সঞ্চারী চট্টোপাধ্যায়: মাদুরাই
২ এপ্রিল— ঘড়ির কাঁটা তখনও ন’টা ছোঁয়নি। সকালের ব্যস্ততা সবে শুরু হয়েছে মাদুরাই শহরে। রাস্তা ঘেঁষা জলখাবারের দোকানগুলোয় ভিড় বাড়ছে। স্কুলবাসের অপেক্ষায় কচিকাঁচারা। লালরঙা চেন পতাকায় ঢাকা অলিগলি পেরিয়ে তম্বুক্কম গ্রাউন্ডের রাস্তার মোড় থেকে ভেসে আসছে হালকা সুর। মাঠ যত কাছে আসছে, সুরধ্বনি তত বাড়ছে। ড্রামের আওয়াজ ছাপিয়ে কানে বাজছে সেই সুর। মাঠের সোজাসুজি শহীদ বেদীর ডান পাশে ছোট্ট একটি মঞ্চ বাঁধা হয়েছে। সেই মঞ্চেই বাজছে ওই বাজনা। প্রায় দশ-এগারো জন পুরুষ-মহিলা একইরকম বাদ্যযন্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে। এক সুর-ছন্দে বাজিয়ে চলেছেন। কোথাও তাল কাটছে না। কানে লাগছে না। দেখতে সানাইয়ের মতো, ফুঁ দিয়েই বাজাতে হয়। তামিল সংস্কৃতির বহু প্রাচীন ঐতিহ্যশালী এই যন্ত্রের নাম নাগাস্বরম। সাধারণভাবে পূজা-পার্বণ, অনুষ্ঠানেই বাজে। সিপিআই(এম) ২৪তম পার্টি কংগ্রেসের প্রাঙ্গণে এই বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অনুষ্ঠানে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন শেখ চিন্না মৌলানার গ্রুপ। মৌলানার ভাইপো শেখ চিন্না মস্তান ‘লিড’ করছিলেন। দক্ষিণ ভারতে চিন্না মৌলানা এই বাদ্যযন্ত্রের শিল্পী হিসাবে খুবই প্রসিদ্ধ। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে অনুষ্ঠান করেন। তিনি আসতে না পারায় মাদুরাই মিউজিক কলেজের লেকচারার, ভাইপো চিন্না মস্তানকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সঙ্ঘ-বিজেপি’র ধর্মীয় উন্মাদনার বিরুদ্ধে যে সহিষ্ণুতার বার্তা বার বার বামপন্থীরা দিয়ে চলেছেন, সেই ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির সুরই যেন ফের বাঁধা পড়ল নাগাস্বরমের ছন্দে।
প্রায় আধঘণ্টা ধরে বাজল নাগাস্বরম। আস্তে আস্তে সেই সুর মিলিয়ে যেতে পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে মূল পর্বের প্রস্তুতি শুরু করেন নেতৃবৃন্দ। ততক্ষণে গোটা মাঠ ভরে উঠেছে। প্রাঙ্গণ জুড়ে চলছে ‘রেড ভলান্টিয়ার্স মার্চ’। মিছিলের একদম শেষে পার্টির প্রতীক চিহ্ন সংবলিত স্মারক হাতে হাঁটছিলেন রাজ্যের বামপন্থী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ইউ বাসুকী। লাল শার্ট, খাঁকি প্যান্ট এবং টুপি পরে ছেলে-মেয়ে মিশিয়ে হাজারেরও বেশি রেড ভলান্টিয়ার মিছিলে পা মেলান। বয়সের কোনও ভেদ ছিল না। মাঠ ঘুরে সারি বেঁধে তাঁরা এসে দাঁড়ান শহীদ বেদীর সামনে। লাইনের একদম শেষে তিন খুদের উত্তেজনা ছিল চোখে পড়ার মতো। দু’জন পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে, আর অন্যজন নবমের ছাত্র— জিন্নিয়ামা, শঙ্করাইয়াল, কার্তিক কুমার। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানে চারপাশ গমগম করে উঠতেই তারাও বড়দের দেখে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে ধরে। তামিল সহ দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন ভাষায় পরপর স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সীতারাম ইয়েচুরি নগর। রক্ত পতাকা উত্তোলনের সময় আকাশ লাল-সাদা বেলুনে ভরে ওঠে। শামিয়ানার বাইরে দাঁড়ানো নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশকর্মীও তখন উর্দির কথা ভুলে আঙুল রেখেছেন মোবাইল ক্যামেরায়। ততক্ষণে মাঝ আকাশে উড়ছে পর পর লাল পতাকা। মাঠ পেরিয়ে কনভেনশন হলে ঢোকার মূল ফটকের বাইরে গায়ে কমলা জ্যাকেট পরা বহ্নি ভিডিও কল করে তাঁর ছেলেমেয়েকে দেখাচ্ছিলেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বহ্নি সাফাই কর্মী। থাকেন তম্বুক্কমের কাছেই। মাঠ পরিষ্কারের দায়িত্ব আছে বহ্নির মতো আরও দশজনের উপর। কলেজ পড়ুয়া থেকে নির্মাণ শ্রমিক, কৃষক, অধ্যাপক সমাজের সমস্ত অংশের মানুষই ভিড় জমিয়েছিলেন এই মাঠে।
তম্বুক্কম গ্রাউন্ডের বাইরের দিকে পাঁচিল ঘেরা বসার জায়গা কানায় কানায় ভরে ছিল। মাঝবয়সি এক যুবক খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে দাঁড়াতে, কয়েকজন উঠে তাঁকে বসতে দিলেন। দু’দিন আগেই বাইক থেকে পড়ে গিয়েছেন তিনি। বিছানা থেকে নামতে কষ্ট হচ্ছে। তবু মনের টান উপেক্ষা করতে পারেননি। কষ্ট হলেও চলে এসেছেন। বাবার কাঁধে চেপে এসেছে ছোট্ট চিন্নিয়াম। আকাশে বেলুন উড়ছে, বাজি ফাটছে দেখে খুব আনন্দ পেয়েছে সে। তার মতো আরও বহু কুঁড়ির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা একমাত্র যে রাজনৈতিক দল ভাবে এবং সওয়াল করে, নিজের শহরে তাদের এই বিরাট কর্মযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে থাকল সে-ও।
বাইরে তখনও চলছে নাগাস্বরম, তাঞ্জায়ুরের বাজনা। ভিতরে মঞ্চে তরুণ শিল্পীরা গাইছেন বামপন্থী আন্দোলন নিয়ে বাঁধা র্যাাগপ। আধুনিকতা এবং ঐতিহ্যের মেলবন্ধনের সেই ছন্দেই শুরু হলো প্রতিনিধি অধিবেশন।
Comments :0