ইজরায়েলের অশকেলন শহরে দুই ভারতীয় পরিযায়ী শ্রমিককে বেধড়ক মারধরের ঘটনা ঘটেছে। বর্ণ বিদ্বেষের থেকেই এমন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি ইজরায়েলের সংবাদমাধ্যমের। দলবদ্ধ নিগ্রহের এই ভিডিও ইতিমধ্যে ইজরায়েলের বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়েছে। ভিডিওয়ে তিন জন দুষ্কৃতীকে দেখা গেলেও ঘটনার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন যুক্ত রয়েছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।
সোশাল মিডিয়া গ্রুপে পরিকল্পনা করে এই হামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। গ্রুপটি শনাক্ত করে পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে এক দল যুবক উগ্র বর্ণ বিদ্বেষী আলোচনা ও মন্তব্য করত। শহরের অশ্বেতাঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘আরব’ অভিহিত করা হত। প্রায়শই ‘ভারতীয়দের ধরতে’ অভিযান নিয়ে গ্রুপে আলোচনার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। নির্দিষ্ট ভাবে এই আক্রমণ নিয়েও সেখানে আলোচনা করা হয়েছে।
সপ্তাহখানেক আগে এই ঘটনা ঘটলেও মোদী সরকারের বিদেশ মন্ত্রক, শ্রম মন্ত্রক কিংবা কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমের কেউই এ নিয়ে কোন মন্তব্য করেনি। ঘটনা প্রসঙ্গে ইজরায়েলী সংবাদমাধ্যম ‘কান’ সূত্রে জানা যায়, অশকেলনের এক পাবলিক পার্কে দুই ভারতীয় পরিযায়ী শ্রমিকের ওপর এক দল যুবক নৃশংস হামলা চালায়। পুলিশ এই ঘটনাকে একটি পরিকল্পিত ডাকাতির চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে। কোনও প্রকার পূর্ব শত্রুতা বা বাকবিতণ্ডা ছাড়াই এই হামলার ঘটনা ঘটে। শহরের হিস্টাড্রট স্ট্রিটে ডাকাতির সন্দেহে পুলিশের জরুরি হটলাইনে খবর দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ কর্মকর্তারা প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে অশকেলনের পুলিশ প্রশাসন এই হামলার ঘটনায় জড়িত ১৯ বছর বয়সি দুই স্থানীয় যুবককে গ্রেপ্তার করে।
ইজরায়েলের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পুলিশের তদন্তের দাবি এই আক্রমণ আগে থেকে পরিকল্পিত ছিল। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মূল অভিযুক্ত ওশের গেটা ইউনিসোর (১৯)-র পাঠানো এক ইনস্টাগ্রাম ম্যাসেজের মাধ্যমে, যা সে তার বন্ধু এলিওর বাল্টা (১৯)-কে পাঠায়। ইউনিসো লেখে, তারা ‘ইন্ডিয়ানদের ধরতে’ যাচ্ছে। এই শব্দবন্ধক সরাসরি ভারতীয় পরিযায়ী শ্রমিকদের লক্ষ্যবস্তু করার এক স্পষ্ট ইঙ্গিত।
বার্তাটি পাঠানোর কিছু সময় পরেই পার্কের কাছের এক সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা যায়, ইজরায়েলে কর্মরত দুই ভারতীয় পরিযায়ী শ্রমিক কাজ শেষে কেনাকাটা করে ফিরছেন। অভিযুক্তরা ওই ব্যক্তিদের অনুসরণ করছে। তাদের সঙ্গে একজন নাবালক সহযোগীও ছিল, যার পরিচয় প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
অভিযুক্তরা প্রথমে একটি দোকানের সামনে অপেক্ষা করে এবং পরে ভুক্তভোগীদের অনুসরণ করে একটি পাবলিক পার্কে ঢুকে পড়ে। সেখানে তারা অতর্কিতে হামলা চালায়। হামলার সময় অভিযুক্তরা ওই ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত বিদেশি কর্মীরা সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচতে সক্ষম হন।
পুলিশের ধারণা, পরিযায়ী শ্রমিক হওয়ায় তাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। অভিযুক্তরা তাদের ‘সহজ শিকার’ হিসেবে গণ্য করেছিল। সোশাল মিডিয়ায় তাদের মন্তব্য ও পরস্পরকে করা ম্যাসেজে স্পষ্ট, এই ধরণের হামলা তারা প্রায়শই করে থাকে। ওই এলাকায় এটা মোটেই নতুন নয়। পরিযায়ী শ্রমিকদের যে নিরাপত্তা জনিত ঘাটতি রয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে তাদের ওপর বর্ণবিদ্বেষী হিংস্র আক্রমণ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত, অভিযোগ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের। অভিযুক্তরা মনে করে, ভাষাগত সমস্যা এবং স্থানীয় বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় এই শ্রমিকরা হয়ত পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে পারবে না।
স্থানীয় প্রশাসন দুই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিদেশী নাগরিকদের ওপর সহিংস হামলা এবং ডাকাতির চেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। মামলায় বলা হয়েছে, আক্রান্তেরা দূর দেশ থেকে অতি সামান্য উপার্জনের আশায় আসেন। অভিযুক্তরা বলপ্রয়োগ করে তাঁদের সেটুকুও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
এই ঘটনা অন্তত এক সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও নয়াদিল্লির তরফে কোন প্রতিক্রিয়া মেলেনি। আক্রান্তদের নাম পর্যন্ত সরকারের তরফে প্রকাশ করা হয়নি, ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসা দূরস্থ। ইজরায়েলে ভারতীয় পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর বর্ণ বিদ্বেষী হামলা নতুন নয়। এর আগেও বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে। ইজরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাতেও ভারতীয় পরিযায়ী শ্রমিকরা নিহত হয়েছেন। তবে কোন ক্ষেত্রেই ক্ষতিপূরণ কিংবা নিহতদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
২০২৩-র অক্টোবর থেকে গাজায় সংঘাত শুরু হলে ইজরায়েলে প্যালেস্তিনীয় সস্তা শ্রমের জোগান বন্ধ হয়। তাদের অভাব মেটাতে ইজরায়েলী ঠিকা সংস্থাগুলি ভারত থেকে শ্রমিক নিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। এ নিয়ে ডিসেম্বরে ইজরায়েল ও ভারতের সরকারের মধ্যে চুক্তি হয়। প্যালেস্তিনীয়দের থেকে ভারতীয় শ্রমিকদের মজুরি কম। ফলত ইজরায়েলের জন্য তাঁরা বেশ লাভজনক।
২০২৪-র শুরু থেকেই ‘ইজরায়েলে কাজের সুযোগ!’ বলে বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যের সরকার বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। এ ব্যাপারে সব থেকে এগিয়ে থাকে বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশ। ‘‘ইজরায়েলে ছুতোর, কামার, নির্মাণ শ্রমিকের ১০ হাজার শূণ্যপদ রয়েছে। মাসে ১ লক্ষ ৩৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন।’’ এমন নানা লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দেয় যোগী সরকার। হাজার হাজার তরুণ উত্তর প্রদেশ সরকারের এই ‘প্রকল্পে’ নাম লেখান। আবেদনকারীরা জানান, দেশে কাজ নেই। পেটের দায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইজরায়েলে যেতেও তারা রাজি।
এসবের মধ্যেই ইজরায়েলের ঠিকাদার সংস্থাগুলি শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মজুরির নিশ্চয়তা, আইনি সুরক্ষা, ইত্যাদি সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য গোপন করেন। এই সংক্রান্ত কোন তথ্য ইজরায়েলের সরকারের তরফেও প্রকাশ করা হয়না। তবে মোদী সরকারের এ নিয়ে কোন মাথাব্যাথা লক্ষ্য করা যায়নি। ইজরায়েল-বশ্যতায় মগ্ন হয়ে বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি সরকার তাদের ঠিকাদার সংস্থাগুলিকে সস্তা শ্রমিক যোগান দেওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ইজরায়েল ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের যতই দাবি করুক, তাতে আপ্লুত হয়ে হিন্দুত্ববাদীরা ‘গাজার কায়দায়’ এদেশের সংখ্যালঘুদের ‘শায়েস্তা করার’ যতই জিগির তুলুক— ওদেশে ভারতীয় পরিযায়ী শ্রমিকরা যে একেবারেই নিরাপদ নন এই ঘটনা তারই প্রমাণ। সম্প্রতি কংগ্রেস নেতা পবন খেরা এই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের ব্যর্থতা আজ ভারতীয় শ্রমিকদের ইজরায়েলে কাজ খুঁজতে বাধ্য করেছে। সেখানে শ্রমিক পাঠানোর সময় সরকার ভারত-ইজরায়েল ‘বন্ধুত্বের’ জয়গান গায়। অথচ যখন আমাদের দেশের মানুষ সেখানে বর্বরোচিত আচরণের শিকার হন, তখন তারা নীরব হয়ে যায় এবং সব দায় ঝেড়ে ফেলে। বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্করের উচিত অবিলম্বে এই বিষয়টি খতিয়ে দেখা, আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে তাঁর জন্য পর্যাপ্ত ও বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। প্রধানমন্ত্রী মোদী শীঘ্রই ইজরায়েল সফরে যাচ্ছেন। সেখানে তিনি কী ভারতীয় নাগরিকদের ওপর হওয়া এই বর্ণবিদ্বেষী হামলার বিষয়টি উত্থাপন করবেন?’’
Israel Indian Worke5
ইজরায়েলে বর্ণবিদ্বেষী হামলার শিকার দুই ভারতীয় শ্রমিক
×
Comments :0