যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গত দু'দিন ধরে যে উত্তেজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এবার সরব হলেন চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা ও শিক্ষাবিদরা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলার ঘটনাকে 'পরিকল্পিত' এবং 'গণতন্ত্রের উপর আঘাত' বলে অভিহিত করেছেন তাঁরা।
নন্দলাল বসুর প্রতীক ভাঙা ঘৃণ্য অপরাধ: অধ্যাপক পবিত্র সরকার
প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও ভাষাবিদ অধ্যাপক পবিত্র সরকার তীব্র নিন্দা করে বলেন, "যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা হামলা করেছে তারা অসভ্য, বর্বর, হিংস্র একটি শক্তি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য সম্পর্কে এদের কোন ধ্যান ধারণা নেই। নন্দলাল বসুর চিত্রিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রতীক, সেই প্রতীককে তারা আজ ভেঙে দিয়েছে। এর চেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ হতে পারে না।"
পরিকল্পিত উস্কানি ও চেতনায় আঘাত: কমলেশ্বর মুখার্জি
পরিচালক কমলেশ্বর মুখার্জি বলেন, এই উত্তেজক পরিস্থিতি তৈরির কারণ একদম স্পষ্ট, সেটা হচ্ছে ওখানকার যারা ইউনিয়ন রয়েছে তাদের প্রভোক করা।
ছাত্র ইউনিয়নকে 'অরাজনৈতিক' করার দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "পৃথিবীর কোনো কাজকর্ম, কোনো সংগঠনই অরাজনৈতিক হয় না। হয় সে পলিটিক্যাল, না হলে অরাজনৈতিকের ভেক ধরে পলিটিক্যাল কাজকর্ম করে। তাদের পলিটিক্স করার মতো যোগ্যতাও নেই।"
তিনি আরও বলেন, "যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বহু মানুষের জন্ম দিয়েছে। দেশের প্রথম স্বাধীন ইউনিভার্সিটি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর টার্গেট করার কারণ একটাই, তাদের চেতনায় আঘাত করা। চেতনা স্তিমিত হলে মানুষ বশ্যতা মেনে নেবে। আর এই রাজনৈতিক বশ্যতা মানানোর জন্যই রাষ্ট্র সব সময় চেতনাকে দমিয়ে রাখতে চায়।"
বাম ছাত্র সংগঠনগুলির একত্রিত প্রতিবাদকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, সম্মিলিত বামপন্থী শক্তি যদি কাজ না করে, তাহলে বামপন্থা এগোতে পারবে না।
পতাকা পোড়ানোর ঘটনার নিন্দা করে কমলেশ্বর বলেন, "যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে যেকোনো রাজনৈতিক দলের পতাকা জ্বালিয়ে দেওয়া বা পদদলিত করা অসভ্য বর্বরদের কাজ। একটি সাম্প্রদায়িক ও প্রশাসনিক মদতপুষ্ট গোষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট করতে উঠে পড়ে লেগেছে। গত ১৫ বছর ধরে ক্লাব সংস্কৃতির মুখোশ পরে যারা দুষ্কৃতী রাজকে প্রশ্রয় দিয়েছে, এখন তাদের আর মুখোশের প্রয়োজন পড়ছে না।"
এটা বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ নয়, উপর থেকে সিগন্যাল: ইন্দ্রনীল কবি রায়চৌধুরি
পরিচালক ইন্দ্রনীল কবি রায়চৌধুরি এই ঘটনাকে বিক্ষিপ্ত ছাত্র সংঘর্ষ বলে মানতে নারাজ। তাঁর কথায়, "যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেই ঘটনা ঘটেছে তা কোন বিক্ষিপ্ত ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনা নয়। পরিকল্পিত ভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। যাদবপুরের বিধায়কের ভূমিকা দেখে বোঝা যাচ্ছে বিষয়টি। যারা আক্রমণ করেছিল তারা কোন ভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া নয়।"
প্রধানমন্ত্রীর 'আরবান নকশাল' মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "গোটা দেশেই ছাত্র আন্দোলন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। সেটা বুঝেই প্রধানমন্ত্রী দিমাগী নকশাল তকমা দিয়ে 'ডগ হুইসেল' দিয়েছিলেন। ওপর থেকে কোন সিগন্যাল না এলে এই ধরনের ঘটনা ঘটে না।"
ক্ষমতায় এসেই যাদবপুরে আক্রমণ ধারা হয়ে গিয়েছে: ঋতব্রত মুখার্জি
অভিনেতা ঋতব্রত মুখার্জি বলেন, "এটা একটা ধারা হয়ে গিয়েছে, ক্ষমতায় এসেই যাদবপুরের ওপর আক্রমণ করা। পূর্বসূরিদের মতো এই সরকারও সেই ধারা বজায় রাখছে। ১০০ দিনের মধ্যেই পূর্বসূরির মান তারা বজায় রাখতে পেরেছে। বুধবার রাতে যেই ঘটনা ঘটেছে তা ২০১৪ সালের রিপিট টেলিকাস্ট।"
তাঁর বক্তব্য, "আসলে যাদবপুরকে তারাই আক্রমণ করে যাদের ছাত্র সংগঠন সেখানে স্থান পায় না। ভোটের আগে বলেছিল 'ভয় আউট ভরসা ইন', তাই রাতের অন্ধকারে গেট টপকে ক্যাম্পাসে ঢুকে আক্রমণ করছে। এরা মুক্ত চিন্তা, মানুষের সাধারণ প্রবৃত্তি, মেধা, প্রশ্ন করাকে আশ্চর্য একটা বিষয় বলে মনে করে।"
উল্লেখ্য, গত বুধবার রাতে ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের হামলা, ভাঙচুর এবং গেট টপকে ঢোকার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে ওঠে যাদবপুর। এর প্রতিবাদে কলকাতা সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম ছাত্র সংগঠনগুলি বিক্ষোভ দেখায়।
Comments :0