NATUNPATA | STORY | DUI BAI | SUKANTA MONDAL | 12 SEPTEMBER 2026 | 4th YEAR

নতুনপাতা | গল্প | দুই ভাই | সুকান্ত মন্ডল | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

NATUNPATA  STORY  DUI BAI  SUKANTA MONDAL  12 SEPTEMBER 2026  4th YEAR

নতুনপাতা

গল্প 

দুই ভাই

সুকান্ত মন্ডল 

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

আষাঢ়ের মুষলধারে বৃষ্টি নামতেই রাস্তার ধারের এক বিলাসবহুল প্রাসাদের কারুকার্য করা বারান্দার নিচে আশ্রয় নিল দুই ভাই— বড় ভাই জীবপ্রেম, আর ছোট ভাই সুর।
প্রাসাদের ভেতর থেকে তখন ভেসে আসছে তানপুরা আর তবলার মোহময় সুরের ঝংকার। ছোট ভাই সুর চোখ বন্ধ করে হেসে বলল, “দাদা শুনছিস? মানুষ আমাকে কত ভালোবাসে! হাজার হাজার বছর ধরে এই সুরের বাঁধনেই তো আমি ওদের বেঁধে রেখেছি।”
বড় ভাই জীবপ্রেম শুধু মুচকি হাসল, কিছু বলল না।
ঠিক সেই সময় এক ভিজে যাওয়া অবহেলিত পথকুকুরছানা একটু আশ্রয়ের আশায় প্রাসাদের বিশাল গেটের সামনে এসে কাঁপতে লাগল। কিন্তু ভেতরের সুর-সাধকেরা ছানাটিকে দেখামাত্রই মুখ বিকৃত করলেন। ভুরু কুঁচকে এক সাধক তাঁর মালিকে হুকুম দিলেন— “ওরে, ওটাকে এখনই তাড়িয়ে দে, নাহলে যেকোনো সময় ভেতরে ঢুকে পড়বে!”
সাধকের হুকুম মেনে মালি লাঠি হাতে সজোরে আঘাত করে তাড়িয়ে দিল অবোধ প্রাণীটিকে। মার খেয়ে ছানাটি খোঁড়াতে খোঁড়াতে একটু দূরের এক বটগাছের গোড়ায় আশ্রয় নিল এবং ভিজতে ভিজতে মায়াভরা চোখে চেয়ে রইল প্রাসাদের গেটের দিকেই। অথচ সেই একই প্রাসাদের ভেতরে হাজার হাজার টাকায় কেনা বিদেশি ফিতে-বাঁধা কুকুরেরা নরম তোষকে পরম আদরে শুয়ে আছে।
দৃশ্যটি দেখে ছোট ভাই সুরের অমলিন হাসি মিলিয়ে গেল। সে দু ফোঁটা চোখের জল ফেলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “দাদা, এরা তো শুধু সুরের মোহটুকু লালন করে। কিন্তু তোর আসল রূপ— সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা— তা তো এদের এই কঠিন হৃদয় ছুঁতে পারেনি!”
জীবপ্রেম ছোট ভাইয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “হতাশ হস না ভাই। মাটির জীবকে ভালোবাসতে না পারলে এই মাটির সুরকে কখনো সত্যি সত্যি স্পর্শ করা যায় না। এরা সুরের কায়দা শেখে, সুরের আত্মা চেনে না।”
এমন সময় প্রাসাদের ওই নির্মম ঝাড়বাতি আর প্রাসাদ ছাড়িয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীর্ণ কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এক সাধারণ বৃদ্ধা। তাঁর এক হাতে লম্বা ছাতা, অন্য হাতে একটা শুকনো নরম চাদর। মুখজুড়ে তাঁর মাটির সুরের গুনগুন শব্দ—“জন্ম মৃত্যু ভবের খেলা, সবই বিধির হাতে,শেষ বিচারে হিসাব তোর, মিলবে তাঁহার পাতে।”
বৃদ্ধা বটগাছের তলায় গিয়ে পরম মমতায় চাদর দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন ভিজে যাওয়া কুকুরের ছানাটিকে। তারপর কোলে তুলে নিয়ে গুনগুন করতে করতে ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। ছানাটিও পরম নিশ্চিন্তে মায়াভরা দৃষ্টিতে চেয়ে রইল বৃদ্ধার মুখের দিকে।
দুই ভাই দৃশ্যটি দেখে একে অপরের দিকে তাকাল। ছোট ভাই সুর শেষে আনন্দিত হয়ে দাদাকে বলল, “আমি আমার আসল সাধককে পেয়ে গেছি দাদা।”
হঠাৎ দুই ভাইয়ের নজর পড়ল প্রাসাদের ভেতরে। সাধকেরা তানপুরার সুর ও তবলার বোল থামিয়ে দিয়েছেন, কারণ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন সারতে হবে। সেই সঙ্গে পরম সমাদরে ভোজ পরিবেশন করা হচ্ছে সেই বিদেশি গলায় ফিতে-বাঁধা আদরের কুকুরদের জন্য... কারণ— ওই সাধকেরা যে পরম সুরসাধক এবং পরম পশুপ্রেমী!


 

Comments :0

Login to leave a comment