গল্প — নতুনপাতা
পুচু
সৌরীশ মিশ্র
ছোট্ট বুবুন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে ওর মায়ের সাথে। বুবুনের পিঠে স্কুল-ব্যাগ। সে এখন ওর ওয়াটার-বটলটা থেকে জল খেতে খেতে যাচ্ছে। পাশে পাশে চলেছেন ওর মা। রাস্তার একবার এদিকে, একবার ওদিকে তাকাতে তাকাতে চলেছে বুবুন। এইবার ওদের পাড়ায় ঢুকবে ওরা। হঠাৎই একটা দৃশ্য চোখে পড়তেই বুবুন এতোই অবাক হল যে থমকেই দাঁড়িয়ে পড়ল সে।
ওদের পাড়ার ঠিক মোড়ে যে বিশাল উঁচু কৃষ্ণচূড়া গাছটা আছে, ওটার উপরের একটা মোটা ডালে জড়সড় হয়ে বসে আছে ওদের পাড়ায় যে ধবধবে সাদা বিড়ালটা থাকে, যেটার নাম পুচু, সেইটা! বিড়ালকে গাছে উঠে বসে থাকতে ওর দশ বছরের এই ছোট্ট জীবনে কক্ষনো আগে দেখেনি বুবুন। এই প্রথম। তাই তার অবাক হওয়াই স্বাভাবিক।
বুবুন সাথে এও লক্ষ্য করল, গাছটার ঠিক নিচটায় একটা কুচকুচে কালো রঙের বড় নেড়ি কুকুর বসে আছে। আর সেটা একটু সময় বাদে বাদেই মুখ উঁচিয়ে পুচুর দিকে তাকিয়ে মুখে গর্ গর্ শব্দ করে পুচুকে ভয় দেখাচ্ছে খুব।
ততক্ষণে ব্যাপারটা চোখে পড়েছে বুবুনের মা-রও। তিনি স্বগতোক্তি করলেন, "নির্ঘাত এই কুকুরটার তাড়া খেয়ে, আমাদের পুচুটা ভয়ের চোটে কৃষ্ণচূড়াগাছটায় উঠে বসে আছে। আর নামতে পাচ্ছে না।" এরপর, একটুখানি কি যেন ভাবলেন তিনি। তারপর বুবুনকে বললেন, "বুবুন, তুই একটু দূরে সড়ে দাঁড়া তো চটপট।"
বুবুন সাথে সাথেই সড়ে দাঁড়াল একটু খানিক দূরে। আর, ছেলে সড়ে গেছে দেখে, বুবুনের মা এবার কুকুরটাকে "হ্যাট্ হ্যাট্" করে জোড় একটা তাড়া লাগালেন।
বুবুনের মা-র কাছে আচমকা তাড়া খেয়ে কুকুরটা ছুটে পালালো ভয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ওখান থেকে।
বুবুনের মা এবার পুচুর দিকে তাকিয়ে বললেন, "এবার নেমে আয় পুচু। আর ভয় নেই।"
পুচু ছিল যেন এই অপেক্ষাটাতেই। কে কখন এসে কুকুরটাকে তাড়িয়ে তাকে রেসকিউ করবে এই বিপদ থেকে। সে এতোক্ষন বসে ছিল যে ডালটায়, এবার ওটাতেই সাবধানে উঠে দাঁড়াল। তারপর ধীরে ধীরে চার পায়ে আঁকড়ে ধরে ধরে নামতে থাকল পুচু গুড়ি বেয়ে বেয়ে উঁচু গাছটা থেকে। বুবুন প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখতে থাকল সেই দৃশ্য।
কিছুটা নামার পর যখন মাটির কাছাকাছি প্রায় এসে গেছে পুচু, এক লাফ দিল সেখান থেকেই সে মাটিতে। আর নেমেই, পায়ে-পায়ে সোজা চলে এলো বুবুনের মায়ের কাছে পুচু। তারপর, ওর গা-টা ও ঘসতে থাকল বুবুনের মায়ের দু'পায়ে। বুবুনের মা-কে যে ভালোই চেনে পুচু। প্রতিদিনই যে বুবুনের মা খেতে দেন পুচুকে।
বুবুন-ও ততক্ষণে চলে এসেছে ওর মায়ের কাছে। ও পুচুর গায়ে হাত বুলিয়ে একটু আদর করে দিল।
"বুবুন, চল্ এবার। দেরী হয়ে গেল।" বলেন বুবুনের মা।
ছেলেকে নিয়ে বুবুনের মা পা বাড়ান বাড়ির দিকে।
বুবুন কয়েক পা এগিয়ে ফের ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় পিছনে, পুচু এখন কি করছে তা দেখতে। সে দেখল, পুচু এরই মধ্যে উঠে বসেছে কৃষ্ণচূড়াগাছটার ঠিক সামনে পলাশকাকুদের বাড়ির নীল বর্ডার দেওয়া সাদা রঙের বাউন্ডারি-ওয়ালটায়। আর সেখানে বসে, পুচু নিশ্চিন্তে চেটে চেটে ওর গা পরিস্কার করে চলেছে এক মনে।
Comments :0