Union Budget 2025

স্বাস্থ্যখাতের চমকে লাভ নেই মানুষের

ফিচার পাতা


 

ডাঃ ফুয়াদ হালিম

ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বৃদ্ধি দেখানো হলেও স্বাস্থ্যখাতে কেন্দ্রীয় বাজেট বাস্তবে নিতান্তই হতাশাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে জিডিপি’র অনুপাত এবং অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতির অনুপাত ধরলে দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বৃদ্ধির বদলে কমতির দিকেই এগিয়েছে। অর্থাৎ এবারের স্বাস্থ্য বাজেট প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

যেমন জিডিপি’র অনুপাতে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দেশের বাজেট ৪ বছর আগে ছিল ০.৩৭ শতাংশ। বর্তমানে কেন্দ্রের যে বাজেট পেশ হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে জিডিপি’র অনুপাতে কমে ০.২৯ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ ০.০৮ শতাংশ কমে গিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, জিডিপি’র অনুপাত ধরলে ৪ বছর আগের তুলনায় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা কম খরচ করা হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতে। 

কিন্তু সাধারণভাবে নমিনাল টার্মসের ভিত্তিতে দেখানো হচ্ছে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের বাজেট ছিল ৯৪৬৭১ কোটি টাকা যা ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে বেড়ে হয়েছে ১০৩৮৫১ কোটি টাকা টাকা। অর্থাৎ সাধারণভাবে ৯১৮০ কোটি টাকার বৃদ্ধি বলে মনে হলেও মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যবৃদ্ধিকে হিসাবের মধ্যে ধরলে এই বৃদ্ধির হার উল্লেখ্যযোগ্যভাবেই কম, মাত্র ৩.০৪ শতাংশ। এই হার আবার ২০২০-২১ সালের তুলনায় ৫ শতাংশ কম। ফলে ৪ বছর আগে যে স্বাস্থ্য পরিষেবা আমাদের মিলছিল সেটা আজকের দিনে আর পাওয়া যাচ্ছে না।

এই প্রসঙ্গে আরও জানা গিয়েছে ৪ বছর আগে অর্থাৎ ২০২০-২১ সালে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ যেখানে ছিল ২.২৬ শতাংশ, তা কমে ২.০৫ শতাংশ হয়েছে এ বছরের বাজেটে। অর্থাৎ এটা পরিষ্কার যে স্বাস্থ্যে জোর ও অগ্রাধিকার ক্রমশ কমে আসছে। 

এছাড়াও তথ্য বলছে, ন্যাশনাল হেলথ মিশন বা এনএইচএম’র জন্য বরাদ্দ ক্রমশ কমে যাচ্ছে ২০১৯-২০ সাল থেকে। এর মধ্যে রয়েছে মা ও শিশু কল্যাণ, ম্যালেরিয়া-টিবি সহ নন কমিউনিকেবল ডিজিজ ও ডিজিজ কন্ট্রোল, ফ্রন্টলাইন হেলথ ওয়ার্কার, আশা কর্মীদের জন্য বরাদ্দ ইত্যাদি এ সবই প্রভাবিত হয়েছে। টিউবারকিউলোসিসের ওষুধ নিয়মিত সরবরাহ, আশা কর্মীদের ন্যূনতম মজুরির দাবি অবহেলিত হয়েছে। অন্যদিকে বরাদ্দ কম থাকায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

প্রধানমমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা বা পিএমজেএওয়াই- আয়ুষ্মান ভারত-বিমাকরণ প্রকল্প ইত্যাদিতে ২০২৩-২৪ সালের বাজেটে ৭২০০ কোটি টাকা, তার মধ্যে ব্যয় করা সম্ভব হয়েছিল ৬৬৭০ টাকা। স্বভাবতই এই প্রকল্পের পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। এবছর বরাদ্দ বাড়িয়ে ৯৪০৬ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এটা বেসরকারি ক্ষেত্রে হস্তান্তর হচ্ছে। পিএমজেএওয়াই বরাদ্দ বৃদ্ধি স্বাস্থ্যবিমায় কাজে লাগানো হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিমায় ১০০ শতাংশ ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট অনুমোদন করা হয়েছে। এটি বেসরকারি ক্ষেত্রে পা রাখার একটি সরাসরি পদক্ষেপ। এর সঙ্গে পিএমজেএওয়াই-তে বয়স্ক লোকজনকে আলাদাভাবে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে সাধারণ বিমাকরণের প্রিমিয়াম বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

গরিব, দলিত, আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বেসরকারি ক্ষেত্রে চিকিৎসা করতে গিয়ে সরকারি বিমা প্রকল্প থেকে সরাসরি স্বাস্থ্য পরিষেবা পাচ্ছেন না। তাঁদেরকে বাড়তি ব্যয় বহন বহন করতে হচ্ছে। অর্থাৎ সুবিধাকে সম্পূর্ণভাবে পেতে গেলে পকেট থেকে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।

কিছু জীবনদায়ী ওষুধের বেসিক কাস্টম ডিউটি কমানো হয়েছে ক্যানসার, সিভিয়ার ক্রনিক এবং রেয়ার ডিজিজের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে বলা যায় যে ওষুধগুলির দাম যেমন স্পাইনাল মাসক্যুলার অ্যাট্রোফি ডিজিজের ওষুধ (রিজডিপলাম)-এর বার্ষিক বাজেট ৭২ লক্ষ টাকা। ১৫ শতাংশ কমলে এর দাম হবে ৬১ লক্ষ টাকা। কিন্তু এর উৎপাদন খরচ ভারতে মাত্র ৩০২৪ টাকা। ফলে ট্রেড রিলেটেড ইনটেলেকচুয়ালি প্রপার্টি রাইট-এর প্রয়োগ করে কম্পালসারি লাইসেন্সিং-এর মাধ্যমে জীবনদায়ী ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে না নিয়ে এলে ভারতের মানুষের কোনও লাভ নেই। 

প্রসঙ্গত: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ওয়ার্লড হেলথ অর্গানাইজেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন; তারা অনুদান বা আর্থিক বোঝা বহন করবে না বলে জানিয়েছে। আসলে ওষুধের বাজার নিজেদের হাতে ধরে রাখতে চাপ সৃষ্টি করাই উদ্দেশ্য। অন্য দেশ সস্তায় ওষুধ তৈরি করলে বিলক্ষণ আমেরিকার আপত্তি রয়েছে। ইউএসএ’র স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যে রাজনৈতিক অবস্থান ভারতকে প্রভাবিত করছে তা ভারতের সার্বিক আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার চরিত্রকে খর্ব করছে। আবার একই পথে হেঁটে  ভারত সরকার ‘হু’, ‘ইউনিসেফ’ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির জন্য বরাদ্দ ১৭৯ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৯৬ কোটি টাকায় স্থির রেখেছে। 

 দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে গড়ে তোলার জন্য প্রতিবছর যা বরাদ্দ তার ৫০ শতাংশ খরচ করতে পারছে না সরকার। সরকারি ত্রিস্তরীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা– বিস্তার ও ব্যাপ্তি বরাদ্দ থাকলেও স্বাস্থ্যে খরচ করতে না পারা রাজনৈতিক দঢ়তার অভাবের পরিচয়। কোভিড পরবর্তী সময়ে মানসিক রোগের ক্ষেত্রে একটা বিশেষ দিক সামনে আসে। সেই ক্ষেত্রে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্স (নিমহ্যানস)-এর ৪.৪৪ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ কেটে নেওয়া হয়েছে। এবং ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম জন্ম থেকে বাজেট ও মানব সম্পদের ঘাটতিতে ভুগছে। 

মূলত এবারের এই বাজেটও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যকে অগ্রাহ্য করেছে এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সরকারি অনুদানের মাধ্যমে বলিষ্ঠ করার জন্য সচেষ্ট হয়েছে। সুতরাং এটিকে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসাবেই দেখা উচিত। প্রতি বছর ওষুধের দাম গড়ে ১০ শতাংশ করে বাড়বে— এটা নির্ধারিত আছে। বিশেষ করে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ক্যানসারের ওষুধ বা ক্রনিক ডিজিজের ওষুধ বা বিরল রোগের ওষুধের ক্ষেত্রে কাস্টম ডিউটি ছাড় থাকলেও অন্যান্য ওষুধের ক্ষেত্রে কাস্টম ডিউটি ছাড় নেই। উপরন্তু ওষুধের ওপর থেকে জিএসটি-ও ওঠেনি। 

সাধারণভাবে ওষুধের দাম ও চিকিৎসার খরচ ক্রমশ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজেটে গোটা দেশের মানুষের দাবিকে উড়িয়ে দিয়ে  বিমাক্ষেত্রে প্রিমিয়ামের ওপর থেকেও জিএসটি ওঠানো হয়নি। ওদিকে স্বাস্থ্য ব্যয়ের অনুপাতে স্বাস্থ্য গবেষণায় বরাদ্দ মাত্র ৩.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আগেরবার এই বৃদ্ধির হার ছিল ৩.৫ শতাংশ। স্বাস্থ্য গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগের প্রত্যাশা ছিল সরকারের কাছে যা পূরণ হয়নি। 

জিডিপি’র অনুপাতে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানোর বাড়ানোর দাবি উঠেছে দেশ জুড়ে। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে থেকে ব্যয় হলে তা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে। কিন্তু বেসরকারি বাণিজ্যিক সংস্থা হলে তো মুনাফার দিকে ঝোঁক থাকবে। মুনাফার একটি ছাঁকনি তৈরি করবে তারা। সেই যে মুনাফার ছাঁকনি তৈরি হলো তার থেকে মুনাফা বাদ দিয়ে যেটুকু বাঁচবে সেইটুকুই মাত্র পরিষেবা হিসাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে। বাকিটা তারা আত্মসাৎ করবে। এটাই এখন স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বাস্তব হয়ে উঠছে। 

উল্লেখ্য, এই শতকের প্রথমে পৃথিবীব্যাপী যে আর্থিক মন্দা ঘটলো, তার ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্র সেভাবে প্রসার লাভ করতে পারলো না। আবার এও দেখা গেল যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের এই মন্দা আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির সেভাবে ক্ষতি করতে পারলো না। তাই মন্দার পর স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রকেই বেছে নিয়েছিল  পুঁজিপতিরা। 

গত ৯০-এর দশকে আইএমএফ বা ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ডের যে বক্তব্য ছিল তা হলো সরকারি ব্যয় কমাতে হবে। এরপর এরও পরিবর্তন হলো। বলা হলো সরকারি খরচ বাড়াতে হবে বেসরকারি ব্যবস্থা থেকে পরিষেবা কেনার জন্য। তার মানে সরকারি টাকা খরচ হবে বেসরকারি ক্ষেত্রের বিমা কেনার জন্য। এর ফলে জন্ম হয় ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ’-এর। আর মানুষ চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে দারিদ্র সীমার নিচে চলে যেতে থাকলো। আসলে হেলথ কেয়ার ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠার বদলে তৈরি হয়েছে মেডিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি। সরকার ধীরে ধীরে তার ভরতুকি তুলে দিচ্ছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়। আর তাই তো ভারতের অসংখ্য মহিলা ও শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগতে থাকে বছরের পর বছর। 


 

প্রকৃতপক্ষে একসময়ে সরকারের বিভিন্ন বিমা প্রকল্পগুলিকে প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিয়ে বেসরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছিল। ফলে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কায়েম হলো দেশে। এরপরেই বেসরকারি ক্ষেত্র তার থাবা প্রসারিত করতে তাকে। এরপর এটাকেই প্রতিষ্ঠিত করা হলো যে বেসরকারি ক্ষেত্রের মাধ্যমে সরকারি খরচ করতে হবে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য বিমার খরচ সরকারের।  সরকারি ব্যয় বরাদ্দ কমার ফলেই এই ধরনের বিপর্যয় এসে পড়ল। 

এর কুফল হিসাবে দেখা যাচ্ছে এএনএম’র সংখ্যা কমছে যা গ্রামীণ জীবনে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় সংখ্যা কমছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের।  ফলে কমছে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা। আসলে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি পরিচালিত হচ্ছে নয়া উদারীকরণের অভিমুখে। সরকার বিভিন্ন নীতি বা প্রকল্প ঘোষণা করলেই হবে না বা সমস্যাগুলি চিহ্নিত করাই সব নয়, প্রকল্পের সার্থকতা নির্ভর করে সরকারি নীতি বা প্রকল্পগুলি সঠিকভাবে কার্যকরী করার ওপর। দেখা যাচ্ছে প্রান্তিক গরিব মানুষের কাছে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসা পরিষেবার ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা। 

বস্তুত একটি সরকারি হাসপাতালে বা গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কি কি পরিষেবা পেতে পারেন সাধারণ মানুষ, সেখানে সুচিকিৎসার জন্য কি কি সুবিধা বা পরিকাঠামো থাকতেই হবে— সেসব সাধারণ মানুষের জানার অধিকার আছে। প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার। সেই অধিকারের দাবি উঠছে দেশ জুড়ে। রোগ প্রতিরোধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পানীয় জল, খাবার ও পুষ্টি, বসবাসের বাড়ি ও স্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, টিকা ইত্যাদি। আমাদের দেশে সরকারি ক্ষেত্রে বাস্তবে এই বিষয়গুলোকে শুধু কাগজে কলমেই রাখা হয়, বাস্তবে কাজ হয় সামান্যই।  

Comments :0

Login to leave a comment