অন্যকথা
মুক্তধারা
---------------------------------------------
ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের তরুণ অরুণ ভগৎ সিং
---------------------------------------------
সৌম্যদীপ জানা
ভগৎ সিং—একটি নাম, যা উচ্চারণ করলেই রক্তে যেন অদ্ভুত এক স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে। তিনি শুধু ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন বীর শহীদ নন, তিনি এক জাগ্রত চেতনা, এক অদম্য সাহসের প্রতীক। মাত্র ২৩ বছর বয়সে দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, স্বাধীনতার মূল্য কতটা গভীর হতে পারে। ২৩শে মার্চ তার, শুকদেব ও রাজগুরুর আত্মবলিদান দিবস—এই দিনটি আমাদের কাছে শুধু স্মৃতির নয়, গৌরবের এবং অনুপ্রেরণারও দিন।
পাঞ্জাবের এক দেশপ্রেমিক পরিবারে জন্ম নেওয়া ভগৎ সিং ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনতার ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হন। তার পরিবারে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। পিতা কিশন সিং এবং কাকা অজিত সিং ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। এই পরিবেশেই তার শৈশব গড়ে ওঠে। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড তার মনে গভীর ছাপ ফেলে। বলা হয়, সেই রক্তাক্ত মাটির স্পর্শ তার অন্তরে এক অটল সংকল্প জাগিয়ে তোলে—দেশকে স্বাধীন করতেই হবে। একইভাবে শুকদেব ও রাজগুরুও শৈশব থেকেই দেশের জন্য কিছু করার তীব্র ইচ্ছায় অনুপ্রাণিত হন।
কৈশোর অতিক্রম করতেই ভগৎ সিং সক্রিয়ভাবে বিপ্লবী আন্দোলনে যুক্ত হন। তিনি “হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন”-এর সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার চিন্তাধারা ছিল সুস্পষ্ট—অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে শুধু কথায় সীমাবদ্ধ রাখা নয়, প্রয়োজনে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তিনি, রাজগুরু ও শুকদেব মিলে ব্রিটিশ অফিসার সন্ডার্সকে হত্যা করেন। এই ঘটনা তাদের বিপ্লবী জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে দিল্লির কেন্দ্রীয় বিধানসভায় বোমা নিক্ষেপ করে তারা “বধ নয়, প্রতিবাদ”—এই বার্তা সারা দেশে পৌঁছে দেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আত্মসমর্পণ করেন, যাতে তাদের আদর্শ ও বক্তব্য জনমানসে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৩১ সালের ২৩শে মার্চ—এই দিনটি ভারতীয় ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। ভগৎ সিং, শুকদেব ও রাজগুরুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ব্রিটিশ সরকার ভেবেছিল তারা বিপ্লবের আগুন নিভিয়ে ফেলবে। কিন্তু তাদের আত্মবলিদান সেই আগুনকে আরও প্রজ্বলিত করে তোলে। মৃত্যুর মুহূর্তেও তাদের কণ্ঠে ছিল দৃপ্ত উচ্চারণ—“ইনকিলাব জিন্দাবাদ।” তাদের এই অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগ গোটা জাতিকে নাড়িয়ে দেয়।
ভগৎ সিং শুধু একজন বিপ্লবীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক গভীর চিন্তাবিদও। তার লেখনীতে স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়ের স্বপ্ন স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তার আত্মবলিদান ভারতীয় যুবসমাজকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে, তাদের মধ্যে সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করে। শুকদেব ও রাজগুরুও সমানভাবে এই সংগ্রামের অংশীদার ছিলেন; তাদের অবদান ভগৎ সিং-এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভগৎ সিংদের প্রাসঙ্গিকতা আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। যখন সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয়, স্বার্থপরতা ও উদাসীনতা বেড়ে চলেছে, তখন তাদের আদর্শ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেন, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ, সত্যের প্রতি অটলতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই গুণগুলোই একটি সুস্থ সমাজ গড়ার মূল ভিত্তি।
সুতরাং, ২৩শে মার্চ শুধু একটি স্মরণ দিবস নয়, এটি এক প্রতিজ্ঞার দিন। ভগৎ সিং, শুকদেব ও রাজগুরুর আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়ে দেয়, জীবনের প্রকৃত অর্থ কেবল নিজের জন্য বাঁচা নয়, বৃহত্তর কল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা। তাদের রক্তে লেখা ইতিহাস আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে, আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়। “ইনকিলাব জিন্দাবাদ”—এই ধ্বনি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, সমানভাবে প্রেরণাদায়ক।
Comments :0