অরবিন্দ রায়
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
রাজবংশীদের সামাজিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজ জাত, ধর্ম, বর্ণ ও সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন পরিচিতি সত্তার রাজনীতির শিকারে পরিণত হয়েছে বহুকাল আগে। ঔপনিবেশিক ভারতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহেবরা প্রশাসনিক কাজে উচ্চবর্ণের লোকেদের নিযুক্ত করেন। একসময় গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের হাতেই সমস্ত জমির মালিকানা এবং চাকুরির সুযোগ সীমাবদ্ধ ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চবর্ণের লোকেরা স্থানীয় কোচ রাজবংশীদের নিচু চোখে দেখত। শুধুমাত্র বর্ণহিন্দু নয় তদানীন্তন হিন্দু জমিদারদের কাছে বর্ণবাদী হিন্দুত্ব প্রথার বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন সম্পন্ন রাজবংশী পরিবারগুলিও। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নীতি এবং প্রধানত বর্ণবাদী ব্রাহ্মণ ধর্মের বিরোধিতার জন্যই সে সময় অবিভক্ত বাংলায় রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিকভাবে ক্ষত্রিয় বংশজাত হিসাবে পরিচিতি লাভের তাগিদ সৃষ্টি হয়। সে সময় অনেক রাজবংশীই শিক্ষা বঞ্চিত ছিলেন। অন্তজ শ্রেণির কারণে সমাজে বিচ্ছিন্ন থেকেছেন রাজবংশীরা, অস্পৃশ্য ছিলেন, যোগ্যতা প্রমাণেরও সুযোগ ছিল না। রাজবংশীদের উপর জোতদার, মহাজন, ব্রাহ্মণদের বঞ্চনা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায় তখন পঞ্চানন বর্মার নেতৃত্বে শুরু হয় রাজবংশী জনজাতির মধ্যে সচেতনতা গড়ে তাদেরকে একটি শ্রেণি হিসেবে সংঘটিত ও সঙ্ঘবদ্ধতায় উন্নীতকরণের প্রয়াস। শুধু রাজবংশী নয় সংখ্যালঘু নস্য শেখ মুসলিম সম্প্রদায় সহ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষের প্রেরণাদাতা ও পরিত্রাতা হিসাবে সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন জননেতা পঞ্চানন বর্মা। সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সার্বিক অধিকার সুনিশ্চিত করতে কৌশলে রাজবংশী জনজাতির মানুষকে সঙ্ঘবদ্ধ করতেই পঞ্চাননের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে প্রথম সংগঠন ক্ষত্রিয় সমিতি। প্রকাশিত হয় মুখপত্র 'ক্ষত্রিয় পত্রিকা'।
ওই সময়ে বর্ণবাদী ব্যবস্থার কঠোর অনুশাসন দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সামাজিক মর্যাদা রাজনৈতিক অধিকার এবং আর্থিক অধিকার প্রতিষ্ঠা তথা সরকারি চাকরির সুযোগ পেতেন ক্ষত্রীয়রাই।
তাই রাজবংশী জনগোষ্ঠীর ক্ষত্রিয় আন্দোলন কোনও সনাতনী হিন্দুত্বের বর্ণবাদী আন্দোলন ছিল না বরং বাস্তবে এই ক্ষত্রিয় আন্দোলন ছিল চরম সামাজিক নিষ্পেষণ (Social oppression) থেকে মুক্তি সামাজিক অন্যায়ের (Social injustice) বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সামাজিক মর্যাদা (Social dignity) প্রতিষ্ঠার সূচক হিসেবে নিজস্ব চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
রায় সাহেব পঞ্চানন বর্মা:
উপনিবেশিক শাসনকালে পঞ্চাননের নেতৃত্বে রাজবংশীদের আদমশুমারিতে ক্ষত্রিয় জাতির দাবি উঠলেও পরে ক্ষত্রিয় সমিতি গঠনের(1910) পর ওই সমিতির আন্দোলনের চাপে রাজবংশীরা সামাজিকভাবে ক্ষত্রিয় পরিচিতি অর্জন করে। রাজবংশীরা তাঁদের বঞ্চনার তাগিদ থেকেই সেন্সাস রিপোর্ট বা জনগণনায় তাঁদের ক্ষত্রিয় হিসাবে পরিচিতির দাবি তোলেন। ক্ষত্রিয় আন্দোলনের নেতৃত্বরা বুঝেছিলেন কেবলমাত্র জাত্যভিমানকে সম্বল করে অনগ্রসর সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ গ্রহণের জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া। রাজবংশী সম্প্রদায়কে Schedule তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ গৃহীত হয়, দাবি ওঠে সংরক্ষণের। লন্ডনের গোলটেবিল বৈঠকে (1930-1932) নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের জন্য আসন সংরক্ষণের দাবি উত্থাপিত হলে শেষ পর্যন্ত পুনা চুক্তির (1932) দ্বারা 1935 সনের ভারত শাসন আইনে উপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের প্রাদেশিক বিধানসভায় তফসিলিদের জন্য আসন সংরক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত হয়।
একইভাবে বাংলাতেও আইন পরিষদে ক্ষত্রিয় সমিতির পঞ্চানন বর্মা, উপেন্দ্রনাথ বর্মণ প্রমুখ নেতৃত্বরা সংরক্ষণের দাবিতে সরব হলে উত্তরবঙ্গের রাজবংশীরা তপসিলি জাতি হিসেবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংরক্ষণের আওতাভুক্ত হন।
সাম্প্রতিক সময় ও রাজবংশী সমাজ:
১) আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৭৬ বৎসর অতিক্রান্ত হয়েছে। মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, বাংলাদেশ লাগোয়া কোচবিহার, এবং ভারত-ভুটানের আন্তর্জাতিক সীমানা ও আসাম সংলগ্ন আলিপুরদুয়ার সহ পার্বত্য দার্জিলিঙের কেবল সমতলভূমি হলো আবহমান কালব্যাপি রাজবংশীদের বসবাস স্থল। অধিকাংশ রাজবংশী যুবরা ভিন রাজ্যে এবং ভিন দেশে অসংগঠিত পরিযায়ী শ্রমিক। সেখানে কাজ করতে হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে— নেই জীবনের নিরাপত্তা, নেই কোনও জীবনবীমা। প্রতি বৎসর কর্মস্থলে দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর ঘটনা অনেক। কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার, ঠিকাদার সংস্থা বা মালিক কফিনবন্দি মৃতদেহ বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েই খালাস, কোনও দায় নিতে চায় না মৃতের পরিবারের।
২) স্বাধীন ভারতে জাতীয় কংগ্রেস দলের কেন্দ্রীয় সরকারের সময়কালে ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীতে মধ্য মেধার সাহসী ও কঠোর পরিশ্রমী উত্তরবঙ্গের বহু রাজবংশী যুব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেশের সেবা করার সাথে কর্মসংস্থানেও নিয়োজিত ছিলেন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তর প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সচেতনভাবেই আইনকে প্রকল্পে পরিণত করে যারা জীবন বাজি রেখে সীমান্তে পাহারা দেওয়ার কাজ করে তাদের জন্য অগ্নিপথ প্রকল্প চালু করে অসংগঠিত ঠিকা শ্রমিকের মতো ন্যূনতম সাম্মানিক দিয়ে চুক্তিভিত্তিক সেনা নিয়োগের ঘোষণা করেছেন— এ এক নির্মম পরিহাস, পরিতাপের। এর বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গের রাজবংশী যুবসমাজকে অন্যান্য সব জনঅংশের যুবদের নিয়ে সোচ্ছারে প্রতিবাদ প্রতিরোধে শামিল হওয়া দরকার।
৩) মনরেগা প্রকল্পের(২০০৫সালের ২৩ আগস্ট) উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ কর্মসংস্থানহীন মানুষের বছরে অন্তত ১০০দিনের কর্মনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা। রাজবংশী সম্প্রদায়ের একেবারেই প্রান্তিক যে পরিবারগুলি পরিযায়ী শ্রমিক নন কৃষি শ্রমিকের কাজ করেন, বৎসরে অল্প কয়েকদিনের কৃষিকাজ শেষ হলে তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র সহায়সম্বল ছিল মনরেগা প্রকল্পের ১০০দিনের কাজ। মনরেগা প্রকল্পে চাহিদা ও প্রকল্পের উপর যখন নির্ভরতা বাড়ছে তখন কর্মহীন শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কাজের দিনের সংখ্যা ও শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি না করে, প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি না করে ২০১৪ সালে কেন্দ্রের গ্রামোন্নয়ন দপ্তর প্রত্যেক আর্থিক বছরে এই প্রকল্পে বাজেটে বরাদ্দ কমিয়ে সাধারণ শ্রমিক সহ রাজবংশী শ্রমিকদের জীবনে চরম সর্বনাশ ডেকে এনেছে। তারপর গত ৫বৎসর যাবৎ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস এবং কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের কারণে মনরেগা প্রকল্পের কাজ আমাদের রাজ্যে বন্ধ থাকায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উত্তরাংশের রাজবংশী সমাজ।
৪)আমাদের রাজ্যে ২০১১ সালের পর বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ। উত্তর বঙ্গের গ্রামীণ এলাকায় যেখানে সংখ্যাধিক্য রাজবংশী জনগোষ্ঠীর বসবাস সেই বিদ্যালয়গুলিতে রাজবংশী ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যাই সর্বাধিক। গ্রামীণ এই বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় এবং সরকারের উৎসশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্বার্থে বাড়ির পাশে স্থানান্তরিত করায় আজকে বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষা শিকেয় উঠেছে। চরম ভোগান্তি ও শিক্ষা বঞ্চনায় শিকার উত্তরাংশের রাজবংশী পড়ুয়া সহ অন্যান্য তপসিলি সমাজ। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা নেই। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত যেখানে সমাজ বিজ্ঞান থেকে সাধারণ বিজ্ঞান পাঠের মধ্য দিয়ে মানব শিশু মানব সম্পদে পরিণত হয়। প্রগতিশীল মনস্কতা গড়ে ওঠে, যুক্তি দিয়ে বিচার করার স্নায়বিক সক্ষমতা সৃজিত হয়। ২০১১ সনের আগে বিগত বামফ্রন্ট সরকারের বদান্যতায় বেশিরভাগ প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের রাজবংশী জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে প্রগতিশীল রাজবংশী জনসম্পদে পরিণত করার যে বিপ্লবী প্রয়াস অব্যাহত ছিল রাজ্যের বর্তমান তৃণমূলী সরকারের এক দশকের শাসনকালে বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক শিক্ষিকার অভাবে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজবংশী সমাজ, ড্রপআউটের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী রাজবংশী। শিক্ষক নিয়োগের দিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই সরকারের পরিবর্তে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে ছাত্র-ছাত্রীদের কিছু টাকাপয়সা গুঁজে দিয়ে মানবসম্পদ সৃষ্টির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে আর্থিক লেনদেনের মতো প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে ভোটসর্বস্ব ফাটকা রাজনৈতিক প্রচার জারি রেখে আজকে নতুন করে উত্তরাংশের পিছিয়ে পড়া রাজবংশী জনগোষ্ঠীকে অন্ধকার জগতে টেনে নেওয়ার গভীর চক্রান্তও জারি রেখেছে সরকার। রাজবংশী সমাজকে যে অন্ধকার জগৎ থেকে প্রগতির পথে চালিত করে একটি শক্তিশালী জনজাতিতে উন্নীত করেছিলেন মনীষী ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা সেই পঞ্চানন বর্মার উত্তরসূরি উত্তরবঙ্গের রাজবংশীদের একটু গভীরে গিয়ে ভাবা দরকার। ২০১১ সালের আগে বিগত বামফ্রন্ট সরকারের সময় বহু প্রান্তিক কৃষক থেকে খেতমজুর পরিবারের শিক্ষিত রাজবংশী যুব স্কুল শিক্ষক থেকে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি পেয়েছিলেন যোগ্যতার পরিচয় দেখিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এবং শহরে তদানীন্তন বামফ্রন্ট সরকারের সাংবিধানিক সংরক্ষণের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে। আজকে সেসব জলাঞ্জলি। ঊনবিংশ শতকের গোড়ায় যে বঞ্চনা থেকে মুক্তির তাগিদে ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার মতো সমাজ সংস্কারকদের লড়াইয়ের মাধ্যমে রাজবংশীরা তফসিলি জাতির পরিচিতি লাভ করে সংরক্ষণের অধিকার অর্জন করে Scheduled caste হিসাবে রক্ষাকবচ অর্জন করেন। আজকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দুয়ারে সরকার ক্যাম্প করে কোনোরকম বাছবিচার না করে অন্যান্য অনেক সাধারণ নাগরিকদেরও তফসিলি জাতির শংসাপত্র প্রদান করে রাজবংশীদের বহু কষ্টার্জিত তফসিলি জাতির রক্ষাকবচকে মূল্যহীন করে পঞ্চানন বর্মা এবং তার মতো ও পথকেই মূল্যহীন করে তুলেছেন।
রাজবংশীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সাংবিধানিক সংরক্ষণ এবং সামাজিক ন্যায়ের বিষবগুলি বিবেচনায় না রেখে রাজবংশীদের আর্থসামাজিক মানোন্নয়নকামী মৌলিক বিষয়গুলি থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাখতে সরকার গঠন করেছেন রাজবংশী উন্নয়ন পর্ষদ, রাজবংশী অ্যাকাডেমি, রাজবংশী না কামতাপুরী এই বিতর্কের মাঝেই ভাষার স্বীকৃতির নিষ্ফলা ঘোষণা। কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র দপ্তর রাজবংশী যুবদের নিয়ে নারায়ণী সেনা গঠনের যেমন ঘোষণা রেখেছেন তেমনি রাজ্য সরকার তাদের নারায়ণী সিভিক পুলিশ বাহিনী হিসেবে নিবোগের অসাংবিধানিক প্রস্তাব দিয়ে নাটক করছেন। বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি ও সংগঠনগুলিকে মদত দিবে ভোট ব্যাঙ্ক তৈরির জন্য উত্তরবঙ্গকে কখনো আলাদা রাজ্য, কখনো আবার কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল বা রাজ্য গড়ার অবৈধ প্রস্তাব দিয়ে কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয়ের সরকার গোটা রাজবংশী সমাজকে একটা বিভ্রান্তির মধ্যে রেখেছেন।
রাজ্যে ১৩ বছরের তৃণমূল সরকারের সময়কালে যে প্রশ্ন কুরে কুরে খাচ্ছে:
প্রশ্ন ১: রাজবংশী উন্নয়নের নামে পর্ষদ, অ্যাকাডেমির আর্থিক শ্বেতপত্র কোথায় ?
প্রশ্ন ২: রাজবংশী তপসিলিদের শূন্যপদগুলি কবে পূরণ হবে? পদগুলিতে সাধারণের নিয়োগ হচ্ছে
সংবিধানের কোন ধারায় ?
প্রশ্ন ৩: তৃণমূলী জমানার দুষ্কৃতীদের হাতে খুন হয়েছে উত্তরবঙ্গের ধূপগুড়ির রাঙ্গালীবাজনা, মেজবিল, ফালাকাটা, কালচিনি, তুফানগঞ্জ,
কালিয়াগঞ্জের ডলি রায়, সৌমিত্র বর্মণ সহ বেশকিছু রাজবংশী জনগোষ্ঠীর স্কুল পড়ুয়া নাবালক, নাবালিকা, মহিলা এমনকি সন্দেহজনক খুনের তালিকায় আছেন রায়গঞ্জের রাজবংশী বিধায়কও। সকলকেই আত্মহত্যার তকমা দিয়ে অবিচার করেছে রাজ্যের পুলিশ মন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী— কেন ?
প্রশ্ন ৪: জনজাতির উপর অপরাধ দমন সংক্রান্ত সাংবিধানিক Prevention of Atrocities Act 1989 আইন প্রয়োগে বিশেষ আদালতে বিচারের দাবিতে রাজ্য এবং জাতীয় SC-STকমিশনে অভিযোগ জানানো সত্বেও কোনও বিচার নেই— কেন ?
প্রশ্ন ৫: বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিসংস্কার মারফত প্রাপ্ত রাজবংশীদের জমির পাট্টাগুলি
হস্তান্তরিত হচ্ছে কেন?
প্রশ্ন ৬: কেন্দ্রের RSS পরিচালিত BJP সরকার সংবিধানের প্রস্তাবনায় উল্লিখিত ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে হিন্দুত্বের তত্ত্বকে লাগু করে মনুবাদ ও তার সনাতনী হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাতে তফসিলি রাজবংশীদের সামাজিক মর্যাদা ও হিন্দু নাগরিক হিসেবে সব অধিকার সুনিশ্চিত থাকবে তো?
প্রশ্ন ৭: গত বিধানসভা নির্বাচনে ভোটে হেরে রাজবংশীদের "বিশ্বাসঘাতক"
বলে উত্তরের গোটা রাজবংশী সমাজকেই অপমান করেছেন আলিপুরদুয়ারের প্রাক্তন বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তী— কেন ?
প্রশ্ন ৮: রাজ্যের স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী হিন্দু ও মুসলমানদের যখন দু’টি হাতের সঙ্গে তুলনা করেন তখন প্রসঙ্গ যাহাই হোক না কেন রাজবংশীদের দেহের নিম্নাঙ্গের পায়ের সঙ্গে তুলনা করতে হয় কেন ? কেন এত অপমান ও অবহেলা ?
এই অসহনীয় জীবন যন্ত্রণার কথা সংগঠিতভাবে নিবেদন করা দরকার তাদের কাছে যারা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীজাত এই উত্তরাংশ থেকেই রাজ্য ভাগাভাগির জিগির তুলে ফাটকা জনপ্রিয়তা অর্জন করে আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্নেহধন্য হয়ে বিধানসভা, লোকসভা ও রাজ্যসভা সহ আইনসভার প্রতিনিধি মন্ত্রী কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আসন অলংকৃত করেছেন তাদের কাছে।
পরিতাপের বিষব হলো বিগত ৩৪ বছরের যে বাম জমানার হাত ধরে উত্তরবঙ্গের রাজবংশীদের সামাজিক মর্যাদা থেকে জমির মালিকানা, শিক্ষার অধিকার থেকে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত ছিল তা যেন শুধুই ইতিহাসের পাতা। আবার যে রাজবংশী সমাজ পঞ্চানন বর্মার মতোও পথ অবলম্বনে সমাজে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সামর্থ্য অর্জন করেছে সেই পঞ্চানন বর্মার মৃত্যুর ৯০বছর অতিক্রমের সময়কালে রাজবংশীরা হয়তো অতীতের সেই বঞ্চনা আর বর্ণবাদী ব্যবস্থাপনা দ্বারা অন্ধকার একটি সমাজের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হতে চলেছে। আজ জননেতা রাব সাহেব পঞ্চানন বর্মা বেঁচে থাকলে খুব লজ্জা পেতেন। ১৬০তম জন্মদিনে রাব সাহেব পঞ্চানন বর্মাকে শ্রদ্ধা।
Comments :0