মুক্তধারা
কেতকী কুশারী ডাইসন: দ্বিখণ্ডিত নন, দ্বিভাষিক - এক বহু-জগতের লেখিকা
গৌতম রায়
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
বাংলা সাহিত্যে কেতকী কুশারী ডাইসনের মতো লেখিকা বিরল। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, রবীন্দ্র-গবেষক এবং ডায়াস্পোরা-তাত্ত্বিক। তিনি কলকাতায় জন্মেও অক্সফোর্ডে বাস করেন, কিন্তু কলকাতাকে ছাড়েননি; ইংরেজিতে লিখেও বাংলাকে ছাড়েননি। এই দ্বৈততাই তাঁর শক্তি।
জীবন ও শিক্ষা - প্রেক্ষাপট
জন্ম: ২৬ জুন, ১৯৪০, কলকাতা। পৈতৃক নাম কেতকী কুশারী । পিতা অরুণ কুশারী, সরকারি আমলা ছিলেন।
১১ ই সেপ্টেম্বর ,'২৬ তিনি প্রয়াত হয়েছেন।
শিক্ষা:-
--------
এইখানেই ইতিহাস তৈরি হয়।
১৯৫৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা থেকে ইংরেজি সাহিত্যে রেকর্ড নম্বর নিয়ে বি.এ. পাশ করেন।
১৯৬৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে First Class - প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন ।
১৯৭৫ সালে অক্সফোর্ড থেকেই ডি.ফিল।
তাঁর থিসিসের শিরোনাম ছিল 'A Various Universe: The Journals and Memoirs of British Men and Women in the Indian Subcontinent, 1765-1856'। পরে অক্সফোর্ডের Centre for Cross-Cultural Research on Women-এ Research Associate হিসেবে কাজ করেছেন।
এর মাঝে ইংরেজ পণ্ডিত রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে বিবাহ এবং সেই সূত্রে 'ডাইসন' পদবী গ্রহণ। তিনি যুক্তরাজ্যেই বসবাস করেন, কিন্তু বছরের অনেকটা সময় কলকাতায় কাটান।
তাঁর নিজের ভাষায়, চার বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু। Voice of America-কে ২০১১-র এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, প্রথম যে বইটি তিনি পড়েন তা রবীন্দ্রনাথের শিশু (১৯০৩), তারপর কথা-ও-কাহিনী।
সৃষ্টি-সম্ভার - একটি মানচিত্র
-------------------------
তাঁর মোট গ্রন্থের সংখ্যা তিরিশের বেশি। তাকে তিনটি ধারায় ভাগ করা যায়:
বাংলা কবিতা - মূল ভিত্তি:-
বক্কল (১৯৭৭), সজীব পৃথিবী (১৯৮০), জলের করিডোর ধরে (১৯৮১), কথা বলতে দাও (১৯৯২), যাদুকর প্রেম (১৯৯৯), দোলনচাঁপায় ফুল ফুটেছে (২০০০)।
ইংরেজি কবিতা: Sap Wood (১৯৭৮)
Hibiscus in the North (১৯৭৯), Spaces I Inhabit (১৯৮৩), Memories of Argentina and Other Poems (১৯৯৯)। Spaces I Inhabit নিয়ে Journal of South Asian Literature-এ বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।
উপন্যাস ও আত্মজৈবনিক গদ্য - প্রবাসের প্রথম দলিল:
নোটন নোটন পায়রাগুলি - এটি বাংলা সাহিত্যে ব্রিটেনে বাঙালি অভিবাসী জীবনের প্রথম সার্থক উপন্যাস হিসেবে গণ্য। একজন বাঙালি নারীর চোখে বর্ণবিদ্বেষ, ঠান্ডা, একাকীত্ব ও টিকে থাকার লড়াই - এখানে রোমান্টিক প্রবাস নয়, আছে রুক্ষ বাস্তবতা।
নারী, নগরী (১৯৮১) - আত্মজৈবনিক স্কেচ।
রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে (১৯৮৫)। এটি উপন্যাস, গবেষণা ও অনুবাদের মিশেল। এই বইয়ের জন্য তিনি ১৯৮৬ সালে প্রথম আনন্দ পুরস্কার পান।
গবেষণা ও প্রবন্ধ - যেখানে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী:-
--------------------
A Various Universe: A Study of the Journals and Memoirs of British Men and Women in the Indian Subcontinent 1765-1856 (OUP, Delhi, 1978, 406 pages, পুনর্মুদ্রণ ২০০২, ২০০৬) - কোম্পানি আমল থেকে সিপাহী বিদ্রোহের আগ পর্যন্ত ব্রিটিশ নারী-পুরুষের ভারত-বিষয়ক জার্নালের ওপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠ। বইটির পৃষ্ঠা ২০৫-২০৬-এ তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ব্রিটিশ মেমসাহেবরা 'বাড়ি' ও 'সাম্রাজ্য' দুটোকেই একসঙ্গে নির্মাণ করেছিলেন।
In Your Blossoming Flower-Garden: Rabindranath Tagore and Victoria Ocampo* (Sahitya Akademi, 1988) - আর্জেন্টিনীয় লেখিকা ওকাম্পোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের ওপর আকরগ্রন্থ।
রঙের রবীন্দ্রনাথ (আনন্দ, ১৯৯৭, সহ-লেখক সুশোভন অধিকারী) - রবীন্দ্রনাথের protanopia (লাল-সবুজ বর্ণান্ধতা) কীভাবে তাঁর শেষ জীবনের ছবি ও কবিতার রঙ-ব্যবহারকে প্রভাবিত করেছিল, তার বৈজ্ঞানিক ও নান্দনিক বিশ্লেষণ। এই গবেষণার জন্য তিনি দ্বিতীয়বার আনন্দ পুরস্কার (১৯৯৭) পান।
প্রবন্ধগ্রন্থ:-
ভাবনার ভাস্কর্য (১৯৮৮), শিকড়-বাকড় (১৯৯০), চলন্ত নির্মাণ (২০০৫), কাছে-দূরের কক্ষপথে (২০১৫)।
অনুবাদ:
I Won't Let You Go: Selected Poems of Rabindranath Tagore (Bloodaxe Books, 1991, 2nd enlarged edition 2010) - Poetry Book Society Recommended Translation হয়েছিল। বুদ্ধদেব বসুর কবিতা, অ্যাংলো-স্যাক্সন কবিতা, এবং মানবেন্দ্রনাথ রায়ের ভারতীয় নারীত্বের আদর্শ ইত্যাদি।
সম্মাননা: আনন্দ পুরস্কার (১৯৮৬, ১৯৯৭), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুবনমোহিনী দাসী স্বর্ণপদক (১৯৮৬), স্টার আনন্দ শ্রেষ্ঠ বাঙালি (২০০৯)।
কেন তিনি আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক?
-----------------------
কেতকী কুশারী ডাইসনকে আজ পড়া জরুরি, কারণ তিনি আমাদের সময়ের চারটি বড় সংকটের উত্তর আগেই লিখে রেখেছেন:
দ্বিভাষিক পরিচয়ের সংকট:-
তিনি Bilingual Women (Berg, 1994) বইয়ে 'Forging a Bilingual Identity: A Writer's Testimony' প্রবন্ধে লিখেছেন - দ্বিভাষিকতা কোনো ঘাটতি নয়, একটি নির্মাণ। আজ যখন বাঙালি ছেলেমেয়েরা বাংলা-ইংরেজির মধ্যে পরিচয়-দ্বন্দ্বে ভোগে, তখন তাঁর জীবন দেখায় কীভাবে দুটো ভাষাতেই মাতৃভাষার মতো বাঁচা যায়।
ডায়াস্পোরা ও নারীর দৃষ্টি: -
নোটন নোটন পায়রাগুলি ১৯৮৩ সালে লেখা হলেও আজকের 'ইমিগ্র্যান্ট লিটারেচার'-এর পাঠ্যপুস্তক হতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন, প্রবাসে নারীর লড়াই দ্বিগুণ - একদিকে বিদেশি সমাজ, অন্যদিকে নিজের সম্প্রদায়ের পিতৃতন্ত্র। তাঁর বিখ্যাত উক্তি - "দেবী হবার লোভ একটা বিরাট লোভ, একটা দুর্দান্ত নাগপাশ..." - আজও ভারতীয় নারীবাদের অন্যতম শক্তিশালী সমালোচনা।
রবীন্দ্রনাথকে উপনিবেশ-মুক্ত করে পড়া:-
তিনি রবীন্দ্রনাথকে শুধু ভক্তি দিয়ে নয়, বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব ও বিশ্ব-নারীর সম্পর্ক দিয়ে পড়েছেন। রঙের রবীন্দ্রনাথ প্রমাণ করে রবীন্দ্র-চর্চা কীভাবে আন্তঃবিদ্যা (interdisciplinary) হতে পারে।
ইতিহাসের নীচ থেকে দেখা: -
A Various Universe বইটি আজকের decolonial studies-এর অনেক আগে লেখা। তিনি ব্রিটিশ শাসকদের সরকারি দলিল নয়, তাদের স্ত্রী-কন্যাদের ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ে সাম্রাজ্যকে বুঝতে চেয়েছেন।
কেতকী কুশারী ডাইসন কোনো নস্টালজিয়ার লেখিকা নন। তিনি এক সেতু - কলকাতা ও অক্সফোর্ডের মধ্যে, বাংলা ও ইংরেজির মধ্যে, ঘর ও বাইরের মধ্যে। যে বাঙালি আজ বিশ্ব নাগরিক হতে চায়, কিন্তু শিকড় ছিঁড়তে চায় না, তার জন্য তাঁর প্রতিটি বই, প্রতিটি পৃষ্ঠা - বিশেষ করে নোটন নোটন পায়রাগুলি-র ১-৫০ পৃষ্ঠার লন্ডনের বর্ণনা,
রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানের ১০০-১৩০ পৃষ্ঠার চিঠি-বিশ্লেষণ, এবং A Various Universe-এর ভূমিকা - আজও অবশ্য-পাঠ্য।
Comments :0