Mass Convention against SIR

‘হিন্দুরাষ্ট্র’-র মতলবে চালু এসআইআর বাতিল করতে হবে আন্দোলনেই: আহ্বান গণকনভেনশনে

রাজ্য কলকাতা

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-র নামে সারা দেশে পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্র একা জ্ঞানেশ কুমারের নয়। এটি বিজেপি সরকারকে সামনে রেখে পিছন থেকে আরএসএস-এর পরিচালনায় সংবিধানকে অন্তর্ঘাতের পরিকল্পনা। সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকেই হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনারই অঙ্গ এই এসআইআর। শনিবারের নাগরিক কনভেনশনে এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন প্রাক্তন আইএএস আধিকারিক জহর সরকার, প্রখ্যাত আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য, প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা এবং অভিনেতা প্রকাশ রাজ। অংশ নেন শমীক বন্দোপাধ্যায়, অশোক নাথ বসু, অনিতা অগ্নিহোত্রী, অপর্ণা ভট্টাচার্যও। 
জহর সরকার বলেন,  ১৩-১৪ লক্ষ ভুয়ো ফর্ম-৭ কম্পিউটারেই তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটিই কম্পিউটার দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। আর সেই কম্পিউটার ব্যবস্থাপনা দু’জন ব্যক্তি জানতেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের ডিজি সীমা খান্না।’’ 
জহর সরকার নিজেও রাজ্যে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কাজ করেছেন।  এসআইআর-এর পাঁচটি ব্যর্থতা তুলে ধরেন তিনি। ম্যাপিং, থেকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপান্সি’-তে নাম বাদ, বিচারপতিদের দিয়ে শুনানির মতো বেনজির ঘটনাক্রমের উল্লেখ করেন তিনি।। 
জহর সরকার বলেন, "ফর্ম ৭-র মাধ্যমে অন্যের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, নিজে হাতে কাজ করে বলছি, এই ফর্ম-৭’র মাধ্যমে নাম বাদ কম্পিউটারের সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে। ফর্ম ৭-এর নিয়ম হলো অভিযোগকারীকে কাগজ জমা দিতে হবে। সীমিত সংখ্যায়, পাঁচ বা দশটির বেশি ফর্ম কোনও একজন জমা দিতে পারবে না। সেখানে ১৩-১৪ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার ফর্ম-৭ জমা কী করে দিল? এটা শুধু এখানে নয়, সারা ভারতবর্ষে এই খেলাটা খেলেছে। লক্ষ্য হলো, নাম ঢোকাতে না পারলে নাম তো কাটবই।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমানে নির্বাচন কমিশন বিএলও-দের দিয়ে আবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম-৬ বিলির কথা বলছে। যেখানে লিখতে হচ্ছে ‘আমি প্রথমবার ভোটার হচ্ছি‘। এসআইআর-এ নাম বাদের ক্ষেত্রে এই মিথ্যা তথ্য দিতে বাধ্য করছে কমিশন।
উল্লেখ্য, কমিশনের নতুন নির্দেশকে প্রশ্ন করে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন জমা হয়েছে। 
অভিনেতা প্রকাশ রাজ ভিডিও বার্তায় বলেন, গণতন্ত্র ধ্বংসের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভিডিও বার্তায় প্রখ্যাত অভিনেতা প্রকাশ রাজ বলেন, "আজ সবচেয়ে বিপজ্জনক যে প্রবণতা বা এই শাসকগোষ্ঠীর যে পদক্ষেপ আমাদের দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে, সেটিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।"
তিনি বলেন, ২০২২ সালের আগে থেকেই মোদী-শাহের শাসকগোষ্ঠী কীভাবে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করেছে, তা ইভিএম থেকে শুরু করে বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফলেই স্পষ্ট। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা, বিহারে দল ভাঙার পর এখন ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে ঠিক করা হচ্ছে কারা ভোট দিতে পারবেন আর কারা পারবেন না।
রাজ বলেন, ইসিআইনেট-এর মাধ্যমে তথ্য কেন্দ্রীভূত করা, ফর্ম ৬ বদল করা এবং ফর্ম-৭ ব্যবহার করে সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার প্রমাণ হাতে এসেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর রিপোর্টের পর সেই অসঙ্গতি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
অশোক লাভাসা বলেন, কমিশনের ভেতরেই বিদ্রোহ রয়েছে। ১৬.৫ লক্ষ আপিল কমিশন জমা দিয়েছে নাম বাদ দেওয়ার জন্য।
দেশের প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা তাঁর ভিডিও বার্তায় বলেন, "নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক ক্রমশ বাড়ছে। মানুষ রাস্তায় নামছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছেন। ভারতের ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি আগে কখনও তৈরি হয়নি।"
তিনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২৩ সেপ্টেম্বরের অনুসন্ধানী রিপোর্টের উল্লেখ করে বলেন, নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য আপত্তি জানিয়েছিলেন যে প্রায় এক বছর ধরে কমিশনের বৈঠকের কোনও এজেন্ডা বা কার্যবিবরণী প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি চার মাস কোনও বৈঠকই হয়নি। আইন অনুযায়ী সর্বসম্মতিক্রমে বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা, কিন্তু কার্যবিবরণী না থাকলে কীভাবে বোঝা যাবে?
ফর্ম-৬ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী বিধি পরিবর্তনের অধিকার সরকারের, কমিশনের নয়। তাহলে কমিশন কীভাবে ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন এনে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র জুড়ে দিল? পরে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে তারা এই পরিবর্তন অনুমোদনই করেনি, অথচ কমিশন ২৬ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে দাবি করেছিল সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন দিয়েছে।
ইসিআইনেট নিয়ে তিনি বলেন, গোয়া ও মহারাষ্ট্রের ইআরও-রা অভিযোগ করেছেন যে তাঁরা যোগ্য ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলেও কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার তাঁদের বাধা দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে আপিলেট ট্রাইব্যুনালের ১১ জন বিচারকও অভিযোগ জানিয়েছেন সফটওয়্যার তাঁদের কাজে বাধা দিচ্ছে। ইআরও-ই আইনত নাম তুলতে পারেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার তাঁর ক্ষমতাই কেড়ে নিচ্ছে।
আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, "হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্ন সংবিধান পরিষদে পাশ করাতে ব্যর্থ হলেও আরএসএস ঘুমিয়ে থাকেনি। মোদী ক্ষমতায় আসার পর পরিকল্পনা হয়েছে কীভাবে সংবিধানের অঙ্গগুলোকে ব্যবহার করে হিন্দু রাষ্ট্র কার্যকর করা যায়। এসআইআর সেই পরিকল্পনারই অংশ। এটা কোনও ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়, বিজেপি-আরএসএস-এর সামগ্রিক সিদ্ধান্ত।
তাঁর কথায়, "মানুষের প্রথম অধিকার রাজনৈতিক ন্যায়, যার মূল কথা ওয়ান ম্যান ওয়ান ভোট ওয়ান ভ্যালু। মোদী বুঝতে পারলেন মানুষের সমর্থন বেশিদিন থাকবে না, তাই প্রান্তিক মানুষের ভোট কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা। সংখ্যালঘু, এসসি, এসটি, দলিত — এরাই টার্গেট। পশ্চিমবঙ্গে, বিহারে, সর্বত্র তাই দেখছি।"
তিনি বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্টেও হিন্দুত্ববাদী মানসিকতার বিচারপতি ঢুকে পড়েছেন।’’ তাঁর আহ্বান, "সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব জনগণকেই নিতে হবে। লড়াই হচ্ছে বলেই সুপ্রিম কোর্ট ভিন্ন কথা বলতে শুরু করেছে, যন্তর মন্তরে বিরোধ হচ্ছে বলেই কমিশন বলছে সবার নাম ঢোকাবো। এই লড়াই-ই একমাত্র পথ।"
কনভেনশন থেকে আহ্বান জানানো হয়, সমস্ত ভারতবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংবিধানের মূল্যবোধ, সমতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, চিন্তার ও জীবনের অধিকার রক্ষা করুন। অর্থনৈতিক অসাম্য, দু-তিনটে পরিবারের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভবন এবং ১০০ দিনের কাজের মতো গরিব মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধেও সোচ্চার হওয়ার ডাক দেওয়া হয়।

Comments :0

Login to leave a comment