অন্যকথা | সোনাম ওয়াংচুক কে?
কৃত্তিকা ভট্টাচার্য্য
নতুনপাতা | বর্ষ ৪ | ২০ জুলাই ২০২৬
বর্তমান সময়ে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত এই মানুষটির জন্ম পরিচয় বা কাজ কি?
উত্তরগুলো আমাদের অনেকেরই অজানা। ১৯৬৬ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর উলেইতোকপোতে(আলচির কাছে) লেহ জেলায় লাদাখে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সোনাম ওয়াংয়াল হলেন লাদাখের পরিবেশ সচেতক ও জম্বু ও কাশ্মীরের মন্ত্রী । তার মা সেরিং ওয়াংমো। তাই শিক্ষাজীবন অন্যরকমের ছিল, তিনি ন'বছর পর্যন্ত বিদ্যালয়ে যাননি, কারণ তার গ্রামে বিদ্যালয় ছিল না। এই সময় তিনি তার মায়ের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে তার বাবা মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি শ্রীনগরের একটি স্কুলে ভর্তি হন, এবং ভিন্ন শারীরিক গঠন হওয়ার কারণে সেখানে বিপর্যস্ত হয়ে তিনি দিল্লির কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় ভর্তি হন। এবং পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। তিনি জম্বু কাশ্মীরের বিখ্যাত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি ( এন আই টি) তখন রিজওনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ১৯৮৭ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। শেষদিকে পড়াশোনাও খরচ চালাতে তিনি বাচ্চাদের পড়াতেন। তিনি ফ্রান্সের গ্রেনোবলেতে অবস্থিত ক্রাটের স্কুল অফ আর্কিটেকচার থেকে পরিবেশ বান্ধব এবং টেকসই মাটির বাড়ি তৈরির কৌশল শিখতে আর্থেন আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশোনা করেন। এবং পরবর্তীতে এই কৌশল ব্যবহার করে তিনি লাদাকে প্লাস্টিক বা কাঠছাড়া সোলার হিটেড মাটির বাড়ি তৈরি করেন। তার আরেকটি কীর্তি 'আইস স্তূপা', লাদাখে শীতকালে জল জমে থাকত এবং বসন্তকালে চাষের জন্য জল পাওয়া যেত না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি কৃত্রিম হিমবাহ বা 'আইস স্তূপা' তৈরি করেন যা শীতকালের উদ্বৃত্ত জলকে পাইপের সাহায্যে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামিয়ে দেবে, এবং সেই জল জমাট বেঁধে বিশাল বরফের শঙ্কুতে পরিণত হবে। এবং এইটি খুব ধীরে ধীরে গলে হলো ফলত চাষের সময় এপ্রিল মে মাস নাগাদ জলের অভাব পূরণ হয়। এই কাজের জন্য তিনি ২০১৬ সালে বিশ্ববিখ্যাত রোলেক্স অ্যাওয়ার্ড পান। তোর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল প্যাসিভ সোলার বিল্ডিং। লাদাখের উষ্ণতা কম বা শীতপ্রধান দেশ, বলতো শীতকালে তাপমাত্রা -২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নেমে যায়। তিনি মাটি ও কাদা দিয়ে এমন পরিবেশবান্ধব ঘর ও স্কুল তৈরি করলেন যা কোন কার্ড বা জ্বালানি ছাড়াই ভেতরের পরিবেশকে ১৫° সেলসিয়াস গরম রাখে এই ঘর গুলি দিনের বেলায় সূর্যের তাপ শোষণ করে এবং রাতে তা ঘরের ভেতর থাকে। এমনকি লাদাখে বা কাশ্মীরে যেসব ভারতীয় সেনারা আছেন তাদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী।
তিনি ১৯৮৮ সালে "সেকমল" স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে সেইসব ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হয় যারা প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থায় সফল হতে পারে না। মুখস্থ বিদ্যার বদলে এখানে হাতে-কলমে কাজ, বিজ্ঞান চর্চা, চাষাবাদ ,সোলার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্যবসা পরিচালনার মতন বিভিন্ন জীবন উপযোগী শিক্ষা দেওয়া হয়। ছাত্রদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বিদ্যালয় যেখানে কমিটি গঠন করে তারা কাজ করে এবং প্রতি দুই মাস পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি বদল হয়। এবং উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি হায়াল ইউনিভার্সিটি (হিমালিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অল্টারনেটিভস) , এখানে তাদের পরিবেশ রক্ষা এবং পাহাড়ি এলাকায় টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন প্রজেক্ট ও সেই সংক্রান্ত কাজ শেখানো হয়। লাদাখের সরকারি স্কুল গুলোর মান উন্নত করতে তিনি সরকারের সহযোগিতায় পাঠ্য বই স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষার উপযোগী করে তোলে, এরফলে পাশের হার ৫% থেকে ৭৫% হয়ে যায়। তিনি সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অশোক ফাউন্ডেশন থেকে ২০০২ সালে সম্মানিত হন, শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ভারতের বিভিন্ন নামেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ফিলিপাইন থেকে তিনি "রমন ম্যাগসেসে পুরস্কার(২০১৮) " পান এশিয়ার নোবেল পুরস্কার হিসেবে গণ্য হয়। ফ্রান্স থেকে প্যাসিভ সোলার প্রযুক্তিতে পরিবেশবান্ধব মাটি ও সৌরচালিত বাড়ি তৈরির দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি "গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড ফর সাসটেইনেবল আর্কিটেকচার" পুরস্কার পান, এছাড়াও পরিবেশ ও মানবাধিকার রক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য 'ফ্রেড এম প্যাকার্ড পুরস্কার' এবং ইউনেস্কো থেকে স্থাপত্যের বিশেষ সম্মান অর্জন করেছেন। ভারতেরুপরিবেশ রক্ষায় ও দেশীয় ঐতিহ্যকে বিজ্ঞানের সহায়তায় প্রাকৃতিক রূপে সমস্যার সমাধানে তার কৃতিত্ব অসামান্য এবং বিদেশে বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত হয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন।
Comments :0