মিড ডে মিল প্রকল্পে গত তিন বছরে যত টাকা বরাদ্দ করেছে মমতা ব্যানার্জির সরকার, খরচ করেছে তার মাত্র ১৬.৯৬ শতাংশ!
বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ আর্থিক বছরের বাজেট পেশ করেছে রাজ্য সরকার। গত দু’বছরের মতো এবারও বাজেটের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে আর একটি নথি, ‘জেন্ডার অ্যান্ড চাইল্ড বাজেট।’ মূল বাজেট নথিতে রাজ্যে মিড ডে মিল প্রকল্পের বিরাট সাফল্য দাবি করেছে সরকার। কিন্তু মহিলা এবং শিশুদের জন্য কোন খাতে কত খরচ এবং বরাদ্দের যে হিসাব জেন্ডার অ্যান্ড চাইল্ড বাজেটে সরকার উল্লেখ করেছে, তাতে সাফল্যের দাবি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে। তিন বছরের জেন্ডার অ্যান্ড চাইল্ড বাজেটের নথি খতিয়ে দেখলে বোঝা যাচ্ছে, প্রাথমিক এবং উচ্চপ্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যাহ্নভোজনের প্রকল্পে সরকার ডাহা ফেল করেছে। যার প্রভাব কিছুটা পড়েছে গরিব পরিবারের ছেলে-মেয়েদের স্কুলমুখী হওয়ার ক্ষেত্রে।
বিধানসভায় তৃণমূল সরকারের পেশ করা তথ্য পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩-২৪ আর্থিক বছরে মিড ডে মিল প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ২৩৭৭ কোটি টাকা। কিন্তু সরকার খরচ করেছিল ৫১৫ কোটি ৪ লক্ষ টাকা। পরের বছর, ২০২৪-২৫’এ সরকারের মিল ডে মিলের জন্য বরাদ্দ ছিল ২২৯৯ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা। খরচ হয়েছিল ২৪১ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকা। ২০২৫-২৬’এ সরকার বরাদ্দ করেছিল ১৬৭৩ কোটি ১২লক্ষ টাকা। সরকার জানিয়েছে, এই আর্থিক বছর শেষে, অর্থাৎ আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে এই খাতে সরকার খরচ করতে পারবে ৩২০ কোটি ১লক্ষ টাকা। অর্থাৎ এই তিন বছরে মিড ডে মিল প্রকল্পে সরকার বরাদ্দ করেছিল ৬৩৪৯ কোটি ৪২লক্ষ টাকা। খরচ হয়েছে ১০৭৭ কোটি ১ লক্ষ টাকা। মোদ্দা কথা, বরাদ্দ করলেও স্কুলগুলিতে মিড ডে মিল সরবরাহ করার ৮৩.০৪ শতাংশ টাকা সরকার খরচ করেনি।
মিড ডে মিল সারা দেশে চালু হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের ২০০১’র ২৮ নভেম্বরের নির্দেশ অনুসারে। পশ্চিমবঙ্গে তা চালু হয়েছে ২০০৩’এ। পশ্চিমবঙ্গ দেশে তৃতীয় রাজ্য, যেখানে মিড ডে মিল চালু হয়েছিল। গরিব পরিবারের সন্তানদের স্কুলমুখী করা, তাদের সামান্য পুষ্টির বন্দোবস্ত করা এই প্রকল্পের লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গে চালুর দু’বছরের মধ্যেই দেখা যায় স্কুলমুখী ছাত্র-ছাত্রী ৮ শতাংশ বেড়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের তথাকথিত ‘পরিবর্তন’ পর্বে দেখা যাচ্ছে, ওই পর্যায়েই শিক্ষার জগৎ ছাড়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। মিড ডে মিল প্রকল্পের আওতায় থাকা ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যার নিদারুণ হেরফের জানাচ্ছে, স্কুলছুট বাড়ছে।
জেলাওয়াড়ি তালিকাও বলে দিচ্ছে নির্দিষ্ট কতগুলি প্রবণতা। প্রথমত, উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির হাল বেশি খারাপ। দ্বিতীয়ত, সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলিতেও স্কুলছুট প্রচুর। তৃতীয়ত, তফসিলি জাতি প্রধান কোচবিহার, নদীয়া, দুই ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলিতেও উচ্চপ্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রী কমছে। চতুর্থত, পশ্চিমবঙ্গে গ্রাম বেশি। স্কুলগুলি স্বভাবতই গ্রামে বেশি। ছাত্র-ছাত্রীদের বড় অংশ খেতমজুর সহ কৃষিজীবী এবং ভ্যানচালক, ইটভাটার শ্রমিকদের মতো অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক পরিবারের সন্তান। শিক্ষার অঙ্গন থেকে ছিটকে যাচ্ছে মূলত তারাই।
আগামী আর্থিক বছরের জন্য এই খাতে রাজ্য সরকার বরাদ্দও কমিয়ে এনেছে। ২০২৬-২৭’এ মিড ডে মিল প্রকল্পে তৃণমূলের সরকার বরাদ্দ নামিয়ে এনেছে ১১৫০ কোটি ৯০ লক্ষ টাকায়। যা ২০২৩-২৪’র বরাদ্দের অর্ধেকেরও কম। গত বাজেট বরাদ্দের থেকে কমেছে ৫০০ কোটি টাকার বেশি।
খরচ না করা এবং বরাদ্দ কমিয়ে আনার পিছনে অন্যতম কারণ স্কুলছুট বৃদ্ধি পাওয়া। রাজ্যে প্রধানত উচ্চপ্রাথমিকে ড্রপ আউটের প্রবণতা স্পষ্ট। গত এপ্রিলে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাজ্যের আধিকারিকদের বৈঠকেই সেই দুর্দশা স্পষ্ট হয়েছিল। বোঝা গিয়েছিল, রাজ্যে উচ্চপ্রাথমিক ক্ষেত্রে শিক্ষার হাল ভয়াবহ। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যায়ে স্কুলছুট সামগ্রিকভাবে ৪২শতাংশ। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ভর্তি হয়েছিল ৪০,৮১,৬৬৬জন ছাত্র-ছাত্রী। বছর শেষে রাজ্য সরকার জানিয়েছে মিড ডে মিল দেওয়া হয়েছিল ২৩,৬৬,২৩২জনকে। অর্থাৎ রাজ্য সরকারই কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়েছে যে, ওই শিক্ষাবর্ষে উচ্চপ্রাথমিক পর্যায়ে ৪২শতাংশ ছাত্র-ছাত্রীকে মিড ডে মিল দেওয়া যায়নি। যারা আসেইনি তাদের মিড ডে মিল দেবে কি করে? এই বিপর্যয়ের কারণ প্রধানত দু’টি বলেই শিক্ষাবিদদের বক্তব্য। প্রথমত, কাজের অভাবের জন্য গ্রামের গরিব পরিবারগুলির একটি অংশ ভিনরাজ্যে গেছে উপার্জনের আশায়। অনেকে সপরিবারে গেছেন। সন্তানরা স্কুল ছেড়েছে। দ্বিতীয়ত, অভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়েছে অনেক পরিবারের ছেলে-মেয়ে। রাজ্যে তাই নাবালক-নাবালিকা বিয়ে বেড়েছে। বেড়েছে কিশোরী, শিশু পাচার।
Mid Day Meal
মিড ডে মিলে তিন বছরে রাজ্য বরাদ্দের ৮৩% খরচই করেনি
×
Comments :0