শ্যামল চক্রবর্তী
শুরুর কয়েকটি কথা
১৭৮৪ সাল। কলকাতায় গড়ে উঠল এশিয়াটিক সোসাইটি। প্রায় শতাব্দী পর ১৮৭৬ সালে ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার গড়ে তুললেন ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কালটিভেশন অব সায়েন্স’। গোড়ার দিকে এশিয়াটিক সোসাইটিতে অনেক বছর ভারতীয় নেটিভদের সদস্যপদ লাভের কোনও সুযোগ ছিল না। ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ঘোষণা করলেন, তাঁর গড়া প্রতিষ্ঠানে শুধু ভারতীয় নেটিভরাই গবেষণা করবেন। প্রতিষ্ঠানটি গড়ার পেছনে স্বদেশিকতার এক অনুচ্চারিত প্রত্যয় যে মহেন্দ্রলালের মনে স্পন্দিত হয়েছিল, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
ভারতে আধুনিক বিজ্ঞানের দুই স্থপতি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু ও বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। ১৮৯৫ সালে এই দু’জনের হাতে সম্পাদিত হলো তাঁদের গবেষণা জীবনের সবসেরা আবিষ্কার। জগদীশ চন্দ্র আবিষ্কার করলেন মিলিমিটার তরঙ্গ যার প্রয়োগ আধুনিক প্রযুক্তির বর্তমান জগতেও অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে চলেছে। ১৮৯৫ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র তৈরি করলেন ‘মার্কিউরাস নাইট্রাইট’ নামের এক অভিনব যোজ্যতাসম্পন্ন যৌগ। মনে রাখতেই হয় আমাদের, এমন এক সময়ে এই যৌগের আবিষ্কার, পরমাণুর নিউক্লিয়াস দূরে থাক, ইলেকট্রনও আবিষ্কৃত হয়নি। বহু নাইট্রাইট যৌগ নিয়ে কাজ করেছেন প্রফুল্ল চন্দ্র, যার জন্য পশ্চিমের রসায়নবিদেরা তাঁকে ‘মাস্টার অব নাইট্রাইটস’ নামে অভিহিত করেছিলেন।
১৮৯৫ সালে নীলরতন ধরের বয়স তিন বছর। জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখার্জি, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ও মেঘনাদ সাহার বয়স দুই বছর। জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, নিখিলরজ্ঞন সেন ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বয়স এক বছর। প্রতিটি নামের সঙ্গে সাক্ষর বাঙালি মানুষ পরিচিত। বিজ্ঞানের এই একগুচ্ছ মেধাবী ছাত্র প্রেসিডেন্সি কলেজে জগদীশ চন্দ্র ও প্রফুল্ল চন্দ্রের পাঠদানে গড়ে উঠেছিলেন। এককথায় বলতে গেলে, স্বাধীনোত্তর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বলতে গেলে, স্বাধীনোত্তর ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পরিকাঠামো মুখ্যত এঁদের হাতেই গড়ে উঠেছে।
সত্যেন্দ্রনাথের ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন
সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৮৯৪ সালের পয়লা জানুয়ারি সুরেন্দ্রনাথ বসু ও আমোদিনী দেবীর সংসারে উত্তর কলকাতার গোয়াবাগানে সত্যেন্দ্রনাথের জন্ম হয়। শুরুতে নর্মাল স্কুল, তারপর কাশী বোস লেনের নিউ ইন্ডিয়ান স্কুল ও শেষে হিন্দু স্কুলে তিনি লেখাপড়া করেন। যখন হিন্দু স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ, তখন স্কুলের হেডমাস্টারমশায় ছিলেন লব্ধপ্রতিষ্ঠ শিক্ষক রসময় মিত্র (১৮৫৯-১৯৩১)। সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান লিখেছে, ‘তাঁর নিঃস্বার্থ কর্মনিষ্ঠা, সুনিপুণ পরিচালনা ও মহান ব্যক্তিত্বের প্রভাবে হিন্দু স্কুলের পূর্ণ জাগরণ ঘটে।’ তিনি অবসর নেওয়ার পর সংবর্ধনা সভা থেকে ছাত্ররা ঘোড়ার বদলে নিজেরা টেনে নিয়ে তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল। এমন হেডমাস্টারমশায়ের প্রভাব ছাত্র সত্যেন্দ্রনাথের জীবনে নিশ্চয়ই ছাপ ফেলেছে। আর ছিলেন গণিতের মাস্টারমশাই উপেন্দ্রনাথ বকসি। গণিতের উত্তরপত্রে জটিলতম একটি অঙ্কের একাধিক নিয়মে সমাধান করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। উপেন্দ্রনাথ বিস্মিত। ‘গরিব’ মাস্টারমশাই ছাত্র সত্যেন্দ্রনাথকে কী পুরস্কার দিতে পারেন? গণিতে তিনি সত্যেন্দ্রনাথকে ১০০ -র মধ্যে ১১০ দিয়েছিলেন। স্কুলে গণিতের মাস্টারমশাইরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতেন, ‘এই ছেলে একদিন বড় গণিতজ্ঞ হবে। ওকে দেখলে লাপলাস বা কোচির কথা মনে পড়ে।’ ১৯০৮ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল সত্যেন্দ্রনাথের। পাণবসন্ত হওয়ায় দিতে পারেননি। একবছর পরে পরীক্ষা দিলেন। পঞ্চম স্থান পেলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে এসে আই এসসি ক্লাসে ভরতি হলেন। ১৯১১ সালে আই এসসি পরীক্ষায় প্রথম হলেন। আই এসসি ক্লাসে সত্যেন্দ্রনাথের সহপাঠী ছিলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখার্জি ও নিখিলরঞ্জন সেন।
আই এসসি পাশ করে বি এসসি পড়ছিলেন যখন, তখন সহপাঠী হিসাবে তিনি মেঘনাদ সাহাকে পেলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন মেলভিন পার্সিভাল। কোনও ছাত্র সর্বোকৃষ্ট উত্তর দিলেও অধ্যাপক পার্সিভাল উত্তরপত্রে তাকে শতকরা ষাট নম্বরের বেশি দিতেন না। শুধু সত্যেন্দ্রনাথের ইংরেজি উত্তরপত্রে পার্সিভাল শতকরা সত্তর ভাগ নম্বর দিয়েছিলেন। ষাট নম্বর দিয়ে আলাদা করে পাশে ‘১০’ যোগ করেছিলেন। আর লিখেছিলেন, ‘দিস বয় ইজ এ জিনিয়াস’। কোনও অভিভাবক এর পর নিশ্চয়ই সত্যেন্দ্রনাথের ইংরেজি বিদ্যার জ্ঞান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবেন না।
১৯১৩ সালে বি এসসি পরীক্ষার ফল বেরোলো। সত্যেন্দ্রনাথ প্রথম, মেঘনাদ সাহা দ্বিতীয় ও নিখিলরঞ্জন সেন তৃতীয় হয়েছেন। তিনজন-ই মিশ্র গণিতের (বর্তমান ফলিত গণিত) স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হন। এম এসসি পরীক্ষাতেও সত্যেন্দ্রনাথ প্রথম, মেঘনাদ দ্বিতীয় হলেন। স্যার আশুতোষের আহ্বানে রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে যোগ দেন এঁরা দু’জনেই। আরও একজনের কথা বলতে হয়। শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষ। পদার্থবিদ্যায় প্রথম হয়েছিলেন। তাঁকে স্যার আশুতোষ পদার্থদিয়্যার ল্যাবরেটরি গড়ার ভার দিয়েছিলেন। সক্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী শৈলেন্দ্রনাথ ইংরেজের পুলিশ ধরতে এলে জাহাজের খালাসির ছদ্মবেশে বিদেশে পালিয়ে যান।
অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ
গবেষণা জীবনের প্রথম দুটি গবেষণাপত্র ১৯১৮ ও ১৯১৯ সালে বন্ধু মেঘনাদের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত হয়। এদিকে তিন বন্ধুতে ফন্দি এঁটেছেন, বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন ও মিনকাউস্কির সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের উপর প্রকাশিত জার্মান ভাষায় লেখা গবেষণাপত্রগুলি ইংরেজিতে অনুবাদ করে ইংরেজি ভাষাভাষী মানুষদের কাছে পৌঁছে দেবেন। লেখাগুলি অনুবাদ করলেন মেঘনাদ ও সত্যেন্দ্রনাথ। দীর্ঘ ভূমিকা লিখলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২০ সালে সেসব অনুবাদ বইয়ের আকারে প্রকাশ করেছিল।
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বন্ধু জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ রসায়ন বিভাগে যোগ দিয়েছেন ঢাকায়। সত্যেন্দ্রনাথও প্রতিষ্ঠার বছরেই পদার্থবিদ্যা বিভাগে রিডার পদে যোগদান করেন। এবার আমাদের সেই স্মরণীয় ও বহুকথিত আখ্যানে আসতেই হয়। ‘Planck’s Law and the Light Quantum Hypothesis’ শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র সুপরিচিত জার্নালেই পাঠিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। সেটি ‘অমনোনীত’ শিরোপা (!) পেয়ে ফেরত এল। তার ঠাঁই হলো আবর্জনার ঝুড়িতে। বন্ধু জ্ঞানচন্দ্রের চোখে পড়তেই তার উদ্ধার। ১৯২৪ সালের ৪ জুন সত্যেন্দ্রনাথ গবেষণাপত্রটি সোজাসুজি আইনস্টাইনের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। সারবত্তা থাকলে মুদ্রণে সহায়তার অনুরোধ জানান। আইনস্টাইন অভিভূত। এ তো বিজ্ঞানের এক বড় কাজ। নিজে আইনস্টাইন তা মুদ্রণের সুপারিশ করেন। ১৫জুন তারিখে আইনস্টাইনের কাছে আরও একটি গবেষণাপত্র পাঠানো হয়। আইনস্টাইন সেই গবেষণাপত্রেরও মুদ্রণের ব্যবস্থা করেন। ১৯২৫ সালে তৃতীয় গবেষণাপত্র পাঠান। সেটি প্রকাশিত হয়নি। আইস্টাইনের মহাফেজখানাতেও হদিশ পাওয়া যায়নি। এদিকে বন্ধুদের অনেকেই বৃত্তি নিয়ে বিদেশে গবেষণার কাজে পাড়ি দিয়েছিলেন। শর্ত ছিল ‘অবিবাহিত’ হতে হবে। তিনি যে ১৯১৪ সালেই বিয়ে করে ফেলেছেন! শ্বশুরালয়ের অর্থ ছিল যথেষ্ট। সেই অর্থে তিনি যে বিদেশে যাবেন না, আগেই মনস্থির করে ফেলেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর তিনি বিদেশে যান। ১৯২৪ সালের ১৮ অক্টোবর প্যারিস শহরে পৌঁছান। ভারতীয় ছাত্র-সমিতির আস্তানায় ঠাঁই নিলেন। তখন প্রবোধচন্দ্র বাগচী (পরে বিশ্বভারতীর উপাচার্য) ছাত্র-সমিতির সম্পাদক। স্মৃতিকথায় লিখেছেন প্রবোধচন্দ্র, ‘দেশে যে সব ছাত্র বিপ্লবী বলে মার্কামারা ছিল, সে আমলের ব্রিটিশ সরকার যাদের সুনজরে দেখতেন না, এই অ্যাসোসিয়েশন ছিল তাঁদের আশ্রয়।’ ইচ্ছে ছিল সত্যেন্দ্রনাথের, সুযোগ পেলে তিনি বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড ও উইলিয়াম ব্রাগের কাছে কাজ করবেন। সে সুযোগ হয়নি। মাদাম কুরির সঙ্গে দেখা হলো। কথা হলো। মাদাম ৩/৪ মাস অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। নোবেলজয়ী লুই দ্য ব্রগলির অগ্রজ মরিস দ্য ব্রগলির কাছে কিছুদিন রঞ্জনরশ্মি নিয়ে গবেষণা করেন সত্যেন্দ্রনাথ। ১৯২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মাদাম কুরির ল্যাবরেটরিতে কয়েকমাস কাজ করেন তিনি। বার্লিনে আইনস্টাইনের কাছে কয়েকবার যান সত্যেন্দ্রনাথ। বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের বাইরে নানা বিষয়ে কথা হতো। অনেক বছর পরের কথা। ১৯৪৫ সালে আইস্টাইন একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন। ৬৪টি সহ-সমীকরণ এগোবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। তার সমাধান করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। ভেবেছিলেন, ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে আপেক্ষিকতার পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে দু’জনের দেখা হবে। তা আর হলো না। ১৮ এপ্রিল আইনস্টাইন চিরকালের মতো চলে গেলেন। শোনা যায়, সত্যেন্দ্রনাথ সেসব গাণিতিক সমাধানের কাগজগুলি টুকরো টুকরো করে আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছিলেন।
১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় ফিরে এলেন সত্যেন্দ্রনাথ। ১৯২৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান পদে যোগ দিলেন। বিজ্ঞানী শ্যামাদাস চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ঢাকায় এসে সত্যেন্দ্রনাথ পরীক্ষণ পদার্থবিদ্যা র দিকে নজর দিয়েছেন। শুধু পদার্থবিদ্যা কেন, রসায়নেও তাঁর একাধিক গবেষণাপত্র রয়েছে। ভারতীয় বিজ্ঞানের অন্যতম সেরা এক চরিত্র কে এস কৃষ্ণান। তিনি ঢাকায় কিছুকাল পড়িয়েছেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘অধ্যাপক বোস জটিল সব সমস্যার সমাধান করতেন। সমাধান হয়ে গেলেই কাজ শেষ। আর উৎসাহ নেই। কাগজগুলি সব বাজে-কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেন, জার্নালে পাঠান না।’
মানুষ সত্যেন্দ্রনাথ
১৯৪৫ সালে সত্যেন্দ্রনাথ ঢাকা থেকে এসে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে খয়রা অধ্যাপক পদে যোগ দেন। ঢাকায় থাকতে সংস্কৃতি গজতের মানুষদের সঙ্গে মেলবন্ধন তৈরি করেছিলেন। তৈরি হয়েছিল ‘বারোজনা’ নামের এক ক্লাব। ক্লাবের সদস্য সকলেই বিখ্যাত। রমেশচন্দ্র মজুমদার, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীশরঞ্জন খাস্তগীর, অন্নদাশঙ্কর রায়, সুশোভন সরকার প্রমুখ ছিলেন। অন্নদাশঙ্কর লিখেছেন, একদিন আসরে এসে সত্যেন্দ্রনাথ বলছেন, ১৯৩৯ সালে ফরাসিরা যে ক’জন কমিউনিস্টকে ধরেছিল, তাঁদের শেষপর্যন্ত কী হলো? সে কথা জানতে তিনি ফরাসি দেশে বন্ধুদের লিখে ইতিহাস বই আনিয়েছিলেন। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথের ছাত্র ও পরে ঢাকায় একই বিভাগের সহকর্মী। তিনি লিখলেন, ঢাকায় পরিসংখ্যানবিদ্যা বিভাগ তৈরির জন্য সত্যেন্দ্রনাথ তাঁকে বন্ধু প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের কাছে পাঠিয়েছিলেন। বিশেষ অনুরোধ করেছিলেন, মোতাহার হোসেনকে যেন ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সত্যেন্দ্রনাথ নিজে সঙ্গে করে মোতাহারকে নিয়ে বন্ধুর কাছে এসেছিলেন। মোতাহার হোসেনের হাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গণিত বিভাগ’ নাম বদল করে ‘গণিত ও পরিসংখ্যানবিদ্যা বিভাগ’ হিসাবে পরিচিত হয়। পরিণত বয়সে মোতাহার হোসেন ‘জাতীয় অধ্যাপক’ এর আসন লাভ করেন।
১৯৪৮ সাল। দেশ স্বাধীন হয়েছে। মেঘনাদ সাহা অনেকদিন আগেই এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলকাতায় এসেছেন। সত্যেন্দ্রনাথও চলে এসেছেন। এই বছরে মেঘনাদ প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স’। সত্যেন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা করেন ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’। ১৯৪৭ সালের ১৮ অক্টোবর রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজের এক সভা থেকে পরিষদ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। পাঁচটি লক্ষ্য স্থির হয়। প্রথম লক্ষ্য ছিল, সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি’ গড়ে তোলা। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রকট অভাব তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়নি। এদেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে সত্যি। বৈজ্ঞানিক মননশীলতা আজও গড়ে ওঠেনি। এখনো তো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তার বিসর্জনের পথ প্রশস্ত হচ্ছে। পরিষদ থেকে বাংলায় পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালের ২৫ জানুয়ারি পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসে ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ নামাঙ্কিত পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বের হয়। আজও নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে এই পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে।
ছাত্রজীবন থেকেই সত্যেন্দ্রনাথের উদার মনের পরিচয় পাওয়া যায়। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রকাশিত ভক্তিপ্রসাদ মল্লিকের লেখা সত্যেন্দ্রনাথের উপর বইটি পড়ে আমরা জানতে পারি, সত্যেন্দ্রনাথ নিজেই বলছেন, ‘...আমাদের সমাজ জাতপাত বর্জিত নয়। মেঘনাদের মতো একটি বাছাই ছেলেকেও জাতপাতের যন্ত্রণা সইতে হয়েছিল। হিন্দু হস্টেলে উচ্চবর্ণের ছেলেদের সঙ্গে তার খাবার অধিকার ছিল না। ... আমি, জ্ঞান (ঘোষ ও মুখোপাধ্যায়) হামেশা ওকে নিয়ে একসঙ্গে রাতের খাওয়া খেতুম। ...নিজেদের সমাজ ব্যবস্থাকে ধিক্কার না দিয়ে পারতুম না।’ জাতপাত ও বর্ণের পাষাণ আজও এই সমাজের বুকে চেপে বসে আছে।
১৯৫৩ সালে বুদাপেস্টে শান্তি সম্মেলনে যোগ দেন সত্যেন্দ্রনাথ। তখন সোভিয়েত সফরে গিয়েছিলেন। আইনস্টাইনের আমন্ত্রণে সত্যেন্দ্রনাথ আমেরিকা যেতে চাইলে তাঁকে ভিসা মঞ্জুর করা হয়নি। ১৯৪০-এর দশকের শেষদিক থেকে ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিক পর্যন্ত কুখ্যাত যোসেফ ম্যাকার্থির নিপীড়ন চলছিল আমেরিকায়। কেন আগে সোভিয়েতে গিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ, সেই অপরাধে তাঁকে ভিসা দেওয়া হয়নি। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বর্ষণের ঘটনা তাঁকে প্রবলভাবে বিচলিত করেছিল। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের আমৃত্যু সভাপতি ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। প্রতিবছর ৬ আগস্ট হিরোশিমা দিবসে পরিষদ শান্তিমিছিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা যোগ দেয় সেই মিছিলে। ঢাকায় সত্যেন্দ্রনাথের প্রতিবেশী ছিলেন বুদ্ধদেব বসু ও প্রতিভা বসু। ‘জীবনের জলছবি’ বইয়ে প্রতিভা বসু লিখেছেন, ‘...সত্যেন্দ্রনাধথ বসুর বেতন ছিল বারোশো টাকা। ...বহু ছাত্র, বহু দরিদ্র অভাজন অংশীদার হতো সেই উপার্জনে। যারই প্রয়োজন তাকেই সাহায্য করতেন। ...কখনও মনে রাখতেন না কাকে কী দিলেন।’
‘পরিচয়’ বাংলার এক সুপরিচিত সাময়িকী। সেখানে নিয়মিত যেতেন সত্যেন্দ্রনাথ। এই কাগজেই প্রথম তাঁর বাংলা লেখা বের হয়। তারপরেও লিখেছেন অনেক। পরিষদ থেকে রচনা সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। সবাইকে হয়তো তাঁর বিজ্ঞানের কাজ বুঝিয়ে বলা যায় না। যখন বলা হয়, পৃথিবীর অর্ধেক মৌলকণা তাঁর নামে ‘বোসন’ কণা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে, তাঁর কাজের যুগান্তকারী চরিত্র আমাদের সকলের মনে ধরা দেয়। ‘বোস-সংখ্যায়ন’ তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যায় নতুন নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছে। সেই ভাবনার ভিত্তিতে কাজ করে অনেকে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। কোয়ান্টাম বিদ্যার কোনও আলোচনা তাঁকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘ ২০২৫ সালকে ‘কোয়ান্টাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আন্তর্জাতিকবর্ষ’ হিসাবে ঘোষণা করেছে। সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাতীয় মৌল বিজ্ঞান কেন্দ্র ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ সহায়তায় বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ সম্প্রতি ‘বোস সংখ্যায়ন ও আধুনিক বিজ্ঞান’ নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করেছে। রাজ্যের একাধিক স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। এই তালিকা দীর্ঘ। ‘বোস সংখ্যায়ন’ নিয়ে ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’এর বিশেষ সংখ্যা যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছে। সত্যেন্দ্রনাথ বসু নামাঙ্কিত বিজ্ঞান মেলা এবছর ছাব্বিশ বছরে পা দিয়েছে। বিজ্ঞান ভাবনার এক অতি আপনজন হিসাবে সত্যেন্দ্রনাথ ছোট বড় সকলের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।
খেলা-মেলা এরাজ্যে তো হচ্ছে যথেষ্টই। তাদের পক্ষ থেকে এবিষয়ে কোনও উৎসাহ দেখা যায় না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর একমাত্র বিজ্ঞানের বইটি তাঁকেই উৎসর্গ করেছিলেন। দেশের বুকে বিজ্ঞান-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে আজও সত্যেন্দ্রনাথ চর্চা অপরিহার্য। ভবিষ্যতেও তা অপরিহার্য থাকবে।
১৯৭৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞানীর জীবনাবসান হয়েছে। তাঁর প্রয়াণের অর্ধশতাব্দী উত্তীর্ণ। আসুন, বিজ্ঞানীর স্বপ্নকে অধিকতর সার্থকতার পথে নিয়ে যেতে পা মেলাই আমরা।
Comments :0