স্বাধীন ভারতের প্রথম সরকারি বন্ধ! দিল্লির রাস্তায় পা রাখলেই তুলে নিয়ে গিয়ে আটক করছে পুলিশ-আধা সেনা। শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিল্লির বুকে অন্তত ৬০০০ ছাত্র, যুব, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আটক করা হয়েছে। শহরের বুকে একাধিক ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করে তাঁদের আটকে রাখা হয়েছে। রাত পর্যন্ত অনেকের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পঁয়ত্রিশ বছরের কম বয়স এমন সমস্ত যুবককেই রাস্তায়, ট্রেনে বাসে দাঁড় করিয়ে চলছে জেরা। দু-তিন জন দলবেঁধে গেলে সোজা তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঠিক যেন জরুরি অবস্থার শামিল। অনেকে বলছেন, পরিস্থিতি তার থেকেও খারাপ।
পুলিশি হামলা শুধু বিক্ষোভকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এদিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে পথে নামেন কয়েক লক্ষ তরুণ। তাঁদের ওপর দফায় দফায় নৃশংস হামলা চালানো হয়। পথচারী মানুষ, সাংবাদিক, তরুণ ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর’ এমনকি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদেরও বেপরোয়া লাঠিপেটা করা হয়। পুলিশ, আধা সেনার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও রবারের লাঠি হাতে নিরীহ মানুষকে মারধর করতে নামে আরএসএস-বজরঙ দল আশ্রিত দুষ্কৃতীরাও। এমনকি বিক্ষোভের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই এমন সাধারণ নাগরিকদেরও আটক করা হয়। যেমন, এইমস্ দিল্লিতে ভাগ্নের কিডনির চিকিৎসার জন্য সুপারিশ নিতে আসা বিহারের মোহন রাম বিক্ষোভ সম্পর্কে কিছু না জানা সত্ত্বেও পুলিশ তাঁকে বাসে তুলে আটক করে।
শনিবার সকাল থেকে বামপন্থী নেতাকর্মীদের বেলাগাম ধরপাকড় শুরু হয়। হরকিষণ সিং সুরজিৎ ভবনে শুক্রবার মধ্য রাতেই চড়াও হয় পুলিশ। শনিবার সকাল থেকে এ কে জি ভবন সহ দিল্লিতে সিপিআই(এম)’র একাধিক দপ্তর ঘিরে ফেলা হয়।
সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ যন্তর মন্তরের উদ্দেশ্য সিপিআই(এম) নেতাকর্মীদের মিছিল শুরু হতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ ও রায়ট কন্ট্রোল ফোর্স। টেনে হিঁচড়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের আটক করে দিল্লির বিভিন্ন থানায় নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়। পার্টির সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, পলিট ব্যুরো সদস্য ও কেরালার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার, পার্টির প্রবীণ নেত্রী বৃন্দা কারাত, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী, মীনাক্ষী মুখার্জি, সিআইটিইউ’র সভাপতি সুদীপ দত্তকে আটক করা হয়।
সকালে কেরালা ভবনে থেকে যন্তর মন্তরের দিকে সিপিআই(এম), সিপিআই’র একটি মিছিল বেরোয়। অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজে সহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীও তাতে অংশ নেন। মিছিলের প্রথম সারিতে ছিলেন বেবি, বিজয়ন ও বৃন্দা কারাত। তাঁরা যন্তর মন্তরে পৌঁছতেই পুলিশ ঘিরে ফেলে তাঁদের আটক করে। আটক হওয়ার আগের মুহূর্তে বৃন্দা কারাত বলেন, ‘‘ভারতের জনগণ জেগে গিয়েছেন। মোদীকে তা বুঝতে হবে। দিল্লির প্রাণকেন্দ্রের দখল নিয়েছে মানুষ।’’ সিপিআই(এম) কেরালা রাজ্য সম্পাদক এম ভি গোবিন্দন, সাংসদ জন ব্রিটাস সহ অন্যান্যদের রাস্তা থেকে কার্যত চ্যাঙদোলা করে তুলে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ।
এদিকে হরকিষণ সিং সুরজিৎ ভবন থেকে আরেকটি মিছিল শুরু হয়। মিন্টো রোডে উঠতেই পুলিশ হামলা চালিয়ে পলিট ব্যুরো সদস্য বি ভি রাঘভুলু, অরুণ কুমার, বিজু কৃষ্ণন, মারিয়াম ধাওয়ালে সহ অন্যান্যদের আটক করে। ধরপাকড়ের সময় ধস্তাধস্তিতে সিআইটিইউ’র প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক তপন সেন ও সিপিআই(এম) সাংসদ ভি শিবদাসন আহত হন।
আটক হওয়ার পর সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য পিনারাই বিজয়ন বলেন, ‘‘বিরোধীদের ভয় পেয়েই এই ধরনের পদক্ষেপ করছে প্রশাসন। আটক করে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানো হয়েছে। এই ধরনের পুলিশি আচরণ গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত।’’ বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামে তাঁকে আটকে রেখে রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ ছাড়া হয়।
দিল্লির বিভিন্ন স্টেডিয়ামকে ডিটেনশন সেন্টারে পরিণত করে সেখানেই বামপন্থী নেতা-কর্মীদের আটকে রাখা হয়। সুজন চক্রবর্তী সহ ৫০ জন সিপিআই(এম) নেতাকর্মীকে আটক করে হরিয়ানা সীমান্তের কাছে বুরারি থানায় আটকে রাখা হয়। তাঁদের খাদ্য, পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে, পলিট ব্যুরো সদস্য মরিয়ম ধাওয়ালে সহ আটক মহিলা নেত্রীদের মৌর্য এনক্লেভ থানায় নিয়ে গিয়ে শৌচাগার ব্যবহারের অনুমতি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
পাশাপাশি, প্রায় সারাদিনই দিল্লির বিভিন্ন প্রান্তে এসএফআই, ডিওয়াইএফআই, এআইএসএফ ও এআইওয়াইএফ’র কর্মী-সমর্থকদের বেপরোয়া ধরপাকড় চলতে থাকে। এসএফআই নেত্রী ঐশী ঘোষ সহ অন্যান্যদের টেনে হিঁচড়ে তুলে নিয়ে গিয়ে আটক করে নেমপ্লেট-বিহীন পুলিশ। বাসে করে মুন্ডকা থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ কর্মীদের নেমপ্লেট দেখতে চাইলে ঐশী ঘোষ সহ এসএফআই’র ১৭ জন মহিলা সদস্যদের মারধর করা হয়।
ডিওয়াইএফআই’র সভাপতি ও সিপিআই(এম) সাংসদ এ এ রহিম ও সাধারণ সম্পাদক হিমঘ্নরাজ ভট্টাচার্যকে আটক করা হয়। নাংলোই স্টেডিয়ামে প্রায় ৩০০ এসএফআই কর্মীকে আটক করে রাখা হয়। তাঁদের সঙ্গে এ এ রহিম অনশন বিক্ষোভের ঘোষণা করেন। আটক করার সময় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে এক দিল্লি পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। আটক ছাত্রদের মোবাইল ফোন ও ব্যাগও কেড়ে নেওয়া হয়।
সিপিআই(এম)’র অভিযোগ, যন্তর মন্তরের মতো নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলে প্রতিবাদ করার অনুমতি না দিয়ে সরকার সাংবিধানিক অধিকারকে সঙ্কুচিত করতে চাইছে। দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় মোদী-শাহ এই ঘটনার রাজনৈতিক দায় এড়াতে পারেন না। নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন চলবে।
যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর প্রায় সমস্ত পথ বন্ধ করে দিতেই প্রতিবাদ করার বিকল্প জায়গায় খুঁজে বিক্ষোভের ঝাঁঝ বাড়ায় আইসা, সিপিআই(এমএল) লিবারেশন সহ বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন। সফদরজঙ ফ্লাইওভার ও আইএনএ’র আশপাশে তাঁরা জমায়েতের চেষ্টা করেন। সেখানেই বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় আইসা সভাপতি নেহা বোরাকে আটক করা হয়। আটক হন সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব ও আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। তাঁদের বিভিন্ন গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে আটক করা হয়। আইএনএ’র সামনে নেহা সহ আইসা’র নেতাকর্মীদের আটক করতেই সেখানে পালটা বিক্ষোভের ডাক দেয় এসএফআই। পরের পর বিক্ষোভ জমায়েত সামলাতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে যায় অমিত শাহের পুলিশ।
এদিন সকালে গুরগাঁও থেকে সমাজ সচেতক ধ্রুব রাঠিকে আটক করা হয়। তার কিছু পরে দিল্লিতে প্লেনে করে পৌঁছেই আটক হন সিজেপি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, সৌরভ দাস এবং অশুতোষ রাঙ্কা। তাঁদের ৩ জনকেই ভিন্নভিন্ন জায়গায় আটকে রাখা হয়েছে। কাকে কোথায় রাখা হয়েছে রাত পর্যন্ত তা জানা যায়নি। সিজেপি’র আইন বিষয়ক প্রধান রত্না সিংকে পুলিশ ঘিরে একটি গাড়িতে আটকে রাখে। মুখপাত্র মেহের পারসিচাকেও আটক করা হয়।
সারাদিন জনতা পুলিশ খণ্ডযুদ্ধের পর শনিবার শেষ বেলায় তিন সাংসদকে অবস্থানে বসেন মমতা ব্যানার্জি। বিকেলের দিকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল সহ আম আদমি পার্টি (আপ) নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয়। অন্যদের মতো তাঁদেরও আটক করা হয়।
sir protest
দিল্লিতে যেন সরকারি বন্ধ! ধরপাকড়ে আটক ৬০০০
×
Comments :0