিলদের বাড়ি। মাঝখানে একটা ছোট্ট সবুজ বাগান, যেটা কবরস্থান মাঠ আর গঙ্গার ধার থেকে বয়ে আনা মাটি দিয়ে তৈরি।
ওটাই ছিল আমাদের মিলনক্ষেত্র। ধর্মের নয়, মানুষের।
Comments :0