রামশঙ্কর চক্রবর্তী
হলদিয়ায় পেট্রোকেমিক্যালসের ন্যাপথার পাইপলাইন লিক হয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এপর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে একজনের। নাম মানু বিবি(৩৮)। আহত ২৫ জনের মধ্যে আশঙ্কাজনক ৭ জন। কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তারা। আহতদের প্রথমে হলদিয়া মহাকুমা হাসপাতাল পরে কয়েকজনকে তমলুক জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই ঘটনায় স্থানীয়দের একাংশ কারখানা কর্তৃপক্ষের গাফিলতির দিকেই আঙুল তুলেছেন। নিয়মমতো সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলেই এত বড় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টা নাগাদ হঠাৎ বিস্ফোরনে আগুন লাগে পেট্রোকেমিক্যালের ন্যাপথা পাইপলাইনে। পাশের এলপিজি পাইপলাইন থাকায় আগুনের ভয়াবহতা ব্যাপক আকার নেয়। মুহুর্তের মধ্যে পাশের বস্তিতে আগুন লাগে। পুড়ে ছাই হয়ে যায় বস্তির ঘরগুলি। ২৩ টি ঘর ভস্মীভূত হয়েছে। এরা প্রায় চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছে এখানে। বাসিন্দারা যারা বাইরে বেরিয়েছিল তারা প্রত্যেকেই ঝলসে যায়। আহতদের মধ্যে একজন বলেছেন সোমবার রাত্রি দশটা থেকে পাইপলাইনে ন্যাপথা লিক করছিল। তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল এলাকায়। সেই সময় কিছু গুরুত্ব দেয়নি কর্তৃপক্ষ। এরপরে ভোরবেলা এমন আগুনের ঘটনা। হলদিয়া পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের চিরঞ্জীবপুরের এমন ঘটনায় হলদিয়াজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
হলদিয়া শিল্পাঞ্চলে পেট্রোরসায়ন কারখানার পাইপলাইন হলদিয়ার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে গিয়েছে। মূলত অপরিশোধিত তেল, ন্যাপথা প্রবাহিত হয় এই পাইপলাইন দিয়ে। ন্যাপথা হাইড্রোকার্বন জাতীয়। যা অত্যন্ত বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ। ফলে এই পাইপলাইন গুলির রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারন আগুন লাগলে যা ভয়াবহতার আকার ধারণ করে। নিয়মমতো পাইপলাইনগুলির সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি বলেই স্থানীয়দের অভিযোগ। যার কারণে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলেই জানাচ্ছেন তাঁরা। এদিকে কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি ন্যাপথা চুরি করার চেষ্টার ফলেই পাইপ লাইনে লিক হয়েছে। যার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের একাংশ বলছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি তুলছে। তার কারণ এমন দাহ্য পদার্থ প্রবাহিত হয় যেই পাইপলাইন দিয়ে তা এতটাও পাতলা বা কমজোরি পাইপ লাইনের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। তার জন্য নির্দিষ্ট কিছু গাইডলাইন রয়েছে ফলে তা চুরি করা এতটাও সহজ নয়। এদিকে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ সুপার, মহকুমা শাসক সহ প্রশাসনের আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন তাঁরা। স্থানীয়দের সঙ্গেও কথা বলেছেন। এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে বলেই জানিয়েছেন প্রশাসনের আধিকারিকরা। কী কারনে আগুন লাগল তার খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের পক্ষ থেকে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ফলে হলদিয়া পাঁশকুড়া লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ। একেবারেই রেল লাইনের ধার বরাবর পাইপ লাইন বয়ে গিয়েছে। তার পাশেই থাকা ঘরবাড়িতে বিস্ফোরণে আগুন লাগে। ফলে ট্রেন লাইনেরও ক্ষতি হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে এই মুহূর্তে ট্রেন চলাচল সম্ভব নয়। দীর্ঘক্ষণ বন্ধ থাকে হলদিয়া টাউনশিপ থেকে দুর্গাচকগামী রাস্তা। রেল সূত্রে জানা গেছে মঙ্গলবারের ৩৮০৫২ হলদিয়া হাওড়া লোকাল ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। ৩৮০৫১ হাওড়া হলদিয়া লোকালের রুটও পরিবর্তন করা হয়েছে। ট্রেনটি মঙ্গলবার হলদিয়া ঢুকবে না তার পরিবর্তে দুর্গাচক পর্যন্ত যাবে। ৩৮০৫৪ হলদিয়া পাঁশকুড়া লোকাল এদিন দুর্গাচক পর্যন্ত চলবে। আসানসোল হলদিয়া এক্সপ্রেসের যাত্রাপথও দুর্গাচক পর্যন্তই রাখা হয়েছে। ২২৩২৯ হলদিয়া আসানসোল এক্সপ্রেস মঙ্গলবার চলবে তমলুক থেকে।
এদিকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত আগুন জ্বলতে থাকে ঘটনাস্থলে। কালো ধোঁয়ায় ঢেকেছে এলাকা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কারখানা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। দমকল জানিয়েছে পাইপের ভেতর এলপিজি যতক্ষণ থাকবে আগুন নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব নয়। কারখানা কর্তৃপক্ষের থেকে আহতদের সব রকম সহযোগিতা করার কথা জানানো হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানাচ্ছেন এটা অন্তর্ঘাত হয়ে থাকতে পারে। অনেকেই বলছেন রাতে বাজ পড়ে। যেহেতু আগে থেকেই ন্যাপথা লিক করছিল ফলে বিস্ফোরণ হয়ে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আহতদের মধ্যে কয়েকজন হলেন সেক সিকান্দার, সুরভী খাতুন, বিজলী মাইতি, বুল্টি হাজরা, সেক মইদুল ইসলাম, আসিদুর রহমান, মিতা ভূঞ্যা, সন্তু মাইতি, সঞ্জিব হাজরা। হলদিয়া মহাকুমা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে এদের অনেকেই ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ ঝলসে গিয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়েই এলাকায় গিয়ে আহতদের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দেখা করে পাশে থাকার আশ্বাস দেন সিআইটিইউ নেতা লক্ষীকান্ত সামন্ত, পরিতোষ পট্টনায়ক, দেবেশ আদক, বস্তি উন্নয়ন সমিতির নেতা অচিন্ত্য শাসমল, অনিমেষ মাইতি, দেবাশীষ মাইতি সহ অন্যান্যরা।
শ্রমিক নেতৃবৃন্দ বলেন "সোমবার রাত্রি নটার সময় গোটা এলাকায় নেপথার গন্ধে মানুষজন অস্বস্তি বোধ করেন। তখনই পেট্রোকেমিক্যালসের ডিউটি রত নিরাপত্তা বাহিনীদের বিষয়টি বলা হয়। থানায় পুলিশকেও বলা হয়। তারা বলে পেট্রোকেমিক্যালস কর্তৃপক্ষকে বলেছি। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। ন্যাপথার এলপিজি লাইনের সংঙ্গে অগ্নি সংযোগ হয়। যার ভয়ংকর পরিণতি হয় গরিব বস্তিবাসীদের জীবনে। এর পূর্নাঙ্গ তদন্ত করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।"
Comments :0