Sharodotsav

ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে আজও বসিরহাটের অন্যতম আকর্ষণ গাইনবাড়ির দুর্গাপুজো

রাজ্য জেলা

প্রবীর দাস: বসিরহাট

১৮২ বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত ধান্যকুড়িয়া গাইনবাড়ির শারোদোৎসব আজও স্বমহিমায়। ইংরেজ আমলে এই জমিদারবাড়ির পুজোয় হাজির হতেন ইংরেজ সাহেবরাও। জমিদারি প্রথা আজ আর নেই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বংশপরম্পরায় পুরনো রীতিনীতি মেনে আজও দুর্গাপুজো হয়ে আসছে গাইনবাড়িতে। জেলার বহু প্রাচীন জমিদারবাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জীর্ণ হয়ে পড়লেও গাইনবাড়ি এখনও তার ঐতিহ্য ও আভিজাত্য ধরে রেখেছে। শুধু দুর্গাপুজো নয়, বাড়িটির স্থাপত্যের টানেই এখানে সারা বছর বাংলা ও হিন্দি সিনেমা এবং ছোট পর্দার ধারাবাহিকের শুটিং চলে। স্থানীয় ইতিহাস ও পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, আনুমানিক ১৮২ বছর আগে ধান্যকুড়িয়ার তৎকালীন জমিদার গোবিন্দ চন্দ্র গাইন এই বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। পরবর্তীকালে তার পুত্র মহেন্দ্রনাথ গাইন পাটের ব্যবসা করে প্রভূত উন্নতি করেন। ব্যবসার সূত্রে ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। দুর্গাপুজো-সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর ইংরেজ ব্যবসায়িক অংশীদারদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতেন। তাদের আপ্যায়নের জন্য মূল বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে তৈরি করেন সুদৃশ্য বাগানবাড়ি, যা পরিচিত গাইন গার্ডেন নামে। গাইন গার্ডেনের স্থাপত্য আজও অতীতের ঐশ্বর্যের সাক্ষ্য বহন করছে। বাগানবাড়িতে ছিল বাঁধানো পুকুর এবং সাদা পাথরের তৈরি দুটি বিশাল সিংহের মূর্তি। বাড়ির বিশাল প্রবেশদ্বারের উপরে এক ইংরেজকে ছুরি দিয়ে সিংহ বধ করতে দেখা যায়। টাকি রোডের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গাইন গার্ডেনের প্রবেশদ্বার দেখলে অনেকেরই মনে হতে পারে, যেন কোনও দুর্গের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন তারা। পরিবারের দাবি, ইংরেজদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য তৎকালীন মার্টিন রেলের একটি অতিরিক্ত লাইনও তৈরি করা হয়েছিল, যার সঙ্গে গাইন গার্ডেনের নিজস্ব স্টেশনের যোগ ছিল।
তবে গাইনবাড়ির আসল আকর্ষণ শুধু তার স্থাপত্য নয়, প্রাচীন দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যও। সময়ের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন হলেও পুজোর মূল রীতিনীতি আজও বহমান। আগে জন্মাষ্টমীর দিন প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ শুরু হতো। বর্তমানে সেই কাজ শুরু হয় রথযাত্রার দিন থেকে। অষ্টমীর দিন সন্ধিপুজো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হয়। জমিদারি আমলে বন্দুকের গুলি ছুড়ে সন্ধিপুজোর সূচনা করা হতো। বর্তমানে সেই প্রথার পরিবর্তে বাজি ফাটিয়ে পুজো শুরু করা হয়। বংশপরম্পরায় প্রতিমা নির্মাণ, ঢাকি ও পুরোহিতের ধারাও বজায় রয়েছে। বিসর্জনের দিন একসময় এলাকার কাহার সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যেতেন। এখন সময়ের পরিবর্তনে গ্রামের ছেলেরাই সেই দায়িত্ব পালন করেন। ঐতিহ্যকে ধরে রেখেই এভাবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে গাইনবাড়ির পুজো।গাইনবাড়ির সদস্য লেখক মনোজিৎ গাইন জানান, গোবিন্দ চন্দ্র গাইনের হাত ধরে শুরু হওয়া পুজো আজও একইভাবে নিয়মনীতি মেনে হয়ে আসছে। বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকলেও দুর্গাপুজোর কয়েকটি দিন শিকড়ের টানে সবাই ফিরে আসেন ধান্যকুড়িয়ার বাড়িতে। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও এই পুজোয় অংশ নেন। জাতি, ধর্ম ও বর্ণের বিভেদ ভুলে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন সকলে। গাইনবাড়ির ঐতিহাসিক স্থাপত্যের আকর্ষণে বহু চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকের শুটিংও হয়েছে এখানে। পুরস্কারপ্রাপ্ত বাংলা ছবি ‘নগরকীর্তন’, ‘ভূমিকন্যা’ ও ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ ধারাবাহিকের শুটিং হয়েছে এই বাড়িতে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। এ ছাড়াও হিন্দি ছবি ‘সাহেব বিবি গোলাম’ এবং কয়েক বছর আগে ‘মেন্টাল’ ছবির শুটিংও হয়েছে এখানে। জমিদারি নেই, নেই সেই আগের প্রতিপত্তি। তবু ইতিহাস, স্থাপত্য ও দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ধান্যকুড়িয়ার গাইনবাড়ি। পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণের দিকে নজর রাখেন বলেই জেলার বহু প্রাচীন জমিদারবাড়ির মতো এই বাড়ি অবহেলায় হারিয়ে যায়নি। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে গাইনবাড়ির দুর্গাপুজো আজও তাই বসিরহাটের অন্যতম আকর্ষণ।

Comments :0

Login to leave a comment