Argentina Lionel Messi

শুরুতেই অনবদ্য মেসি

খেলা

প্রীতম কোটাল
কাতার বিশ্বকাপে মেক্সিকো ম্যাচে লিওনেল মেসি গোল করার পর বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরির ধারাভাষ্য মনে পড়ে যাচ্ছে! তিনি বলেছিলেন, ‘হি হ্যাজ অলওয়েজ বিন দ্য পয়েন্ট অফ ডিফারেন্স।’ চারটে বছর কেটে গিয়েছে। মেসির বয়স বাড়লেও ধার এতটুকু কমেনি। এক মুহূর্তের জাদুতেই খেলার ফল বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এখনও তাঁর রয়েছে।
আলজেরিয়া ম্যাচে ‘ভিন্টেজ মেসি’কে দেখলাম। স্কোরশিটই বলে দিচ্ছে, আলজেরিয়া হারল মেসির কাছেই। ‘মেসি মায়ায়’ শুরু হল বুধবারের সকাল। মেসির মতো ‘পেরিফেরাল ভিশন’ বোধহয় আর কোনও ফুটবলারের নেই। তাঁর বল নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অনবদ্য। বলটা কোন জায়গায় রাখলে গোলরক্ষক নাগাল পাবে না, লিও’র চেয়ে ভালো কেউ জানেন না। 
ডি বক্সের ওই জায়গাটাকে বলা হয় ‘মেসি জোন’। প্রথম ও তৃতীয় গোলটা করল ডি বক্সের বাইরে থেকেই। ন’মিনিটে অফসাইডের জন্য গোলটা বাতিল হওয়ায় সম্ভবত তাতিয়ে দিয়েছিল মেসিকে। ১৭ মিনিটে গোল করে দলকে এগিয়ে দিলেন তিনিই। রড্রিগো ডি পলের ডিফেন্স ছেঁড়া থ্রু ধরে কিছুটা এগিয়ে জোরালো ইনসুইংটা এমন জায়গায় রাখলেন, জিনেদিন জিদানের পুত্র লুকা জিদানের কিছুই করার ছিল না। শূন্যে উড়ে দু’হাত বাড়িয়ে বলটা ঠেকাতে ব্যর্থ হলেন তিনি। ৬০ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটা অবশ্য ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা’র মতো। ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট গ্রিপ করতে পারেননি লুকা। ফিরতি বলে গোলটা করেন মেসি। তৃতীয় গোল একেবারেই মেসিসুলভ। নিকো গঞ্জালেজের মাইনাস মেসির পায়ে পড়তেই কেটে গেলেন আলজেরিয়ার ডিফেন্ডাররা। কিছুটা এগিয়ে ফাঁকা জমি খুঁজে নিয়ে বাঁ পায়ের শট। জালে জড়িয়ে গেল বল।   
প্রথম ম্যাচে ৩৮-এর মেসি আবারও বুঝিয়ে দিলেন তিনি এখনও ‘পয়েন্ট অফ ডিফারেন্স।’ ১৩ জুনের কাগজে লিখেছিলাম, এই দলটায় পার্থক্য গড়ে দেবে একমাত্র মেসিই। প্রথম ম্যাচেই সেটা প্রমাণ করে দিলেন। গত দুটি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচ জিততে পারেনি। হ্যাটট্রিক করে মেসি বদলে দিলেন ইতিহাস। তাঁর তিন গোলেই অভিযান শুরু করল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। জা ফতেঁ (১৩), গার্ড মুলার (১৪), রোনাল্ডোদের (১৫) পেরিয়ে ধরে ফেললেন মিরোস্লাভ ক্লোজেকে। কাতার বিশ্বকাপ থেকেই কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে মেসির প্রতিযোগিতা চলছে। গত বিশ্বকাপে আট গোল করেছিলেন এমবাপে। মেসি সাতটি। এবার ফ্রান্সের তারকা শুরু করলেন জোড়া গোলে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হ্যাটট্রিক করে পালটা দিলেন মেসি।  
শুধু গোল করাই নয়, সারামাঠে অবাধ বিচরণ করলেন। আর্জেন্টিনার আক্রমণের ছন্দও এনেছেন। কখনও রাইট উইং থেকে ভেতরে ঢুকেছেন, কখনও মাঝমাঠে নেমে বল নিয়েছেন, আবার কখনও ডিফেন্ডারদের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় গিয়ে আক্রমণ তৈরি করেছেন। মেসির সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তিনি খুব দ্রুত প্রতিপক্ষের দুর্বল জায়গা খুঁজে বের করতে পারেন। গোলের মুহূর্তগুলো দেখলেই বোঝা যায়, তিনি ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় ছিলেন।
এমনিতে ম্যাচের আগেই আর্জেন্টিনাকে ফেভারিট ধরা হচ্ছিল। তবে আলজেরিয়াকেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ দলটি যথেষ্ট গোছানো এবং কাউন্টার অ্যাটাকে বিপজ্জনক। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। প্রথম আট মিনিটেই দুই দল গোলের দেখা পেলেও অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। শুরুটা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, আলজেরিয়া সহজে ম্যাচ ছেড়ে দেওয়ার দল নয়। শেষ অবধি মেসি পার্থক্য গড়ে দিলেও আর্জেন্টিনার দলগত ফুটবলের জন্যই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারেনি আলজেরিয়া। 
বিশেষ করে মাঝমাঠে রদ্রিগো দি পল, এনজো ফার্নান্ডেজ এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার দারুণ খেলেছেন। তাঁরাই বলের নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন এবং বারবার মেসির কাছে বল পৌঁছে দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার আক্রমণ গড়ে ওঠার নেপথ্যে এই তিন মিডফিল্ডারের বড় অবদান ছিল। তাঁদের দ্রুত পাস এবং বোঝাপড়ার কারণে আলজেরিয়ার রক্ষণভাগ বারবার চাপে পড়েছে। বলের দখলে আলজেরিয়া খুব একটা পিছিয়ে ছিল না। রক্ষণেও আর্জেন্টিনা ছিল বেশ সংগঠিত। বলা ছাড়াও ডিফেন্স সংগঠন ধরে রেখেছিল। ফলে আলজেরিয়া খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।
দলের প্রয়োজনে লাউতারো মার্তিনেজ কিছুটা নিচে নেমে খেলেছেন, যাতে মেসি এবং থিয়াগো আলমাদার জন্য সামনে জায়াগা তৈরি হয়। তবে দ্বিতীয়ার্ধে জুলিয়ান আলভারেজ, নিকো গঞ্জালেজ, মোলিনারা মাঠে নামার পর আর্জেন্টিনার আক্রমণে আরও গতি আসে। কোচ লিওনেল স্কালোনিরও ম্যাচ রিডিংয়ের প্রশংসা করতে হবে। খেলার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে, আলজেরিয়াকে রুখে দিয়েছে তাঁর মস্তিষ্ক। পরের ম্যাচে শুরু থেকে আলভারেজ খেললে দল আরও উপকৃত হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, এই আর্জেন্টিনা দলটি আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ এবং দলগত ফুটবল খেলছে। আরও ম্যাচ খেলুক। নকআউটে যাক, তারপর বোঝা যাবে— এই দলটা কতটা ভালো!

 

Comments :0

Login to leave a comment