Mamata Banarjee

তুমুল দুর্নীতি নিয়ে কোনও কথা নেই, আইনি লড়াইকে দায়ী করছেন মমতা

রাজ্য

নিজের সরকারের প্রতিষ্ঠানিক দুর্নীতির দায় নিলেন না মমতা ব্যানার্জি। কেবল প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি এবং এসএসসি’র ঘাড়ে দায় চাপানোর চেষ্টা করলেন তিনি। সেই সঙ্গে বুঝিয়ে দিলেন তাঁর ক্ষোভের আসল কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে চাকরি বাতিলের রায় সামনে আসার পর নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মমতা। 
সেখানে তিনি বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের প্রতি শ্রদ্ধা আস্থা আছে। সব বিচারপতিকে আমরা সম্মান করি। এই রায় আমি মেনে নিতে পারছি না। মানবিক দিক থেকে এই বিচারকে মানতে পারছি না।’’
এর পরপরই তিনি আক্রমণ করেন আইনজীবী এবং সিপিআই(এম)’র রাজ্যসভার সাংসদ বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যকে। নাম করে তিনি বলেন, ‘‘সিপিআই(এম) এর বিকাশবাবু কেস করেছিলেন, পৃথিবী বিখ্যাত আইনজীবী, ওনার নোবেল পাওয়া উচিত।’’ 
উল্লেখ্য, এই অভিযোগ তৃণমূল আগেও করেছিল। বিচার ব্যবস্থার দ্বারস্থ হয়েছিলেন যোগ্য এবং বঞ্চিত চাকরি প্রার্থীরা।  মামলার ফলে রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরের দুর্নীতি সামনে আসে। তার মাত্রা এতটাই যে ফাঁকা ওএমআর শিট দিয়ে চাকরি হয়েছে। কে যোগ্য কে অযোগ্য, তার তালিকা পর্যন্ত আদালতে দিতে পারেনি স্কুল সার্ভিস কমিশন। বান্ডিল বান্ডিল টাকা উদ্ধার হয় প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির বাড়ি থেকে। যোগ্যতা সত্ত্বেও চাকরি পাননি যারা তারাই সঙ্গত কারণে প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন। তখনই সামনে আসতে থাকে দুর্নীতির তথ্য। বঞ্চিতদের হয়ে মামলা লড়েছিলেন আইনজীবী এবং সিপিআই(এম) সাংসদ বিকাশ ভট্টাচার্য। 
এদিন এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম আগেই বলেছেন যে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের জন্য চাকরি বাতিল হয়েছে বাকিদের।  
এদিন এই গোটা দুর্নীতির দায় নিজের দিক থেকে ঝেড়ে ফেলার সব রকম চেষ্টা করেছেন মমতা ব্যানার্জি। তিনি দাবি করেছেন এসএসসি’র কোনও কাজে সরকার নাকি নাক গলায় না। অথচ এই দুর্নীতিকে ঢাকা দিতে সুপার নিউমেরিক্যাল পোস্টের অনুমোদন দিয়েছিল রাজ্য মন্ত্রিসভা, যার মাথায় মমতা। প্রশ্ন এখানেই, দুর্নীতির দায় মেনে নিয়েই তো সরকার সেই সময় এই পদ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা’হলে আজ কেন উলটো কথা বলছেন মুখ্যমন্ত্রী? 
এই মামলায় আদালত এসএসসিকে নির্দেশ দিয়েছিল যোগ্য এবং অযোগ্যদের তালিকা জমা দিতে। কিন্তু সেই তালিকা জমা দেওয়া হয়নি। উল্টে পুড়িয়ে দেওয়া হয় ওএমআর শিট। শিক্ষা আন্দোলনের সব অংশ যোগ্য এবং অযোগ্য কারা, তা বাছাই করে রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়ার দাবি তুলেছিল। যাতে যোগ্যদের চাকরি না যায়। সেই সময় নীরব থেকেছে সরকার। সেই তালিকা যদি আদালতের কাছে জমা পড়ত তবে এদিন যোগ্য চাকরি প্রার্থীদের চাকরি যেত না।
সে সম্পর্কে চোখ বুঁজে থেকে এদিন মমতা বলেন, ‘‘যাদের বাতিল হয়েছে তাদের অনেকে ৯-১২ শ্রেণির শিক্ষক শিক্ষিকা ছিলেন। এদের বাদ দেওয়া হলে কে পড়াবে? স্কুল কলেজকে তুলে দিতে চায় সিপিএম, বাংলাকে পিছিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা? শিক্ষার মানটাকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।’’
উল্লেখ্য রাজ্যে আট হাজার স্কুলের তালিকা এই তৃণমূল সরকারই হাইকোর্টে জমা দিয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল এই স্কুল গুলোয় ছাত্র এবং শিক্ষক কম, স্কুল গুলো সরকার তুলে দিতে চায়। কেন্দ্রের নয়া জাতীয় শিক্ষা নীতিকে মেনেই রাজ্যের নয়া শিক্ষা নীতি চালু করেছে মমতার সরকার। যেখানে স্পষ্ট সরকারি স্কুল তুলে দেওয়ার ছক। 
সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন আগামী ৭ এপ্রিল নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে চাকরি হারানো শিক্ষক শিক্ষিকাদের মুখোমুখি হবেন তিনি। এর আগে আন্দোলনরত অবস্থায় চাকরিপ্রার্থীরা একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার আবেদন জানিয়ে ছিলেন। তিনি সময় দেননি। তাদের সঙ্গে কথা বলেননি। নবান্নে গেলে জুটেছে পুলিশের লাঠি। এখন আদালতের রায় সামনে আসার পর  তাঁদের মুখোমুখি হওয়ার কথা বলছেন মমতা। তবে এদিনও তিনি ‘গণশক্তি’-কে আক্রমণ করেছেন। উল্লেখ্য, রাজ্যে নিয়োগের প্রতিটি পরীক্ষা ঘিরে তুমুল দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। টাকার বিনিময়ে চাকরি এবং তৃণমূলের শীর্ষ স্তরে সেই টাকার ভাগ পৌঁছানোর অভিযোগ উঠেছে।  
এদিন তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি-তে যোগ দেওয়া শুভেন্দু অধিকারীকেও আক্রমণ করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘আমি জানি ২০১৬ সালে মন্ত্রী থাকার সময় কে কোথায় কোন জেলায় কিসের বিনিময় চাকরি বিক্রি করেছে।’’ একদিকে তিনি বলছেন তাঁর সরকার এই দুর্নীতিতে যুক্ত নয়। আবার তারপরই তিনি বলছেন তাঁর মন্ত্রিসভার প্রাক্তন সদস্য একদা ঘনিষ্ঠ নন্দীগ্রামের বিধায়ক চাকরি বিক্রি করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে সেই সময় যদি তিনি জানতেন বিষয়টি তখন কেন কোনও পদক্ষেপ নেননি? 
মুখ্যমন্ত্রী যদিও জানিয়েছেন যে শীরষ আদালতের নির্দেশ মেনে নতুন করে নিয়োগ সময় বেঁধেই হবে। তিনি জানান সুপ্রিম কোর্টে রায়কে মেনে তিন মাসের মধ্যে ফের নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করবে সরকার।

Comments :0

Login to leave a comment