Bookstall High Court Salim

প্রতিদিন সরকারের মুখ পুড়লেও শিক্ষা হচ্ছে না, হাইকোর্টে বুকস্টল মামলায় বললেন সেলিম

রাজ্য কলকাতা

বিজয়গড়ে বুক স্টল।

শারদোৎসবের মুখে কলকাতা হাইকোর্ট যখন বামপন্থীদের বইয়ের স্টল খোলায় বাধাদানের নিন্দা করে সরকারকে সতর্ক করছে, তখন কলকাতাসহ রাজ্যজুড়ে আরএসএস বিজেপি’র দুষ্কৃতীবাহিনীর হামলা চলছে বইয়ের স্টলগুলিতে। কোথাও পুলিশের মাধ্যমে স্টল তৈরিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, কোথাও নির্মিত স্টল দুষ্কৃতীরা ভেঙে দিচ্ছে। কিন্তু বামপন্থী কর্মীদের এভাবে ঠেকানো যাচ্ছে না, অদম্য জেদ নিয়ে প্রগতিশীল বইয়ের পসরা নিয়ে স্টল সাজাতে নেমে পড়েছেন তাঁরাও। সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, উৎসবে বই প্রকাশ ও বিক্রি বাংলার সংস্কৃতির অংশ। গত ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এরাজ্যে শারদোৎসবের সময় বই, পত্রিকার শারদ সংখ্যা ইত্যাদি প্রকাশ ও বিক্রির আয়োজন করা হয়ে থাকে। বইয়ের স্টলে বাধাদানের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ থেকে শিক্ষা নিয়ে আরএসএস বিজেপি বুঝে নিক, বাংলার এই পরম্পরা কারো ইচ্ছেপূরণের জন্য শেষ করে দেওয়া যাবে না। (আরও দেখুন: বিরোধী স্বর বন্ধ করা গণতন্ত্র নয়, বুকস্টলের মামলায় খেদ হাইকোর্টের)
মহম্মদ সেলিম কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, জুলুম বন্ধ করে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য হাইকোর্টের নির্দেশকে আমরা স্বাগত জানাই। প্রতিদিন সরকারের মুখ পুড়ছে, কিন্তু শিক্ষা হচ্ছে না। আদালতের আজকের নির্দেশ থেকে শিক্ষা নিয়ে পুলিশ প্রশাসন সতর্ক ও সচেতন হোক। আদালতে সরকারি আইনজীবীকে দিয়ে জোরজুলুমের অন্যায় অপরাধকে আইনসিদ্ধ বলে চালানোর মিথ্যাচার বন্ধ করুক। 
তিনি বলেন, আদালতে সরকারের পক্ষে অ্যাডভোকেট জেনারেল বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে বনগাঁয় বুক স্টলে বাধাদানের সঙ্গে পুলিশের সক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তা জড়িত নয়। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে মুখ্যমন্ত্রীই শারদোৎসবে বুক স্টলের বিরুদ্ধে উসকানি দিয়েছেন। তথাকথিত ধর্মরক্ষক নামের নানা ভুঁইফোঁড় সংগঠন, পুলিশ এবং মস্তানকে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী, সরকার, আরএসএস বিজেপি এই অপকর্মগুলি করাচ্ছেন। শারদোৎসবের সময়ে তাদের রাস্তায় নামিয়ে পায়ে পা দিয়ে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। পুলিশের কাজ এই হামলাকারীদের আটকানো। তার বদলে পুলিশ হয় নিষ্ক্রিয় থাকছে, নয়তো আক্রান্তদের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করছে। 
তিনি বলেছেন, বামপন্থীদের বইয়ের স্টলে বাধা দিয়ে সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদীদের নানা স্টলের অগ্রাধিকার দিয়ে অনুমতি দানের কোনো অধিকার পুলিশ কিংবা সরকারের নেই। কারা স্টল করতে পারবে তার ইচ্ছেমতো বাছবিচার করার ক্ষমতা পুলিশকে কে দিয়েছে? এভাবে শাসকদলের বশংবদ হয়েই পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা তলানিতে পৌঁছেছে। 
আগেরদিনই সিপিআই(এম)’র মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ভবনের কাছে চন্ডীপাঠের নামে উসকানিমূলক কর্মসূচী করেছে একটি ধর্মীয় সংগঠন। সেই প্রসঙ্গের উল্লেখ করে সেলিম বলেন, রাজনৈতিক দলের রাজ্য দপ্তরের সামনে চন্ডীপাঠের নামে তথাকথিত ধর্মরক্ষকরা যা করেছে পুলিশ কি তার অনুমতি দিয়েছিল? কীসের ভিত্তিতে ঐ ধর্মীয় উসকানিমূলক কর্মসূচী করতে দিয়েছিল পুলিশ? 
এই কলকাতা পুলিশের পরোক্ষ মদতেই বুধবার বিকালে ঢাকুরিয়াতে সিপিআই(এম) এবং সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের দুটি স্টলে বাধা দিতে হামলা চালিয়েছে আরএসএস বিজেপি’র বাহিনী। ঢাকুরিয়াতে এই দুটি স্টল পাশাপাশি হচ্ছিল। সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের স্টলটি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এদিন বিকেলে সেখানে প্রায় একশো জনের বাহিনী নিয়ে জড়ো হয়ে হামলা করে দুষ্কৃতীরা। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা সিপিআই(এম) নেতা অচ্যুৎ চক্রবর্তী, শুভ চক্রবর্তী এবং সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের নেতাদের তারা বলে, ‘পারমিশন কোথায়? বইয়ের স্টল করা চলবে না।’ চল্লিশ বছর ধরে বুক স্টল করে আসার কথা বলে রুখে দাঁড়ান বামপন্থীরা। এরপরে নির্মিত সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের স্টলটি ভাঙচুর করে দেয় দুষ্কৃতীরা। তাদের আক্রমণে সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের নেতা বাবুন চ্যাটার্জি ও প্রবীণ নেতা অমলেন্দু ভূষণ চৌধুরী আহত হয়েছেন। বাবুন চ্যাটার্জির চোখে আঘাত লেগেছে। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য তাঁদের বাঘাযতীন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। 
অন্যদিকে এই ঘটনার পরে সিপিআই(এম), সিপিআই(এমএল) লিবারেশন এবং সিপিআই নেতৃবৃন্দ একসঙ্গে লেক থানায় গিয়ে এফআইআর দায়ের করেছেন। তিনটি বামপন্থী দলের কর্মীরা একসঙ্গে থানার সামনে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। সিপিআই(এম) নেতা শুভ চক্রবর্তী অভিযোগ করেছেন, পুলিশ হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না করে আমাদেরই বলছে ১৭ তারিখের আগে স্টল করা যাবে না, খুলে ফেলতে হবে। 
একইভাবে বিভিন্ন জেলাতেও বামপন্থীদের বুক স্টলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচড়াপাড়ায় সিপিআই(এম)’র একটি নির্মাণ হয়ে যাওয়া বুক স্টলের বুধবার উদ্বোধন করার কথা ছিল সিপিআই(এম)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আভাস রায়চৌধুরীর। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে সেটি হামলা করে ভেঙে দিয়েছে দুষ্কৃতীরা। নতুন উদ্যমে সেখানে বুক স্টলের জন্য কোমড় বেঁধে নেমেছেন সিপিআই(এম) কর্মীরা। বুক স্টলের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীর হুমকির পরেই বাধা দিতে নেমে পড়েছে আরএসএস’এর বাহিনী। পুলিশ তাদের না রুখে বুক স্টলে বাধা দিচ্ছে পারমিশনের অজুহাত দেখিয়ে। কিন্তু সিপিআই(এম) নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, এসব সত্ত্বেও বইয়ের স্টলের জন্য উৎসাহে কোনো কমতি নেই। 

Comments :0

Login to leave a comment