প্রতীম দে
সময় বদলেছে। সাম্রাজ্যবাদও তার চরিত্র বদলেছে। উপনিবেশ নেই। কিন্তু উপনিবেশ করার মানসিকতা রয়েছে।
আজকের বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদের নতুন চেহারা ফুটিয়ে তুলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিভিন্ন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নজর। একাধিক দেশে রয়েছে তাদের সেনা ঘাঁটি। কেন কী কারণে? আসলে তাদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি। ইতিহাস দেখিয়েছে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সুযোগ নিয়ে সেখানে নিজেদের পুতুল সরকারকে বসিয়েছে তারা। তাদের মাধ্যমে সেখানে নিজেদের ক্ষমতার বিস্তার করেছে তারা।
এখন ট্রাম্পের নজরে তেল। খনিজ তেল। আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা কোন সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি তাদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা বজায় রাখার একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল। বর্তমানে নিজের দেশে চাপে রয়েছে ট্রাম্প। মার্কিন অর্থনীতির হাল ভালো নয়। জিনিসের দাম বাড়ছে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। আর তাই দেশের মানুষের কাছে নিজের ‘ইমেজ’ ঠিক রাখতে দাদাগিরি দেখাচ্ছে মার্কিন রাষ্ট্রপতি।
এবার দেখা যাক কেন তেলের বাজার দখল করতে চায় রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথম লক্ষ্য পেট্রোডলারের আধিপত্য বজায় রাখা।
১৯৭০-এর দশকে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে 'পেট্রোডলার' ব্যবস্থা চালু হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কেনাবেচার প্রধান, প্রায় একমাত্র, মাধ্যম হয় মার্কিন ডলার। বিশ্বের প্রতিটি দেশকে তেল কেনার জন্য ডলারের সঞ্চয় রাখতে হয়, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের চাহিদা এবং মান বজায় রাখে। যদি তেলের বাজার অন্য কোনও শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বা অন্য মুদ্রায় (যেমন ইউয়ান বা ইউরো) লেনদেন শুরু হয়, তবে ডলারের বৈশ্বিক মর্যাদা সংকটে পড়বে। তাই ডলারের আধিপত্য রক্ষায় তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা ওয়াশিংটনের জন্য জরুরি। ঠিক সেই সময়েই যখন উত্থানশীল একাধিক অর্থনীতি ডলারের এই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
দ্বিতীয়, নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ হিসেবে রাখছে আমেরিকা।
মার্কিন অর্থনীতি তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবহন খরচ এবং পণ্যের দাম বেড়ে যায়, যা মুদ্রাস্ফীতি ঘটায়। আন্তর্জাতিক তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকলে আমেরিকা তেলের সরবরাহ এবং দাম নিজেদের অনুকূলে রাখতে পারে। বিশেষ করে ওপেকের (OPEC) মতো সংস্থাগুলোর একচেটিয়া প্রভাব খর্ব করতে আমেরিকা নিজের উৎপাদন বাড়িয়ে বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়।
তিন, রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে
তেলকে আমেরিকা একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তেলের বাজার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে তারা সহজেই নিজেদের অক্ষের বাইরে থাকা দেশগুলির (যেমন ইরান, ভেনেজুয়েলা বা রাশিয়া) ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাদের পঙ্গু করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বা রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানিতে বাধা দেওয়া— সবই এই কৌশলের অংশ।
চার, জ্বালানি কর্পোরেটের অর্থনৈতিক মুনাফা ও কর্মসংস্থানও লক্ষ্য।
এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। বিশেষ করে 'শেল অয়েল' বিপ্লবের পর মার্কিন কোম্পানি গুলি বিশ্বজুড়ে তেলের বাজার ধরতে মরিয়া। তেলের বাজার দখল করতে পারলে মার্কিন বড় বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলি (যেমন এক্সন মবিল বা শেভরন) বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুনাফা অর্জন করতে পারে, যা মার্কিন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। বস্তুত ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসনের পর্বে এই লক্ষ্য, অন্য কেউ নন, ট্রাম্প নিজেই স্পষ্ট করেছেন।
পাঁচ, পর্যবেক্ষকরা বলছেন আমেরিকার অন্যতম বড় লক্ষ হলো চীনের উত্থান ঠেকানো।
চীন বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারী দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি তেলের প্রধান উৎস এবং সমুদ্রপথগুলো (যেমন মালাক্কা প্রণালী) নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে যুদ্ধের সময় বা কৌশলগত প্রয়োজনে তারা চীনের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখবে। এটি চীনের সমানে বাড়তে থাকা প্রভাব মোকাবিলায় আমেরিকার জন্য একটি বড় কৌশলগত সুবিধা।
এবার প্রশ্ন তাহলে ভেনেজুয়েলা এবং ইরানের দিকে কেন নজর আমেরিকার?
ভেনেজুয়েলায় রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম তেল ভাণ্ডার (প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল)। ১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ক্ষমতায় আসার পর তিনি তেলের খনিগুলির জাতীয়করণ করেন এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর (যেমন এক্সন মবিল) একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব করেন। আমেরিকার প্রধান লক্ষ্য হলো এই বিশাল জ্বালানি সম্পদের ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং তেলের বাজারে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখা।
হুগো শাভেজ এবং তার উত্তরসূরি নিকোলাস মাদুরো 'একুশ শতকের সমাজতন্ত্র' বা 'বলিভারিয়ান বিপ্লব'-এর ডাক দেন, যা সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করছে। শাভেজের সময় থেকেই ভেনেজুয়েলার প্রতি আক্রোশ দেখাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
আমেরিকা বছরের পর বছর ভেনেজুয়েলার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে, যা দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে।
অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত কেবল একটি দেশের দখল সংক্রান্ত বিষয় নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে এক ভূ-রাজনৈতিক লড়াই।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের (বিশেষ করে ইজরায়েল) প্রধান উদ্বেগ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরান প্রকাশ্যে ঘোষণা করে আসছে অস্ত্র তৈরির জন্য নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই কর্মসূচি। কিন্তু আমেরিকার দাবি, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করবে। আজ পর্যন্ত দাবির সপক্ষে কোনও প্রমাণ যদিও আমেরিকা হাজির করতে পারেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও বিশ্বস্ত মিত্র হলো ইজরায়েল। ইরান প্রকাশ্যে ইজরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না এবং তাদের 'অস্তিত্ব মুছে ফেলার' ঘোষণা করেছে। ইজরায়েলকে রক্ষা করা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান বিষয়। এই ইজরায়েল আরবের প্রতিবেশী প্রতিটি দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছে আমেরিকার মদতে। ইজরায়েলকে সামনে রেখে পশ্চিম এশিয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে আমেরিকা।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজস্ব প্রভাব তৈরি করেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, প্যালেস্তাইনের হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে ইরান সমর্থনও করে। এই গোষ্ঠীগুলো ওই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও সামরিক ঘাঁটির ওপর নিয়মিত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। এই আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।
বিশ্বের তেলের বাজারের একটি বিশাল অংশ পারস্য উপসাগরের হরমোজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান এই প্রণালীর ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রক। যুদ্ধের সময় বা উত্তেজনার মুখে ইরান যদি এই পথ বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। তেলের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইরানের প্রভাব কমাতে আমেরিকা সেখানে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়।
ইরান প্রায়ই আন্তর্জাতিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে অন্য মুদ্রা (যেমন ইউয়ান বা ইউরো) ব্যবহারের চেষ্টা করে। যদি বড় কোন তেল উৎপাদনকারী দেশ ডলারের বাইরে লেনদেন শুরু করে, তবে মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ফলে আমেরিকার কার্যক্রম পুরোপুরি সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে, এমনকি খোদ আমেরিকার মাটিতে তার প্রতিবাদে রাস্তায় নামছেন মানুষ।
Comments :0