সরকার ও শাসকদলের সম্মিলিত ব্যবস্থাপনায় লুটেরা, মাফিয়া, গুন্ডা এবং সর্বোপরি শাসক দলের নেতাদের গড়ে তোলা লুটতন্ত্র ও মাফিয়াতন্ত্র গোটা সমাজকে কীভাবে গ্রাস করে ফেলতে পারে তার কিঞ্চিৎ নমুনা মিলতে পারে নাজিরাবাদ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা থেকে। লুটের জমিতে সীমাহীন মুনাফার তাগিদে গড়ে ওঠা বেআইনি গুদামগুলিতে কার্যত বন্দি অবস্থায় পুড়ে মাংসপিণ্ড হয়ে গেছে শ্রমিকরা। ঠিক কতজনের মাংসপিণ্ড ছাইচাপা আগুনের ধ্বংসস্তূপের ভেতরে রয়েছে বলেনি পুলিশ বা দমকল। নিরুত্তর সরকার। তবে নিখোঁজদের ধরে মৃতের সংখ্যাটা ৩০ ছাড়িয়ে যাবে অনায়াসেই।
এরপরও কি মেনে নিতে হবে এ রাজ্যে একটি সরকার আছে। সংবিধান ও আইন মেনে এই সরকার পরিচালিত হয়। যেকোনও ধরনের বেআইনি ও অবৈধ কার্যকলাপ আটকানোর জন্য প্রশাসনের নজরদারি আছে। আদালতের নির্দেশকে মান্যতা দিয়ে অবৈধ নির্মাণ ভেঙে দিয়ে পরিবেশের ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় তৎপর হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পূর্ব কলকাতার জলাভূমি তথা ‘রামসার’ রক্ষায় দায়বদ্ধ। না এমনটা মেনে নেবার কোনও সুযোগ নেই। এই রাজ্যের বর্তমান শাসনতন্ত্রকে জঙ্গলের রাজত্ব বললেও ঠিক বলা হয় না। জঙ্গলেরও একটা নিয়ম থাকে। মমতা ব্যানার্জির সরকার চুরি, লুট, তোলা, অপরাধ, অবৈধ ও বেআইনি কাজ, এমনকি খুন সন্ত্রাসকেও যেভাবে বৈধতা দিয়ে এক সার্বিক অরাজকতাকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে দিয়েছে তাতে আর সমাজচেতনা, মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, সততা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকছে না। সরকার লুটতন্ত্রের উৎসাহদাতা, পুলিশ মাফিয়াদের রক্ষক। শাসকদল এই গোটা লুটতন্ত্রের নিখুঁত নেটওয়ার্ক নির্মাতা।
এই ব্যবস্থা এমনই দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যে এমন বিধ্বংসী আগুনের পর ৩০ ঘণ্টা পর মন্ত্রী যাবার প্রয়োজন বোধ করেন না। আগুন নেভানোর দক্ষতা ও পরিকাঠামোহীন দমকল কার্যত নিধিরাম সরদার। যে গুদামগুলি পুড়েছে সবই সংরক্ষিত জলাশয় বেআইনিভাবে ভরাট করে বেআইনিভাবে তৈরি। দমকলের অনুমোদন তো বটেই প্রয়োজনীয় কোনও সরকারি অনুমোদন নেই। অথচ দিব্যি পেয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ সংযোগ। যদিও পাবার কথা নয়। যারা গুদাম ব্যবহার করে নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে তারা গুদাম বানায়নি। জমি মাফিয়া তৃণমূল নেতার নেতৃত্বে মাটি মাফিয়ারা জলাভূমি ভরাট করেছে। দিনের আলোয় গুদাম বানাবার ব্যবস্থা করেছে শাসক নেতারা। তারপর বিভিন্ন কোম্পানিকে ভাড়া দিয়ে কোটি কোটি টাকা তুলছে। পুলিশ তাই কিছু বলে না। প্রশাসন দেখেও না। পঞ্চায়েত-পৌরসভা বোবা-কালা। অদৃশ্য নির্দেশে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয় সিইএসসি বা রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ। আর ৭৫/২৫ ফরমুলায় ৭৫ভাগ পৌঁছে যায় কালীঘাটে। অতএব চোখ বুজে লুট করে যায়। যা খুশি, যেখানে খুশি যথেচ্ছ বেআইনি কাজ করে যাও। নেতা-মন্ত্রী-পুলিশ সুরক্ষা দিয়ে যাবে। হাইকোর্ট নির্দেশ দিলেও ভাবার কিছু নেই। বেআইনি কাজ চলবেই এরাজ্যে এখন বেআইনিটাই আইন, অবৈধটা বৈধ। এটাই এগিয়ে বাংলা, লুটে খাবার বাংলা, নৈরাজ্যের বাংলা।
Editorial
লুটের বাংলার পাঁচালি
×
Comments :0