ভ্রমণ
মুক্তধারা
ষোলোআনা নিজমিয়ানা
অভীক চ্যাটার্জী
২১ মার্চ ২০২৬, বর্ষ ৩
জোড়া শহরের জোড়া ইতিহাস
আমি যে মেসবাড়িতে থাকতাম, সেখানে আমার রুমমেট ছিল আর একটি তেলেগু ছেলে, নাম তার নবীন। যে রবিবারগুলোতে আমরা বাড়ি যেতে পারতাম না, সেগুলোতে আমি তার সাথে ঘুরতে বেরোতাম বিকালের দিকে। এমনই এক বিকেলে সন্ধ্যার আলো গায়ে মেখে আমার এই শহরকে দেখা। যা ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় তথ্যপ্রযুক্তি হাবগুলোর মধ্যে একটা। প্রাচীনত্বের একটুকু লেশ মাত্র নেই। চারিদিকে ঝাঁ চকচকে রাস্তা। তার দুধারে সারি দেওয়া কাঁচ লাগানো ইমারত। আর তার সামনে হাল ফ্যাশনের জামাকাপড় পরা তরুণতুরকি কর্মচারীরা। আকাশে চাঁদ উঠেছে। তবে দেখে মনে হয় এই শহরে প্রতিদিনই পূর্ণিমা। প্রতিদিনই নতুনের উৎযাপন। আমার চোখে প্রথম দেখা হায়দরাবাদের যমজ ভাই " সেকেন্দ্রাবাদ"।
যেখানে হায়দরাবাদের পরতে পরতে লেগে আছে ইতিহাসের ছোঁয়া, সেখানে এই শহরটি কিন্তু ততটা পুরোনো নয়। এখানে সেই রাজসিক ঐতিহ্যের অনেকটাই অভাব। বরং এখানে রয়েছে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের গন্ধ। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে যখন হায়দরাবাদে এক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তখন আসাফ যাহ বংশের উত্তরসূরিরা ব্রিটিশদের সাথে এক আতাত করেন। যেখানে বলা হয় যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনারা নিজামের রাজ্যে অবস্থান করবে। আর তার বিনিময়ে নিজাম মাসে মাসে অর্থ প্রদান করবে সরকার কে। নিজাম অন্য কোনো বিদেশি শক্তির সঙ্গে স্বাধীনভাবে সম্পর্ক রাখতে পারবেন না। নিজামের এই ব্রিটিশ সরকারের সাথে চুক্তিই সেকেন্দ্রাবাদের জন্মের ভিত্তি।
সেনা এলো হায়দরাবাদে। তাদের থাকার জন্যে চাই এক বিরাট পরিসরের এলাকা। সেকেন্দ্রবাদ জায়গাটি তখন পছন্দ করা হয় সেনাশিবিরের জন্য। কারণ এটি হায়দরাবাদের খুব কাছে হলেও শহরের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। খোলা সমতল প্রান্তর আর তুখোড় যোগাযোগ ব্যবস্থা, সেনাশিবির গড়ার জন্য আদর্শ। ১৮০৬ সালে এক সুন্দর সকালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনারা এসে পৌঁছয় এই জায়গাতে। শুরু হয় নতুন শহরের পথ চলা। নাম হয় সেকেন্দার যাহ্ এর নামে। তৈরি হয় ইউরোপীয় ধাঁচের বাড়ি, প্যারেড গ্রাউন্ড, ব্যারাক, চার্চ, ক্লাব এবং রেসকোর্স। রাতারাতি ভোল পাল্টে খোলা মাঠে তৈরি হয় এক দরকচা মারা ইউরোপীয় শহর। আর মাঝখানে নীরবে সব কিছুর সাক্ষী হয়ে থেকে যায় হুসেন সাগর হ্রদ।
ইংরেজ এলো, ইংরেজি শিক্ষা এলো, খ্রিস্টান মিশনারি এলো। ধীরে ধীরে নিজামের সাধের শহর বদলে যেতে লাগলো ইংরেজের উপনিবেশে। তবে ব্রিটিশরা এখানে দক্ষিণ ভারতের জংশন স্টেশন তৈরি করে। তার ফল হলো বাণিজ্য ও জনসংখ্যা দুয়েরই বৃদ্ধি।
স্বাধীনতার পর অপারেশন পোলোর মাধ্যমে একে স্বাধীন ভারতের অংশ করে নেওয়া হয়। আজ সেকেন্দ্রাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে ও সামরিক কেন্দ্র। হায়দরাবাদের সাথে সে মিলে মিশে এক হয়ে গেছে আজ। কিন্তু ব্রিটিশদের টুইন সিটির স্মৃতি এখনও জমে আছে তার পরতে পরতে। যদিও এটি কোনও প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি শহর নয়, প্রয়োজন মেটাতে তৈরি করা জনপদ, তবু আজ বলাই যায়, ঐতিহ্যের শহর হায়দরাবাদের পাশে সেকেন্দ্রাবাদ হলো কৌশল আর আধুনিকতার মেলবন্ধন। হয়তো তাই আজ এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এ শহর ছুটে চলে শব্দাতীত বেগে। আর মাঝে বয়ে চলা হুসেন সাগর বলে দেয় সেই বিস্মৃত স্মৃতির উপাখ্যান।
আমরা দুজন সেকেন্দ্রাবাদে পা রাখতেই যেন অন্য এক আবহ। রাস্তা গুলো একটু বেশি গুছানো, পরিবেশে ব্রিটিশ আমলের ছাপ। ক্যান্টনমেন্ট এলাকার শান্তি, গাছঘেরা রাস্তা—সব মিলিয়ে এক আলাদা ছন্দ। হায়দরাবাদের তুলনায় কম কোলাহল, কিন্তু কম আকর্ষণীয় নয়।দুই শহরের এই পার্থক্যটাই আসলে তাদের সৌন্দর্য। একদিকে নিজামের ঐতিহ্য, অন্যদিকে ব্রিটিশদের ছাপ—দুটো মিলে তৈরি হয়েছে এক অনন্য পরিচয়। এখানে সেই আতরের গন্ধ নেই, তার বদলে রয়েছে কড়া পারফিউমের সুবাস। রহস্যময় গলি নেই, বদলে রয়েছে বিশাল চওড়া রাস্তা। আর সেই প্রশস্ত হাত অন্ধ ভিখারী নেই, পরিবর্তে রয়েছে..... নাহ, সবকিছুর প্রতিস্থাপন জরুরি নয়। সম্ভবও নয়। যেমন গোধূলির আলো। যেমন মায়ের আদর। যেমন ইতিহাস।
Comments :0