ভ্রমণ
মুক্তধারা
ষোলোআনা নিজমিয়ানা
অভীক চ্যাটার্জী
২৮ মার্চ ২০২৬, বর্ষ ৩
হুসেন সাগর পারে
হায়দ্রাবাদ সম্পর্কে যে বা যারা অল্প হলেও জানেন, বা যারা এই শহরে একবার এসেছেন,তারা এই হুসেন সাগর হ্রদের নাম অবশ্যই শুনেছেন। জোড়া শহরের মাঝে বিরাজমান এই হ্রদ তার সৌন্দর্যায়নে এবং প্রয়োজন পূরণে অনন্য। দিনের বেলাতে এর পার জুড়ে থাকে বহু কাজের ঢল আর রাতে এর পারে যেনো মেলা বসে যায়। এর পারে রয়েছে হায়দরাবাদের সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং। রাতে আলোর মালায় তা দেখতে অতুলনীয় লাগে। তবে তার আগে জেনে নেওয়া দরকার এই হৃদযকৃতি হ্রদের হৃদয়ের খবর।
হুসেইন সাগর লেকের ইতিহাসকে যদি একটু গভীরে দেখা যায়, তাহলে এটি শুধু একটি জলাধার নয়—বরং দক্ষিণ ভারতের মধ্যযুগীয় নগর পরিকল্পনা, ধর্মীয় প্রভাব, এবং আধুনিক নগরায়নের এক জীবন্ত দলিল। এটি মূলতঃ একটি কৃত্রিম হ্রদ। যা তৈরি করেছিলেন ইব্রাহিম কুলি কুতুব শাহ ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দে। তৎকালীন শহরের দ্রুত বৃদ্ধি এবং পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন ছিল এক বৃহদ জলাধারের। এর মূল প্রকৌশলী ছিলেন হুসেন সাহ্ ওয়ালি। তিনি একজন সুফি হওয়ার সাথে সাথে একজন জল প্রকৌশলীও ছিলেন। তাঁর নামেই এই প্রবাদপ্রতিম হ্রদের নাম রাখা হয় হুসেন সাগর। হুসেন সাহেব কোনো যে সে জল প্রকৌশলী ছিলেন না। তাঁর তৈরি বাঁধ আজও সক্রিয়। হায়দরাবাদের বুকে সগরিমায় দাঁড়িয়ে আছে tank band road। তাঁর দরগা আজও হ্রদের আশেপাশে অবস্থিত।স্থানীয় মানুষ তাঁকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করত।কিংবদন্তি আছে, তাঁর আশীর্বাদেই এই হ্রদ কখনও পুরোপুরি শুকিয়ে যায়নি।
হ্রদটি তৈরি করা হয়েছিল মুশী নদীর উপনদী ধরে।চারপাশের পাহাড়ি এলাকা থেকে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হতো।পাথর ও মাটির সংমিশ্রণে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করা হয়।এটি ছিল “gravity-fed water system” — অর্থাৎ প্রাকৃতিক ঢাল ব্যবহার করে জল সরবরাহ শহরের বিভিন্ন অংশে খাল ও পাইপলাইনের মাধ্যমে জল পৌঁছে দেওয়া হতো। ব্রিটিশ আমলের সেই সেনা ব্যারাকের মূল জলের উৎস ছিল এই হ্রদ। তবে এখন শিল্প বর্জ্য এবং নালার জল পড়ে হ্রদের জল অনেকটাই দূষিত হয়ে পড়েছে।
১৯৯২ সালে হ্রদের মাঝে স্থাপিত হয় এক বিরাটকায় বুদ্ধ মূর্তি। প্রায় ১৮ মিটার উঁচু এই মূর্তি বিশ্বের বৃহত্তম মনোলিথিক বুদ্ধমূর্তিগুলির একটি। বিশাল গ্রানাইট পাঠক কুঁদে তৈরি এই মূর্তি আধুনিক হায়দরাবাদের প্রতীক। মজার কথা হলো প্রথমে যখন এটি স্থাপনের জন্য তোলা হয়, মূর্তিটি জলে পড়ে যায়(হয়তো হায়দরাবাদের গরমে গৌতম বুদ্ধের একটু জলে স্নানের সাধ জেগেছিল)। পরে তুলে টা আবার স্থাপন করা হয়। নৌকায় করে এই দ্বীপটিতে যাওয়া যায়। যেতে পারেন, ভালো লাগবে।
হ্রদের পরেই রয়েছে লুম্বিনী পার্ক। তার সাথে নেকলেস রোড , সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর এক পর্যটনের জায়গা হয়ে উঠেছে এই অঞ্চল। তবে দূষিত জলের কারণে অতিউৎসাহী হয়ে জলে হাত না ডোবানোই শ্রেয়।যদিও সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা বর্তমানে পুনরুদ্ধার প্রকল্প চালাচ্ছে।
Comments :0