JOURNEY — AVIK CHATARJEE — SHOLOYANA NIZAMIYANA — MUKTADHARA — 21 FEBRUARY 2026, 3rd YEAR

ভ্রমণ — অভীক চ্যাটার্জী — ষোলোআনা নিজমিয়ানা — মুক্তধারা — ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

JOURNEY  AVIK CHATARJEE  SHOLOYANA NIZAMIYANA  MUKTADHARA  21 FEBRUARY 2026 3rd YEAR

ভ্রমণ

মুক্তধারা

ষোলোআনা নিজমিয়ানা
 

অভীক চ্যাটার্জী 

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বর্ষ ৩

দুই

কুতুব শাহী সমাধিসৌধ

আচ্ছা, আপনারা অনেকেই মিশরের ভ্যালি অফ দ্যা কিংস এর কথা শুনেছেন, বা অনেকে দেখেছেন। হায়দরাবাদে ঠিক সেই রকম একটা সমাধি কমপ্লেক্স রয়েছে। যেখানে রয়েছে কুতুব শাহী বংশের সাতজন সুলতান ও তার রাজপরিবারের মানুষের সমাধি। এক বিকেলে গিয়ে হাজির হলাম আমি সেই ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ করতে।

শহরের যানজটকে পেছনে ফেলে এক পড়ন্ত বিকালে সোনালী রোদ গায়ে মাখতে মাখতে গিয়ে দাঁড়ালাম সেই জীবন্ত ইতিহাসের মাঝখানে। ইতিহাস যেখানে ফিসফিস করে কানে কানে বলে যায় তার ফেলে আসা সোনালী দিনের দিনলিপি। আর সোনা গলানো রোদ চুঁইয়ে পড়ে গম্বুজের গা বেয়ে  পড়ন্ত গোধূলি বেলায়।

এই সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সে মোটামুটি চল্লিশটিরও বেশি সমাধি রয়েছে। কেউ এখনো গর্বিত ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন, কেউ নুইয়ে পড়েছেন বয়সের ভারে ।এখানে শুয়ে আছেন কুতুব শাহী বংশের সাতজন সুলতান, তাঁদের পরিবারের সদস্য, এমনকি রাজদরবারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমলা ও সেনাপতিও। ১৬শ থেকে ১৭শ শতকের এই শাসকেরা একসময় গোলকোন্ডা রাজ্য শাসন করতেন, যার কেন্দ্র ছিল কাছেই অবস্থিত দুর্গ। হাঁটতে হাঁটতে বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল দূরের দুর্গের দিকে—জীবন আর মৃত্যুর মধ্যেও যেন এক অদ্ভুত সম্পর্ক।

ভেতরে ঘুরতে ঘুরতে আমার মনে হচ্ছিল, এগুলো কি শুধুই সমাধি? নাকি ক্ষমতা প্রদর্শনের এক নিষ্ফল আস্ফালন?কারণ এর জৌলুশ আর চাকচিক্য মৃত্যুর নীরবতাকে ভেঙে খান খান করে দেয়।যদিও সে জৌলুশ আজ পুরোপুরি ভাবে অস্তমিত। সময়ের হাতে সবাই পরাজিত হয়। কুতুব শাহী স্থাপত্যে পারস্য, তুর্কি ও দাক্ষিণাত্য শৈলীর মেলবন্ধন স্পষ্ট—খিলানযুক্ত দরজা, অলংকৃত কার্নিশ আর চারদিক ঘিরে থাকা বারান্দা।জানা যায়, একসময় এই সমাধিসৌধগুলোর গায়ে রঙিন টাইলস ও প্লাস্টার অলংকরণ ছিল, যা সূর্যের আলোয় ঝলমল করত। সময়ের করাল গ্রাসে আজ সেগুলো আর নেই, কিন্তু তার অভাবই হয়তো এই জায়গার সৌন্দর্যকে আরও গভীর করেছে। বুঝিয়ে দিয়েছে সবকিছুই সাময়িক।

সবচেয়ে বেশি সময় কাটালাম মুহাম্মদ কুলি কুতুব শাহ-এর সমাধির কাছে। তিনিই হায়দরাবাদ শহরের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর সমাধিটি আকারে সবচেয়ে বড় নয়, কিন্তু এক ধরনের ভারসাম্য আর সৌন্দর্য আছে, যা আলাদা করে চোখে পড়ে। মনে হচ্ছিল, যে মানুষটি একটি শহরের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি মৃত্যুর পরেও স্থাপত্যের ভাষায় নিজের গল্প বলে যাচ্ছেন।

মুঘল আমলের পর দীর্ঘদিন এই সমাধিসৌধগুলি অবহেলিত ছিল। আধুনিক কালে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI) ও আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে।

ফেরার সময় মনে হচ্ছিল, কুতুব শাহী সমাধিসৌধ শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়—এটা এক শান্ত বিকেলের কবিতা, যেখানে রাজাদের জাঁকজমক হারিয়ে গিয়ে কেবল সময়ের সঙ্গে আপস করে নেওয়া এক গভীর নীরবতা। পাখিরা ঘরে ফিরছে। কূজন শোনা যাচ্ছে গাছে গাছে। এবার আমারও ফেরার পালা। সন্ধ্যা ঘনাচ্ছে হায়দরাবাদে।

Comments :0

Login to leave a comment