মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বাতিল করল আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার এদেশের শীর্ষ আদালত জানায়, গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন দেশের আমদানি শুল্ক বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ঝড় তুলেছেন, তার কোনও আইনি বৈধতা নেই। আপতকালীন পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য যে আইনের ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা ব্যবহারের একতিয়ার তাঁর নেই। আদালতের রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ‘তাঁর কর্তৃত্বের গণ্ডি অতিক্রম করে’ ১৯৭৭ সালের একটি আইনকে শুল্ক বাড়ানোর জন্য কাজে লাগিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্প এককথায় রাজি হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে পুনরায় স্থিতিশীলতা ফিরবে বলে একাংশের তরফে দাবি করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্প স্পষ্টতই জানিয়েছেন, তিনি এই রায় মানবেন না এবং যে কোন উপায়ে বর্ধিত শুল্কই রেখে দেবেন। আদালত ও প্রশাসনের মধ্যে এই টানাপোড়েনের ফলে বিশ্ব বাজারে তুমুল অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্ধিত শুল্কের জুজু দেখিয়ে বিভিন্ন দেশের ওপর আমেরিকা যে সমস্ত একতরফা বাণিজ্য চুক্তি চাপিয়ে দিয়েছে, তা আদৌ টিকবে না ভেস্তে যাবে, তা নিয়ে আইনি সংশয় রয়েছে। এই সমস্ত চুক্তি টিকিয়ে রাখার জন্য আমেরিকা ভারত সহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলির ওপর নিশ্চিত ভাবেই চাপ তৈরি করবে। এদিকে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বাতিল হওয়ায় ভারতের বস্ত্র শিল্প কিছুটা স্বস্তি পেলেও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্য ভারতের সমস্ত রপ্তানি নির্ভর শিল্পের প্রস্তুত থাকা উচিত। বর্ধিত শুল্কের ভিত্তিতে গত কয়েক মাসে ভারতীয় সংস্থাগুলির থেকে ট্রাম্প প্রশাসন অন্তত ১০০০ কোটি ডলার আদায় করেছে। এই টাকা ফেরত দেওয়ার পক্ষে সংস্থাগুলির দাবি করা কাম্য। ট্রাম্প প্রশাসন তাতে রাজি হবে কিনা তা আপাতত অনিশ্চিত।
‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ (আইইইপিএ) নামের এক আইন ব্যবহার করে ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের আমদানি শুল্কের হার বাড়িয়েছেন। আদালতে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে, এই আইন ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্রপতির মার্কিন আইনসভা (কংগ্রেস)-র অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে সুপ্রিম কোর্ট জানায়— সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী, দেশ ও দুনিয়ায় ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে এমন যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাষ্ট্রপতিকে কংগ্রেসের অনুমতি নিতেই হবে। শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বিভিন্ন দেশের ওপর একতরফা বাণিজ্যিক চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার যে নীতি ট্রাম্প প্রশাসন নিয়েছে, তা মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদিত নয়। অতএব তা অবৈধ এবং প্রত্যাহার করতে হবে।
শুক্রবার এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প আদালতের এই নির্দেশকে ‘লজ্জাজনক’ বলে কটাক্ষ করেন। তিনি জানান, শুল্কের বর্ধিত হার রেখে দিতে তাঁর বিকল্প পরিকল্পনা রয়েছে। মার্কিন অর্থ সচিব স্কট বেসান্ট দিনকয়েক আগেই ইঙ্গিত দেন, আইনি লড়াইয়ে হেরে গেলেও বর্ধিত হারে শুল্ক রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দুটি ক্ষেত্রে এমনটা করার কথা জানানো হয়েছে— যে সমস্ত আমদানিকৃত পণ্যকে মার্কিন প্রশাসন ‘জাতীয় সুরক্ষার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে চিহ্নিত করবে তাদের শুল্ক একই থাকবে। পাশাপাশি, যে সমস্ত দেশ অনৈতিক বাণিজ্য নীতি প্রয়োগ করে বলে বাণিজ্য দপ্তর চিহ্নিত করবে, তাদের শুল্ক কমানো হবে না। তবে এসব পদ্ধতি খুব একটা কার্যকরী হবে না বলে অনুমান বিশ্লেষকদের একাংশের।
গত বছরের এপ্রিল মাসে হঠাৎ করে আমেরিকা বিভিন্ন দেশের জন্য তার আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেয়। ০ থেকে ৩ শতাংশের শুল্ক সীমা বাড়িয়ে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ করা হয়। কিছু দেশের ওপর আবার জরিমানা শুল্কও চাপানো হয়। হঠাৎ এই ঘোষণায় বাজারে ধস নামলে, ৯০ দিনের জন্য এই সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়। তার মধ্যে বিভিন্ন দেশকে চুক্তি করে নিতে বলা হয়।
আমদানি শুল্কে বৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক ও বিদেশ নীতির এক অন্যতম স্তম্ভ। এর কথিত উদ্দেশ্য ছিল— আমেরিকার শুল্ক বাবদ আয় বাড়িয়ে প্রতিবছর বাড়তে থাকা ঋণ কিছুটা শোধ করা, এবং মার্কিন ঘরোয়া শিল্পকে চাঙ্গা করে তোলা। তবে এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরি করা— এর মাধ্যমে কৃষি, মেধাস্বত্ব, প্রতিরক্ষা, খনিজ ও শিল্প উৎপাদন এবং পরিষেবা ক্ষেত্রে মার্কিন সংস্থাগুলির প্রবেশে অবাধ করা। চীন বাদে কোনও দেশই ট্রাম্পের এই হুমকি-নির্ভর দরকষাকষি প্রতিহত করতে পারেনি।
তবে ট্রাম্পের শুল্ক নীতির সব থেকে বড় ভুক্তভোগী খোদ আমেরিকার খুচরো ব্যবসায়ীরা। আমেরিকা আগাগোড়াই একটি আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি হওয়ায়, শুল্কে বৃদ্ধির জেরে হঠাৎ নানা নিত্য ব্যবহার্য পণ্যে দাম বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় পণ্য দিয়ে তা বদলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। অতএব লোকসানের মুখোমুখি হয়েছেন মার্কিন খুচরো বিক্রেতারা। মার্কিন ভোক্তাদের দৈনন্দিনের খরচ বেড়েছে। উলটোদিকে ট্রাম্প সমানে দাবি করে চলেছেন, তাঁর সফল ‘শুল্ক নীতি’-র জেরে আমেরিকার আয় প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। বিভিন্ন দেশ আমেরিকার ‘প্রভুত্ব’ স্বীকার করে ফয়সালা করতে বাধ্য হচ্ছে। দুনিয়ায় আমেরিকার প্রভাব বাড়ছে।
গত বছর আমেরিকার অন্তত ১২টি রাজ্য প্রশাসন ট্রাম্পের এই নীতিকে চ্যালেঞ্জ করে। তারা দাবি করে, এই নীতির ফলে খুচরো ব্যবসায়ীরা তুমুল সঙ্কটের মুখোমুখি হচ্ছেন। পাশাপাশি, গত ১৪ ডিসেম্বরের পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখায় কারচুপির অভিযোগও ওঠে। এই সমস্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট শুক্রবার এই রায় দিয়েছে। ফলত বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংস্থা এখন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি করছেন। এর ফলে সরকারি কোষাগারের শত শত কোটি ডলার খরচ করতে হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
Trump's tariff policy
‘সুপ্রিম’ রায়ে বাতিল ট্রাম্পের শুল্ক নীতি, কর্তৃত্বের গণ্ডি অতিক্রম করেছেন রাষ্ট্রপতি, বলল আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট
×
Comments :0