৭৬-এ পা রাখছেন নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী। বৃহস্পতিবার আলোয় সাজবে নেতাজীর শহর, ক্ষুদিরামের রাজ্য। হাওড়া ব্রিজ, কলকাতা বন্দর— আলোয় মাখামাখি হয়ে মগ্ন রাখবে নদীর পার থেকে অনেক দূর পর্যন্ত।
শুধু কি সেতু আর বন্দর? জ্বলবে ‘আশীর্বাদ কি দিয়া’— ঘরে ঘরে। উদ্যোগ বিজেপি’র। খরচ হয়েছে দেদার টাকা প্রদীপ কেনায়। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিন উপলক্ষেই ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্বয়ং পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অথচ তিনি আজও নারদ স্টিং অপারেশনে অভিযুক্ত। আর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে, ৬৪ বছরের মোদীর ঘোষণা ছিল ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা।’
আজ সেই প্রধানমন্ত্রীর আলো জন্মদিনে লাখো প্রদীপে গঙ্গায় অন্ধকার মুছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সেই শুভেন্দু অধিকারীই। আজ মোদীর স্নেহের দিয়ার আলো ঘিরে আছে অধিকারীকে। ‘ডবল ইঞ্জিন’-এর সংকল্পের এই রাজ্যের প্রধান ধারকও তিনি। বুধবার রাজ্যের অন্যান্য মন্ত্রীরা ভিডিও বার্তায়, ভাষণে এই আহ্বান জানিয়েছেন। বিজেপি’র বিধায়করা নিজের নিজের এলাকায় প্রদীপ বিলিও করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, এদিন সন্ধ্যায় কলকাতার গঙ্গার ঘাটে জ্বলে লাখো প্রদীপ। এদিন থেকেই দেশে বিজেপি শুরু করছে ‘সেবা সংকল্প অভিযান।’ চলবে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত। সেদিন মোদীর মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে ২৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন স্বাভাবিক তাঁর শাসনে পশ্চিমবঙ্গ কী আশীর্বাদ লাভ করেছে? মমতা ব্যানার্জি এবং তাঁর সাকরেদদের বাধায় রাজ্য থেকে শিল্প কারখানা যেতে পেরেছিল গুজরাটে। তা তৃণমূলের ‘আশীর্বাদ।’ কিন্তু এই রাজ্যের প্রতি নরেন্দ্র মোদীর ‘দিয়া’ জ্বালানোর নিদর্শন আছে ক’টি?
২০১৪-য় মোদী লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে রাজ্যে এসে মমতা ব্যানার্জির ছবি ১ কোটি টাকায় সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেনের কেনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই সারদা কোলেঙ্কারির তদন্ত আজও শেষ হয়নি কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলির। মমতা ব্যানার্জি সারদায় ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের বেশিরভাগের টাকা ফেরত দেননি।
২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচনের আগে মোদী বলেছিলেন যে, সব দুর্নীতিগ্রস্তকে জেলে ভরবেন। কিন্তু সারদা, নারদ স্টিং অপারেশন, কয়লা পাচার, গোরু পাচার, ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্যদের চাকরি দেওয়ার দুর্নীতি কিংবা সাম্প্রতিক রেশন দুর্নীতি— তৃণমূলের কোনও দুর্নীতির বিরুদ্ধেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্ত শেষ হয়নি। রাঘব বোয়ালদের কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি। এবারও নারদ স্টিং অপারেশনে টাকা নিতে যাদের দেখা গেছিল যাদের সেই অভিযুক্তদের অনেকে এখন এনসিপিআই দলের আড়ালে নিজেদের ঢেকে সেই বিজেপি-ঘনিষ্ঠ। যেমন কাকলী ঘোষ দস্তিদার।
নারদ স্টিং অপারেশনে যাঁদের ঘুষ নিতে দেখা গিয়েছিল তাঁদের অন্যতম শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর তিনি বিশেষ ঘনিষ্ঠ, স্নেহের মানুষ।
আবার ২০১৪-য় যাওয়া যাক। সেবার নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ছিল কালো টাকা উদ্ধার হবে। দেশবাসীর অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে পৌঁছবে। ২০১৯-র ইশ্তেহারে সে-সবের ধার মাড়াননি মোদী। এখন তো সেই প্রশ্নে একটি বাক্যও শোনা যায় না প্রধানমন্ত্রীর মুখে। উলটে কালো টাকা ইলেক্টোরাল বন্ড মারফত বিজেপি, তৃণমূলের তহবিলে পৌঁছে গিয়েছে।
আবার ২০১৪-য় যাওয়া যাক। তখন এপ্রিল। নরেন্দ্র মোদী তখনও প্রধানমন্ত্রী হননি। কলকাতার একটি সংবাদপত্রের সাক্ষাৎকারে মোদী জানিয়েছিলেন, ‘‘এখন, যখন আমি গুজরাটের বাইরে এসে সারা দেশের উন্নয়নের কথা চিন্তা করি, আমার সিঙ্গুরের জন্যও একটি ভাবনা আছে।’’ সেই ভাবনা কী? আজও অজানা রয়ে গেছে তা। সেই ‘ভাবনা’-র আশ্বাস পেয়েই চিঠি লিখেছিল সিঙ্গুর শিল্প বিকাশ ও উন্নয়ন কমিটি। দিনটি ছিল ২০১৪-র ২৮ জুলাই। জবাব আসেনি। ১২ বছর পার হয়ে গিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের গত বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী পানিহাটির সভায় বলেছিলেন,‘‘৪ মে বিজেপি সরকার গঠন করার পর মেয়েদের উপর হওয়া সব অন্যায়-অত্যাচারের ফাইল খুলবে। এটাই মোদীর গ্যারান্টি।’’ রাজ্যে বিজেপি’র সরকার চার মাস পেরিয়েছে। প্রায় ১২০ দিনে একটি পাইলও কি খুলেছে? খোলেনি। বরং পানিহাটির যিনি বিজেপি’র বিধায়ক হয়েছেন, আর জি কর হাসপাতালে নিহত তরুণী চিকিৎসকের সেই মা এখনও খুশি নন সিবিআই তদন্তে। সিবিআই নিজের ফাইল চালু করলো না কেন? প্রধানমন্ত্রীই বা নতুন ফাইল খোলার নির্দেশ দিলেন না কেন? যে যে পেন ড্রাইভে সেই হাসপাতালের এমারজেন্সি ভবনের চারতলার সেমিনার রুমে ঘটনার দিন, ৮ আগস্ট রাত দশটা থেকে ৯ আগস্ট সকাল দশটা পর্যন্ত যাবতীয় গতিবিধির সিসিটিভি ফুটেজ ছিল, সেই পেন ড্রাইভ সিবিআই সংগ্রহ করারই চেষ্টা করেনি। কেন? কথা ছিল সব ঘরে পানীয় জল যাবে। আজও যায়নি। সব ঘরের পাকা ছাদ— হয়নি ১২ বছরে।
তবু বিশাল আয়োজন মোদীর জন্মদিনের। যেমন, কলকাতা বিমানবন্দরে ২৪ দিনের একটি যাত্রী পরিষেবা অভিযান শুরু করবে এয়ারপোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। হাওড়া ব্রিজও আলোকসজ্জায় সাজিয়ে তোলা হবে। এএআই-এর মতে, এই ২৪ দিনে ২৪টি যাত্রী-কেন্দ্রিক থিম থাকবে, যার লক্ষ্য হলো যাত্রী পরিষেবার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা ও উন্নত করা। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো যাত্রী পরিষেবা জোরদার করা এবং আরও সহজলভ্য ও ইতিবাচক বিমানবন্দর অভিজ্ঞতার প্রচার করা। সরকারি টাকায় এমন উদ্যোগ আরও অনেক মন্ত্রকই নিয়েছে।
Modi
তাঁর গ্যারান্টির দিয়ায় কতটুকু আলো জ্বলেছে বিধ্বস্ত রাজ্যে
×
Comments :0