নতুনপাতা
গল্প
তিরস্কার
সৌরীশ মিশ্র
১ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
"মা, এই নাও চিনি। আর এই ফেরা টাকাটা। দুটোই ডাইনিং টেবিলের উপর রাখলাম।" বলল বছর বারোর বুবুন।
রান্নাঘরে কাজ করছিলেন বুবুনের মা রাজশ্রী দেবী। ওখান থেকেই তিনি বললেন, "রাখ্। যা, হাত-পা ধুয়ে এবার গিয়ে ঠাকুরদার কাছে পড়তে বোস্।"
"হুঁ, যাচ্ছি।" বলে বাথরুমের দিকে পা বাড়ালো বুবুন।
এখন সন্ধ্যাবেলা। ছ'টা বেজেছে একটু আগে। মাঠ থেকে খেলে কিছুক্ষণ অগে যখন বুবুন বাড়ি এসেছিল, ওর মা ওকে বললেন, "বুবুন, বাড়িতে চিনি খুব কম আছে দেখছি। তোর বাবা সকালে যখন বাজার গেল তখন অতোটা খেয়াল করিনি। পড়তে বসার আগে তুই একটু চিনি এনে দে। তার আগে টিফিন খেয়ে নে আয়।"
সেই চিনি আনতেই গিয়েছিল বুবুন পাশের পাড়ায়, দিলীপকাকুর মুদি দোকান থেকে। বুবুনদের পাড়ায় মুদি দোকান নেই কোনো।
বাথরুম থেকে বেড়িয়ে ঠাকুরদার ঘরে এলো বুবুন। দেখল, ঠাকুরদা বসে আছেন তাঁর ইজ়িচেয়ারে। ঠাকুরদার কাছেই বাড়িতে পড়ে সে। তাঁর ঠাকুরদা প্রিন্সিপাল ছিলেন কলকাতারই এক নামজাদা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের। এখন রিটায়ার করেছেন।
বুবুনের ঠাকুরদা, রমেন্দ্রনাথবাবু, একটা বই পড়ছিলেন। বুবুন ঘরে গিয়ে ওর পড়ার টেবিলে গিয়ে চেয়ারে বসতেই তিনিও বইটা বুকশেল্ফে তুলে রেখে এসে বসলেন পড়ার টেবিলের পাশে রাখা যে চেয়ারটায় তিনি বসেন সেটায়।
"পড়তে বসতে দেরী হয়ে গেল, না দাদু?" ঠাকুরদা তার পাশটায় বসতেই কথাটা বলল বুবুন। এইটুকু বয়স হলে কি হবে পড়াশোনার ব্যাপারে বুবুন খুব সিরিয়াস। ক্লাসে ওঠার পরীক্ষায় এক থেকে দশের মধ্যে থাকে ও সবসময়। তা বলে ও যে খেলাধুলা করে না, তা কিন্তু নয়। খেলাধুলা করতেও দারুণ লাগে ওর। প্রতিদিন, বিকেলে মাঠে খেলতে যাওয়া ওর চাই-ই চাই।
"না, তেমন দেরী হয় নি। তুমি তো মুদি দোকান থেকে কি আনতে গিয়েছিলে, বলেছে আমায় বৌমা। হ্যাঁ ঠিকই, তোমার এখন পড়াশুনা করাটাই মোস্ট ইমপরট্যান্ট, কিন্তু তেমনি, কখনো দরকার পড়লে বাড়ির কাজ করাও তোমার কর্তব্য। তা, দিলীপের দোকানে গিয়েছিলে তো?"
"হ্যাঁ দাদু।" ইতিহাস বইটা খুলতে খুলতে বলে বুবুন।
"ব্রিজের কাছটা দিয়ে যেতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?" জিজ্ঞেস করেন রমেন্দ্রনাথবাবু।
"না দাদু, কোনো অসুবিধা হয়নি।" বলে বুবুন।
"যা অবস্থা হয়েছে ঐ জায়গাটায়।" স্বগতোক্তি করেন রমেন্দ্রনাথবাবু। তারপর ফের নাতিকে বলতে থাকেন, "খুব সাবধানে যাতায়াত করবে, ঐ জায়গাটা দিয়ে যখনই যাবে, কেমন? তবে একটাই বাঁচোয়া আমরা যারা এইদিকটাই থাকি তাদের অন্ততঃ ওখানে রাস্তাটা ক্রস করতে হয় না। তবুও যখনই যাবে ঐ জায়গাটা দিয়ে সবসময় অ্যালার্ট থাকবে।"
ঠাকুরদার কথাগুলো মন দিয়ে শুনে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলে বুবুন।
আসলে হয়েছে কি, বুবুনদের পাড়ায় ঢোকার ঠিক মুখে একটা নতুন ব্রিজ হয়েছে। আর ঐ ব্রিজটা গত মাসে উদ্বোধন হওয়ার পর থেকেই এতো গাড়ির চাপ বেড়েছে ব্রিজের মুখটায় তা বলার কথা নয়। ঐ জায়গাটায় খুব সাবধানতার সাথে যাতায়াত করতে হয় মানুষজনকে। বিশেষ করে যারা পথচারী, তাদের। এরই মধ্যে একটা ফ্যাটাল অ্যাক্সিডেন্টও হয়ে গেছে ঐ স্পটে। তাই ঐ কথাগুলো বলছিলেন রমেন্দ্রনাথবাবু নাতিকে।
ইতিহাসের যে চ্যাপ্টারটা আজ পড়বে বুবুন সেটা বের করে ফেলেছে সে ইতিমধ্যেই। পড়া শুরু করতে যাবে, তখনই একটা কথা মনে পড়ে তার। সে বলে উঠল ওর ঠাকুরদার দিকে তাকিয়ে, "জানো দাদু, আমি যখন ফিরছি দিলীপকাকুর দোকান থেকে ঐ ব্রিজটার জায়গাটা দিয়ে, একজন ঠাকুরমা, দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তাটার ধারটায়। আমি তো পাশ দিয়ে আসছি, আমাকে দেখেই ব্রিজটার উল্টোদিক দেখিয়ে বলল, বাবা, তুমি কি ঐ দিকে যাবে?
কিন্তু, আমি তো এইদিকে আসবো। রাস্তা ক্রস করে ঐদিকে যাবো না, তাই বললাম ওনাকে। মনে হয়, ঐ ঠাকুরমাটার রাস্তাটা পাড় হতে অসুবিধা হচ্ছিল। "
বুবুনের কথা মন দিয়ে শুনছিলেন রমেন্দ্রনাথবাবু। মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে উঠল তাঁর মুখ। তিনি নাতির দিকে তাকিয়ে কঠিন কণ্ঠে বলে উঠলেন, "কাজটা তুমি ঠিক করোনি দাদুভাই। তোমার কাছে একজন হেল্প চাইলো, তুমি তাঁকে সাহায্য করলে না! তোমার মতোন একজন সেনসিটিভ ছেলের কাছে আমি এটা আশা করিনি।"
ঠাকুরদার কাছে এমন ভাবে তিরস্কারের মুখে পড়েনি কখনো আগে বুবুন। তাঁর চোখে জল চলে এলো। তবু, সে বুঝতে পারলো, ঐ ঠাকুরমাকে তার রাস্তাটা ক্রস করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। সে রমেন্দ্রনাথবাবুর দিকে ঝাপসা চোখে তাকায়। তার দু'গাল বেয়ে টসটস করে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। নিজেকে একটু সামলে বুবুন বলল, "দাদু, আমার ভুল হয়ে গেছে। এমন ভুল আর কখনো হবে না আমার।"
রমেন্দ্রনাথবাবু হাত দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিলেন তাঁর নাতির। মাথায় সস্নেহে একটু হাতও বুলিয়ে দেন তিনি বুবুনের। নাতি তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয়। তবুও এই তিরস্কারটা তার জন্য দরকার ছিল। এইরকম সব গুরুজনদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাই তো সাহায্য করবে তাঁর নাতিকে ভালো একজন মানুষ হয়ে উঠতে। মনে মনে ভাবলেন কথাগুলো রমেন্দ্রনাথবাবু। মুখে শুধু তিনি নাতিকে বললেন, "ঠিক আছে দাদুভাই, ঠিক আছে।"
-------------------------------------------
Comments :0