মুক্তধারা
ভ্রমণ
স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ
অভীক চ্যাটার্জি
১ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
সপ্তম পর্ব
পাথুরে পথ আমাদের একটু একটু করে নিয়ে চলল গঙ্গার আঁতুড়ঘরে। গাছ একটু একটু করে কমছে। ছোট ছোট গুলমলতায় ভরে আছে পথ। তার উপর ভোরের শিশির জমে হিরের মত চকচক করছে। ছোট্ট আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি।
আগেই বলেছি, এই পথে অনেক ছোট ছোট পাহাড়ি নালা পড়ে। সেই নালাগুলো এতই ছোট, যে এক পদক্ষেপেই পর করা যায়। কিন্তু একটু পরে একটা নালা পড়ল, যেটা একটু বড়, এবং তার উপর দিয়ে যাওয়া একটু কঠিন। তখন অদ্ভুত বিস্ময়ে আমি দেখলাম, আমাদের গাইড, পাহাড়ের ধার ঘেঁষে অর্ধেক পায়ের পাতার উপর ভর দিয়ে দাড়িয়েআমাদের এক একজনকে পর করে দিলেন নিপুণ কৌশলে। অবাক হয়ে গেলাম আমি।
প্রায় নয় কিলোমিটার অতিক্রম করে পৌঁছলাম চিরবাসায়। একসময় এখানে ছিল অসংখ্য চির বা ভোজপত্র গাছ। আজ তাদের সংখ্যা কমে এলেও নামটি এখনও ইতিহাস বহন করে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে গরম চা খেতে খেতে অনুভব করলাম, বাতাসে অক্সিজেন অনেকটাই কমে এসেছে। হাঁটার গতি নিজে থেকেই ধীর হয়ে গেল।
চিরবাসা পেরোনোর পর পথ যেন অন্য রূপ নিল। সবুজ প্রায় নেই। বিশাল বোল্ডার, ভাঙা পাহাড়, ধুলোমাখা ট্রেইল আর চারদিকে অনন্ত নীরবতা। মাঝে মাঝে পাহাড়ের গা থেকে ছোট ছোট পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ সেই নীরবতাকে ভেঙে দেয়। এই অঞ্চলটি ভূমিধসপ্রবণ। তাই গাইডের নির্দেশ মেনে দ্রুত সেই অংশ অতিক্রম করলাম।
এই পথের প্রতিটি বাঁক যেন নতুন বিস্ময়। কোথাও বরফে ঢাকা শিখর, কোথাও হিমবাহের ক্ষয়ে তৈরি অদ্ভুত শিলাস্তূপ। ভাগীরথী এখন আরও তরুণী, আরও উচ্ছ্বসিত। তার জল সাদা ফেনা তুলে ছুটে চলেছে নিচের দিকে।
বিকেলের দিকে প্রথম দেখা মিলল ভুজবাসার। পাহাড়ের কোলে কয়েকটি আশ্রম আর চারদিকে অনন্ত ধূসর উপত্যকা। গাছ বলতে কেবল কিছু ভোজপত্রের অস্তিত্ব—যাদের নাম থেকেই এসেছে 'ভুজবাসা'। বহু শতাব্দী আগে এই ভোজপত্রেই লেখা হতো শাস্ত্র ও পুঁথি। ইতিহাস যেন এখনও বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
প্রায় ৩,৮০০ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকিয়ে মনে হলো, পৃথিবী যেন অনেক দূরে রয়ে গেছে। মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই, শহরের শব্দ নেই, শুধু আছে বরফ, পাথর, বাতাস আর ভাগীরথীর গর্জন।
সন্ধ্যা নামতেই তাপমাত্রা দ্রুত নেমে গেল। পশ্চিম আকাশে শেষ সূর্যের আলো ভাগীরথী–১, ২ ও ৩ শৃঙ্গকে রক্তিম আভায় রাঙিয়ে দিল। এমন দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না; শুধু অনুভব করা যায়।
রাতের আকাশে অসংখ্য নক্ষত্র। মনে হচ্ছিল, হাত বাড়ালেই যেন ছুঁয়ে ফেলা যাবে আকাশগঙ্গাকে। দূরে ভাগীরথীর গর্জন, মাথার ওপর মিল্কিওয়ের আলোর নদী—এই দুই নদীর মাঝখানে বসে উপলব্ধি করলাম, মানুষ প্রকৃতির কাছে কত ক্ষুদ্র।
Comments :0