JALPAIGURI TEA GARDEN

আছে শোষন, চা বলয়ের যুব সমাজের জন্য চাই নতুন দিশা

রাজ্য জেলা

বেদব্রত ঘোষ, জলপাইগুড়ি


বনিকের মানদণ্ড যখন রাজদণ্ডে পরিণত হল সেই মুহূর্ত থেকে এদেশকে শেষন করে  ফুলেফেঁপে  উঠেছে লন্ডন, ম্যানচেস্টার, লিভারপুলের মতো বড় ব্রিটিশ শহরগুলি। তাদের এই বিপুল সম্পদ তৈরির অন্যতম উৎস ছিল আসাম, দার্জিলিং ও ডুয়ার্সের চা বলায়। ১৮৭৪ এ জলপাইগুড়ি জেলায় গাজলডায় ইংরেজরা স্থাপন করে ডুয়ার্সের প্রথম চা বাগান। সেই সময় কালে জলপাইগুড়ি জেলার স্থানীয় জনজাতি যেমন রাভা, নিজ, রাজবংশীরা চা বাগানে কাজ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন কারণ তারা কৃষি ও শিকারকে জীবিকা হিসেবে পছন্দ করতেন। সেই জন্য ব্রিটিশরা ছোটনাগপুর ও মধ্য ভারত থেকে ছলে বলে কৌশলে আদিবাসীদের নিয়ে আসেন শ্রমিক হিসাবে কাজের জন্য।  
শুরু থেকেই চা শ্রমিকদের মজুরি ছিল অত্যন্ত কম। এই বৈষম্য আজও বিদ্যমান। আজকেও চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী, এবং যুবসমাজ এই চক্র থেকে বেরোতে পারছে না।  মোদি-মমতা জমানায় বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই বৈষম্য। 
ডুয়ার্সের চা বাগানগুলিতে শ্রমিকদের মজুরি এখনও অপ্রতুল। বাগান কর্তৃপক্ষ শুধু বেতন দেয়, অন্য কোন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে না। সম্প্রতি বহু চা বাগান বন্ধ হয়ে গেছে। বেতন না দিয়েই মালিকপক্ষ বাগান ছেড়ে চলে যায়। এই ধরনের ঘটনায় যুবক-যুবতীরা কাজ হারিয়ে পথে বসছে।  
চা বাগানের শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম। গোটা দেশে সব থেকে কম মজুরি এই রাজ্যে। বাড়ি ভাড়া, ছেলে মেয়ের লেখা পড়া ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে অনেকেই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করলে চা বাগানের মালিকপক্ষ হুমকি বা চাকরিচ্যুতির মতো ব্যবস্থা নেয়।
মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ রোজগার গ্যারান্টি আইন (MGNREGA)-এর অধীনে ১০০ দিনের কাজের প্রতিশ্রুতি থাকলেও চা বাগানের অনেক যুবক এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। স্থানীয় প্রশাসনের দুর্নীতি, তহবিল বণ্টনে অনিয়ম এবং প্রকল্পের অস্বচ্ছতার কারণে কাজের সুযোগ কম পাওয়া যায়। ফলে, বেকারত্ব বাড়ে এবং যুবসমাজ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।
চা বাগানগুলিতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও স্কুলের অবস্থা শোচনীয়। বর্ষাকালে নদীভাঙনের কারণে বহু বাগানের পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায়। শিক্ষার অভাবে যুবকেরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায় না, ফলে তারা বাগানের বাইরে বিকল্প কাজ খুঁজতে পারে না।
চা বাগানের স্কুলগুলিতে শিক্ষকের অভাব, স্কুল বন্ধ, পরিকাঠামোর দুরবস্থা এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ সীমিত। ফলে, শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করলেও উচ্চশিক্ষা বা দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পায় না।  
অন্যদিকে কীটনাশকের সংস্পর্শে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। 
অনেক যুবক চা বাগানের সীমিত আয় ও অনিশ্চিত ভবিষ্যত থেকে বেরিয়ে অন্য রাজ্যে কাজের সন্ধান করেন। কিন্তু অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে তারা প্রায়ই নিম্নমজুরি, অস্বাস্থ্যকর কাজের পরিবেশ এবং শোষণের শিকার হন। বিশেষত, গুজরাট, পাঞ্জাব বা দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে তারা নির্মাণশ্রমিক বা কারখানার কাজ পান, কিন্তু স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো কঠিন হয়ে ওঠে। বাম শাসিত কেরালায় মজুরি আইন রয়েছে। অন্য রাজ্যে তা নেই। 
চা বাগানগুলিতে শ্রমিক আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাত ঘুরেছে। পরিচিতি সত্ত্বা।  কিন্তু প্রকৃত শ্রমিক সমস্যার সমাধান হয় না।  
- আদিবাসী সংস্কৃতি, নাটক, গান, এবং ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা।  
- ফুটবল, ভলিবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।  
কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করা যায়? তা নিয়ে কোন কথা নেই। 
- দক্ষতা উন্নয়ন: বাগানের যুবকদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বিকল্প পেশার সুযোগ তৈরি করতে হবে।  
- সরকারি তদারকি: রেগার মতো প্রকল্পের তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।  
- স্বাস্থ্য সচেতনতা: মোবাইল ক্লিনিক ও টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হবে ।  
- মানব পাচার রুখতে সচেতন টিম অঞ্চলে দরকার। 
ডুয়ার্সের চা বাগানের যুবসমাজ আজ এক ক্রসরোডে দাঁড়িয়ে। পুঁজিবাদীদের শোষণ, রাজনৈতিক বিভাজন, এবং সরকারি অবহেলা তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে রেখেছে। কিন্তু বামপন্থী যুব সংগঠনগুলি যদি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ও বিকল্প অর্থনীতির মডেল নিয়ে এগিয়ে আসে, তবে এই যুবশক্তিকে একটি নতুন দিশায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করে।  
চা বাগানের যুবদের সমস্যা শুধু একটি সম্প্রদায়ের নয়, এটি সমগ্র সমাজের দায়িত্ব। তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

Comments :0

Login to leave a comment