OBC BILL Bengal

ভাতে মারার কৌশল

সম্পাদকীয় বিভাগ


মাথায় ব্যথা বা অন্য কোনও উপসর্গ দেখা দিলে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা করাটাই সর্বজন বিদেয় কাজ। কিন্তু এরাজ্যের নতুন আরএসএস-বিজেপি সরকার সে পথে না হেঁটে পুরো মাথাটাই কেটে বাদ দেবার ব্যবস্থা করেছে। শুনতে হাস্যকৌতুক মনে হলেও মোটেও হাস্যকৌতুক নয়। বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এবং কার্যকরী বিরোধী শক্তির অভাবে অনগ্রসর শ্রেণি (এসসি,এসটি ছাড়া) সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে ঠিক এই কাজটাই করেছে শুভেন্দুর সরকার। ২০১১ সালে মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় এসে বাম আমলের আইন পরিবর্তন করে অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের সমীক্ষা ও সুপারিশ ছাড়াই নিজের খেয়াল-খুশি মতো পছন্দের নানা গোষ্ঠীকে সংরক্ষণের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেন। ‘হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট’— কোথাও এটা বৈধতা পায়নি। ফলে মমতা জমানায় বণ্ঠিত ওবিসি শংসাপত্র বাতিল বলে ঘোষিত হয়। সংখ্যালঘু মুসলিমদের অধিক সুবিধা দেবার ললিপপ দেখিয়ে ঘুরপথে তাদের ধোকা দিয়েছেন। এমন মমতা ব্যানার্জির অবৈধ কাজকে হাতিয়ার করে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের সংরক্ষণের অধিকারটাই কেড়ে নিয়েছে বর্তমান সরকার। এমনকি বাম আমলে আইনি পথে যাদের সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়েছিল আইন সংশোধনের মাধ্যমে তাদের অধিকারও কেড়ে নেওয়া হলো। আরএসএস নির্দেশ মেনে পশ্চাদপদ হলেও মুসলিমদের সংরক্ষণের কোনও অধিকার দিতে অস্বীকার করেছে শুভেন্দু সরকার। ফলে ১৯৯৩ সালের আইন অনুসারে যে ৬৬টি জাতি গোষ্ঠীকে অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে ওবিসি সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়েছিল এখন সেটাই বলবৎ রইল।
প্রসঙ্গত, সাচার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের পর দেখা যায় অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও প্রায় সবদিক থেকে মুসলিম সমাজ পিছিয়ে আছে। শিক্ষায়, সরকারি চাকরিতে, রুজি-রোজগারে তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে অনেকটাই পিছিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক ন্যায় ও সমতায় বিশ্বাসী বামফ্রন্ট সরকার উদ্যোগ নেয় মুসলিমদের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জাতি গোষ্ঠীকে ওবিসি সংরক্ষণের আওতায় আনার। এক্ষেত্রে রঙ্গনাথ মিশ্র (ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু) কমিশনের রিপোর্ট ও সুপারিশ বামফ্রন্ট সরকারকে বিশেষভাবে সাহায্য করে। সরকার অনগ্রসর কমিশনের সমীক্ষা ও সুপারিশের ভিত্তিতে ৪০টি অনগ্রসর জাতি গোষ্ঠীকে সংরক্ষণের আওতায় আনার ব্যবস্থা করে। কিন্তু পরের বছরই মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় এসে আইন বদলে, নিয়মবিধি ছুঁড়ে ফেলে নিজের মনের মতো করে শংসাপত্র দিতে শুরু করেন প্রশাসনিক নির্দেশে।
মমতা ব্যানার্জির অপরাধকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করে বিজেপি সরকার তাদের হিন্দুত্ববাদী অবস্থান থেকে দরিদ্র পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের সংরক্ষণের অধিকারটাই কেড়ে নিয়েছে, যে অধিকার দিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। অর্থাৎ আরএসএস-বিজেপি পরিচালিত সরকার তাদের আগ্রাসী সাম্প্রদাগিক নীতির ভিত্তিতে মুসলিমদের অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। এটা স্পষ্ট সংবিধান লঙ্ঘণ। জাত, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে ন্যায় ও সমতার অধিকার সকলের আছে। বিজেপি-র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি মুসলিমদের সেই অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু মানুষ সরকারি ব্যবস্থাপনার সু‍যোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আর্থিক ও সামাজিকভাবে আরও পিছিয়ে পড়বেন। অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের চূড়ান্ত প্রান্তিকীকরণ চায় বিজেপি। যাতে স্বাভাবিক বিলুপ্তির পথে তারা দ্রুত তাড়িত হতে পারে।

Comments :0

Login to leave a comment