গল্প
মুক্তধারা
-------------------------------
রক্ত
-------------------------------
সৌরীশ মিশ্র
"কি রে, তুই নাকি রাগ করেছিস আমার উপর খুব! পিসেমশাই দরজা খুলতে-খুলতে বলল।" কথাকটা বাবাই-এর ঘরে ঢুকেই বাবাইকে বলল ওর মামাতোদিদি মাম।
বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে একটু আগে ওর এক বন্ধুর কাছ থেকে উপহার পাওয়া একটা রহস্যরোমাঞ্চ বই-এর পাতা উল্টাচ্ছিল বাবাই। আজ জন্মদিন বাবাই-এর। প্রতি বছরের মতোই বাবাই-এর ক'জন বন্ধু এসেছিল ওদের বাড়িতে। সবাই চলে গেছে এখন। বাবাই-এর বন্ধুরা সবাই জানে, বাবাই বই-এর পোকা। তাই প্রতিবার জন্মদিনেই ও বন্ধুদের কাছ থেকে বই-ই পায় উপহার স্বরূপ। এইবারেও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। সাত-সাতখানা গল্পের বই পেয়েছে বন্ধুদের কাছ থেকে এবার সে। তার মধ্যে পাঁচটা বাংলা আর দুটো ইংরেজি ভাষার। এতোগুলো বই পাওয়ায় মনটা ভীষণই খুশি-খুশি হয়ে আছে তাই বাবাই-এর। ঐ পাওয়া বইগুলো থেকেই একটা নিয়ে পাতা উল্টে দেখছিল সে এতোক্ষণ। তখনই ঘরে ঢুকল মাম।
বাবাই ওর ঘরে ঢোকার দরজার উল্টো দিকে মুখ করে শুয়েছিল, তাই দেখতে পায়নি যে মাম এসে ঢুকেছে ঐ ঘরে। মামের গলা শুনে এবার সে এক ঝটকায় বিছানায় উঠে বসে দরজার দিকে তাকাল। তারপর বলল, "এতোক্ষণে তুমি এলে? সেই বিকেল থেকে ওয়েট করছিলাম তোমার জন্য। আর তুমি এলে এখন? ঐ দ্যাখো, প্রায় ন'টা বাজতে যাচ্ছে।" ঘরের দেওয়াল ঘড়ির দিকে ডানহাত তুলে দেখায় বাবাই। তারপর ফের বলতে থাকে সে, "আমি তোমার সাথে কথাই বলবো না, যাও। আর ব্যাগে করে ঐ যে কি সব এনেছো না আমার জন্য, তার একটাও কিচ্ছু আমি নেবো না, তুমি দেখে নিও।"
ছোট্ট ভাইটার যে ভীষণই অভিমান হয়েছে তার উপর তা ভালোই বুঝতে পারে মাম। আর তা হওয়ারও কথা। ভাইটা ওকে যে ভালোবাসে খুবই। তাই এক্সপেক্ট করে তার জন্মদিনে ওর মামদিদি তাড়াতাড়ি চলে আসবে। ওর সঙ্গে আনন্দ করবে। অন্যান্য বছর তো বাবাই-এর জন্মদিন উইকডেতে পড়লে সোজা কলেজ থেকেই চলে আসে সে। আর ছুটির দিন থাকলে তো কথাই নেই। সকালবেলাতেই হাজির হয়ে যায় সে এখানে। এবারও তো তাই-ই ঠিক করেছিল মাম। কলেজ সেড়ে বিকেলের মধ্যেই চলে আসবে সে এই বাড়ি। কিন্তু কলেজ থেকে বেরোনোর মুখে হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজটা আসতেই তো ওর এখানে তখুনি আসার প্ল্যানটা চেঞ্জ করতেই হোলো ওকে।
মাম দেখল, বাবাই অভিমান করে তাকাচ্ছেই না ওর দিকে। দেওয়ালের দিকে মুখ করে বসে আছে। সে তার হাতে ধরা ব্যাগ দুটো একটা চেয়ারের উপর রেখে পায়ে-পায়ে এগিয়ে এলো বাবাই-এর দিকে। একটু উইক মতোন লাগছে এখন মামের। আর সেটাই যে স্বাভাবিক, সেটাও ভালো মতোনই জানে মাম। যাই হোক, মাম এসে বসল বাবাই-এর বিছানার উপর, ঠিক বাবাই-এর সামনেটায়। বাবাই-এর মুখোমুখি।
"রাগ করেছিস ভাই। একটা এমারজেন্সি এসে গেল এমন..." আলতো করে বলে মাম বাবাই-কে।
"কি এমন এমারজেন্সি, যার জন্য আমার জন্মদিনে তুমি এলে সব শেষ হয়ে যেতে!" মামকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে ওঠে বাবাই। তার গলায় ঝরে পড়ছে রাশি-রাশি অভিমান।
"সেটাই তো বলতে যাচ্ছিলাম। বলতেই তো দিলি না। আমি কোথায় ভাবলাম, আমার ভাইটা ছোট্ট হলে কি হবে, এই বয়সেই বুঝদার হয়েছে খুব। আমি যা করে এসেছি, যেই সেটা শুনবে, আমাকে বলবে, 'আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ, মামদিদি।' তা নয়। এখন তো দেখছি, তোকে নিয়ে আমার যা ধারনা ছিল, তা সবই ভুল।" বলে মাম।
"বলো কি এমারজেন্সি, শুনবো।" এবার বলে বাবাই।
"শুনবি?" শুধোয় মাম।
"বলছি তো শুনবো।" ফের বলে বাবাই।
"তাহলে শোন্," বলতে শুরু করে মাম, "কলেজ থেকে বেড়িয়ে বাসস্ট্যান্ডে এসছি এখানে আসবো বলে, হঠাৎ আমার এক ক্লোজ় ফ্রেন্ড ম্যাসেজ করলো আমায়, ওর একজন পরিচিতর ইমিডিয়েটলি ব্লাড লাগবে। রক্ত না দিলে তাকে বাঁচানোই যাবে না। আমার সেই বন্ধু আমার ব্লাডগ্রুপটা জানতো। ও বলল, আমার ব্লাড কাজে লাগবে ঐ পেশেন্টের। তাই..."
'মামদিদি, তুমি রক্ত দিয়ে এলে!" বলে ওঠে বাবাই।
"হ্যাঁ রে। ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে সোজা আসছি।" বলে মাম।
বাবাই আর কোনও কথা না বলে, তার দু'হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরে দু'হাতে মামকে। আর আলতো করে বলে, "আই অ্যাম ভেরি স্যরি, মামদিদি। কি হয়েছে না জেনে-টেনে, তোমাকে কত্তগুলো যা-তা কথা বললাম। মামদিদি, আই অ্যাম সো প্রাউড অফ ইউ।"
মাম-ও বাবাই-এর মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিতে থাকে আদর করে দু'হাত দিয়ে।
দিদি আর ভাই দু'জনেরই মুখে ঝলমল করছে হাসি এখন।
Comments :0