পঞ্চায়েত ও পৌরসভার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে রাজ্যের বিজেপি সরকার। ৭৩ ও ৭৪ তম সংবিধান সংশোধন অনুযায়ী পঞ্চায়েত ও পৌরসভাকে অধিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিলো। যাতে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হাতে আরও বেশি করে ক্ষমতা আসে। কিন্তু রাজ্যের বিজেপি সরকার সংবিধান সংশোধনের নাম করে জনগনের হাতে থাকা ক্ষমতাকে আমলাদের হাতে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। শনিবার দুপুরে হিলকার্ট রোডে অনিল বিশ্বাস ভবনে পৌরসভা ও পৌর কর্পোরেশন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবিধানিক বিষয়ে সাংবাদিক বৈঠক করলেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা মেয়র অশোক ভট্টাচার্য।
গত ২৩ জুলাই রাজ্যের মুখ্য সচিব রাজ্যের স্বাস্থ্য এবং পরিকল্পনা দপ্তরের পক্ষ থেকে একটি নোটিফিকেশন জারি করেছেন। সেই নোটিফিকেশন অনুয়ায়ী জন্ম মৃত্যু নিবন্ধিকরনের ক্ষমতা পৌরসভা এবং পঞ্চায়েতের হাতে থাকবে না। এখন থেকে পৌরসভা ও পঞ্চায়েতের বদলে এই বিষয়টি দেখবে সরাসরি ডিএম। এই পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিক বৈঠকে অশোক ভট্টাচার্য বলেন, সংবিধান সংশোধন না করে এমনটা কোনভাবেই করা যায় না। শুধুমাত্র ১৯৬৯’র একটি রুলস্ বা রেগুলেশনকে উদ্ধতি করে সংবিধানকে এড়িয়ে পৌরসভা এবং পঞ্চায়েতের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পুরোপুরি অসাংবিধানিক কাজ করছে। মুখে বলছে দুর্নীতি দমন করবে। কিন্তু দুর্নীতি দমন করা আদৌও এই সরকারের উদ্দেশ্য নয়। এসআইআরে পশ্চিমবঙ্গের যে ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। ট্রাইবুনালে আবেদন জমা পড়েছে। এবার সেই নাম পাকাপাকিভাবে ভোটার তালিকা থেকে কেটে ফেলাই এর আসল উদ্দেশ্য।
বিভিন্ন তথ্য পরিসংখ্যান তুলে ধরে এদিন প্রাক্তন মন্ত্রী বলেছেন, পঞ্চায়েতগুলি গ্রামাঞ্চলের এবং পৌরসভাগুলি শহরাঞ্চলের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। সংবিধানে এই দুটি সংস্থাকেই তৃতীয় স্তরের সরকার বলা হয়ে থাকে। ১২৫ বার সংবিধান সংশোধন হয়েছে। ১৯৯২ সালে আমাদের দেশে ৭৩ ও ৭৪তম সংবিধান সংশোধন হয়েছিলো। ১৯৯৩ সালের ১ জুন কার্যকরী হয়। সেই সময়ের সংবিধান সংশোধনকে যুগান্তকারী বলা হয়ে থাকে। যার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলো তৃতীয় স্তরের সরকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। সংবিধান সংশোধনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বামফ্রন্ট সরকার সেই সংবিধান সংশোধনের পর নতুন করে পঞ্চায়েত, পৌরসভা ও পৌর কর্পোরেশনের আইন তৈরি করে। সংবিধানে দু’টি নতুন শিডিউল যুক্ত করা হয়। দুই শিডিউলের মাধ্যমে পঞ্চায়েতের হাতে ২৯টি ও পৌরসভার হাতে ১৮টি দপ্তরের ক্ষমতা দেওয়া হয়। বামফ্রন্ট সরকারের সময় ১৭টি দপ্তরকে হস্তান্তরিত করা হয়। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গত ১৫বছরে পঞ্চায়েত পৌরসভাকে সরকারি দপ্তরে পরিণত করেছে। নানাভাবে বিগত সরকার দুর্নীতিকে উৎসাহিত করেছিল। আর বর্তমান বিজেপি সরকার দুর্নীতি দূর করার নাম করে পঞ্চায়েত পৌরসভাগুলির সাংবিধানিক অধিকারগুলো কেড়ে নিচ্ছে। পঞ্চায়েত ও পৌরসভা দুই ক্ষেত্রেই একই কাজ করছে। সংবিধানের আইনকে বাদ দিয়ে ৭৩ ও ৭৪ তম সংবিধান সংশোধনের মূল ধারাগুলোকে উপেক্ষা করে রাজ্য কোন নোটিফিকেশন বা আইন বের করতে পারে না। তিনি বলেন, ১৯৩২ সালের বেঙ্গল মিউনিসিপালিটি অ্যাক্টের পরবর্তীকালে সংবিধান সংশোধনের সময় আবশ্যিক করা হলো প্রতিটি রাজ্যে সংবিধান সংশোধনীকে সামনে রেখে নতুন করে পৌর আইন তৈরি করতে হবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, পঞ্চায়েত ও পৌরসভাকে বাদ দিয়ে জন্ম মৃত্যু নিবন্ধিকরনের ক্ষমতা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে তুলে দিতে স্বাস্থ্য এবং পরিকল্পনা দপ্তরের পক্ষে রাজ্যের মুখ্য সচিবের জারি করা নোটিফিকেশন সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। দুর্নীতি দূর করার নাম করে এসআইআরে নাম বাদ পড়া যে সমস্ত মানুষেরা পুর্নবিবেচনার আবেদন জানিয়েছে, সেই নামগুলিকে স্থায়ীভাবে ডিলিট করাটাই বিজেপি সরকারের আসল উদ্দেশ্যে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশেই সরকার এই কাজ করছে। আমাদের দাবি পৌরসভা ও পঞ্চায়েতের ক্ষমতা কোনভাবেই যাতে কেড়ে নেওয়া না হয়। দুর্বল না করে আরও বেশি ক্ষমতায়িত করতে হবে। ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া নয়, পৌরসভা ও পঞ্চায়েতগুলিকে আরও ক্ষমতাশালী করা না হলে সরকারের উন্নয়নের সুবিধাগুলি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। এমনটাই ষোড়শ অর্থ কমিশনে বলা আছে। আমরা গণতন্ত্রের পক্ষে। আমলাতন্ত্রের হাতে নয়, জনগনের হাতে ক্ষমতা চাই। কারণ গণতন্ত্রের বিকল্প কখনই আমলাতন্ত্র হতে পারে না।
Ashok Bhattacharya
জন্ম-মৃত্যু নোটিফিকেশন অসাংবিধানিক, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদই লক্ষ্য: অশোক ভট্টাচার্য
×
Comments :0