একদিকে পরিবারের বাকিরা কবে ফিরবেন তা জানার আকুতি, অপরদিকে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা শ’য়ে শ’য়ে মানুষের ভোটার তালিকায় নাম তোলার আরজি—মঙ্গলবার এই দুই দৃশ্যেরই সাক্ষী হয়েছে বীরভূম-মুর্শিদাবাদ সীমান্তের জনপদ পাইকর।
সোনালি বিবি ও তাঁর ছেলে ফিরলেও ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে ওপারে পাঠানো তাঁর স্বামী ও পড়শি সুইটি বিবিদের পরিবার এখনও ফিরতে পারেননি। সুপ্রিম কোর্টে গড়ানো মামলার শেষ শুনানিতে কেন্দ্র জানিয়েছিল, দশ দিনের মধ্যে বাকিদের ফেরানো হবে। তারপর নাগরিকত্ব যাচাই করা হবে। সেই সময়সীমাও পেরিয়েছে। কেন্দ্র কী পদক্ষেপ নিয়েছে হতদরিদ্র দুই পরিযায়ী শ্রমিক পরিবার তার কিছুই জানে না। বরং তাঁদের উৎকণ্ঠা দ্বিগুণ হয়েছে। এদিন পাইকরের দর্জিপাড়ার সেই বিধ্বস্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল সিপিআই(এম)’র প্রতিনিধিদল। ছিলেন আইনজীবী সব্যসাচী চ্যাটার্জি, বদরুল করিমরা। সোনালি বিবি তাঁর ছেলের চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন রামপুরহাটে। বাড়িতে থাকা তাঁর বাবা ভোদু শেখ, মা জ্যোৎস্না বিবিদের সঙ্গে দেখা করেন আইনজীবীরা। আইনজীবীদের কাছে ভোদু শেখ উদ্বেগের সঙ্গে জানান, ‘‘দশ দিনের মধ্যে সবাই ফিরে আসবে শুনেছিলাম। দশদিন পেরিয়ে গেল। এখনও এল না। তাঁদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন।’’ ভোদু শেখের পড়শি সুইটি বিবি তাঁর দুই নাবালক সন্তানকে নিয়ে এখনও রয়েছেন বাংলাদেশে। আইনজীবীরা এসেছেন শুনে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন সুইটি বিবির মামি। তাঁরও একই আকুতি, ‘‘ঘরের মেয়ে, সন্তানদের ফেরানোর ব্যবস্থা করুন।’’ বিপন্ন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে আইনজীবী সব্যসাচী চ্যাটার্জি জানিয়েছেন, ‘‘এই হতদরিদ্র, দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলি চূড়ান্ত দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এঁদের আইনি সহায়তা দিয়ে দেশের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আমরা সর্বতোভাবে পাশে থাকব।’’
বীরভূমের প্রত্যন্ত জনপদ পাইকরের দর্জিপাড়া থেকে সপরিবারে দানিশ শেখ, সোনালি বিবি, সুইটি বিবিরা পাড়ি দিয়েছিলেন দিল্লি। স্রেফ রোজগারের তাগিদে। ভাংরির বেচাকেনা করে কোনোমতে পেট চালাচ্ছিলেন হতদরিদ্ররা। আচমকা এই দুই পরিবারের ৬ জনের খোঁজ মিলছিল না। খোঁজখবর করে জানা যায়, গত বছর ১৮ জুন দানিশের পরিবারকে আটক করেছিল দিল্লি পুলিশ। ২৬ জুন তাঁদের বিএসএফ’র মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে পাঠানোর পর ‘পুশব্যাকে’র শিকার এদেশের এই ৬ জনকে গতবছর ২০ আগস্ট চাঁপাই নবাবগঞ্জের সদর মডেল থানার পুলিশ ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসাবে গ্রেপ্তার করে। সেই থেকেই সংশোধনাগারেই ছিলেন তাঁরা। তারমধ্যে বাংলাদেশ আদালত অন্তঃসত্ত্বা সোনালি বিবি ও ছেলের জামিন মঞ্জুর করলে গত ৬ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তাঁরা। তবে বাকি চারজন এখনও রয়েছেন বাংলাদেশেই। তাঁদের ফেরার অপেক্ষায় উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছে পাইকর।
অপরদিকে, এদিনই সোনালি বিবিদের বাড়ি যাওয়ার আগে এসআইআর’র নাম বাদ যাওয়ার নিয়ে এক সভা হয়েছে সিপিআই(এম)’র ডাকে। তাতে উপচে পড়েছিল ভিড়। কারণ নাম বাদ যাওয়ার তালিকায় এই পাইকরেরই মানুষ আছে কয়েক হাজার। গোটা বীরভূম জেলায় সংখ্যাটা ৮৩ হাজারের মতো। এদিন সিপিআই(এম) মুরারই-পাইকর এরিয়া কমিটির ডাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া, কবে উঠবে নাম এই প্রশ্নে ধন্দে থাকা মানুষদের নিয়ে ডাকা সভায় শামিল শ’য়ে শ’য়ে মানুষ তাঁদের উৎকণ্ঠার সঙ্গে ক্ষোভও উগড়ে দিয়েছেন।
ভিড়ে ঠাসা সেই সভায় দাঁড়িয়ে আইনজীবী সব্যসাচী চ্যাটার্জি বলেছেন, ‘‘সিপিআই(এম)’র পক্ষ থেকে এসআইআর’র শুরুতেই বলা হয়েছিল, যে কোনও ধরনের সমস্যায় পার্টির পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা করা হবে এবং রাস্তায় নেমেও সমানভাবে লড়াই হবে। আজও আমরা বলছি একই কথা, একজনও যোগ্য মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। এই লড়াইয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত যাব।’’
SIR PAIKAR CPI-M
এসআইআর নিয়ে পাইকরের সভায় সহায়তার আশ্বাস সিপিআই(এম)-র
এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া এলাকাবাসীদের সহায়তা দিতে পাইকরে সিপিআই(এম) নেতৃবৃন্দ। রয়েছেন আইনজীবী সব্যসাচী চ্যাটার্জি ।
×
Comments :0