To Save Constitution

এখন সংবিধান বাঁচানোর লড়াই

উত্তর সম্পাদকীয়​

শান্তনু চক্রবর্তী
ঘটনাগুলো ঘটেই চলেছে! কেউ থামাচ্ছে না! থামাতে চাইছে না! বরং উসকে দিচ্ছে! ঘটনাগুলো তাই ঘটবেই! ঘটে চলবেই! কারণ প্রতিটা আক্রমণ, আক্রান্তের শরীরে প্রতিটা আঘাত, সেই আঘাতের ক্ষত থেকে ঝড়ে পড়া প্রতিটা রক্তবিন্দু, আসলে দেশজোড়া একটাই ঘৃণার প্রকল্পে আরও দুটো ইট জোগায়। গোটা দেশের বাতাসে বিদ্বেষ-বিষ রাজধানীর দূষণ-সূচকের চেয়েও আর একটু বেশি ভারী হয়। এই সনাতন ভারতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-যাপনের নাগরিক হিসাবের খাতাটা হাতে নিলেই দেখা যাবে, সেখানে ‘রক্ত-খরচ’ বেড়েই চলেছে। বেশি পেছোতে হবে না, সদ্য ফেলে আসা বছরের ডিসেম্বরের হিসেবটুকু দেখলেই হবে। এই বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার পরিযায়ী শ্রমিক মূলত বাংলাদেশি সন্দেহে গণপ্রহারে খুন হয়ে গেছেন, পাশের রাজ্য ওডিশার সম্বলপুরে। আবার ওডিশার এমনই এক পরিযায়ী শ্রমিক তামিলনাড়ুর এক রেল স্টেশনে স্থানীয় কিছু মাদকাসক্ত নাবালক কিশোর-তরুণদের হাতে আক্রান্ত হলেন। কাস্তের আঘাতে জখম হলেন মারাত্মক। পুরুলিয়ার ৮ জন পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করতেন ছত্তিশগড়ের এক বেকারি কারখানায়। মজুরি চাইতে গেলে, সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ মা‍লিক, স্থানীয় বজরঙ দলের  গুন্ডাদের লেলিয়ে দেন। মালিকের ভাড়াটে গুন্ডাদের ভূমিকায় সনাতন ধর্মের এই নিষ্ঠাবান রক্ষকরা বাংলাদেশি তকমা দিয়ে এই শ্রমিকদের ধরে পেটায়। মজুরির বদলে মার খেয়ে শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে তাদের গ্রামে ফিরতে হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশি সন্দেহেই আক্রান্ত ও নিহত হয়ে গেলেন কেরলে। সেখানকার বাম সরকারের পুলিশ-প্রশাসন তৎপরতার সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত উগ্র হিন্দত্ববাদী সংগঠনের দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসাবেই তা রয়েছে। কিন্তু ঘৃণা আর হিংসা রক্ত আর হননের বৃত্তটা এভাবেই যেন সম্পূর্ণ হচ্ছে দেশজুড়ে।
কিংবা হয়তো আদৌ হয় না। বরং দেশজুড়ে এই বিদ্বেষ আর বিভাজনের বিষ বৃত্তটা ক্রমশ বড়ই হতে থাকে। আমরা ছত্তিশগড়ে মজুরি চাইতে গিয়ে বাঙালি বেকার শ্রমিকদের ধর্মের জন্য,  মাতৃভাষা বলার জন্য নিগৃহীত হতে দেখেছি। তার দিন কয়েকের মধ্যেই এই  বাংলারই আরেক প্রান্তিক জেলার এক সংখ্যালঘু  নির্মাণ শ্রমিক, মহারাষ্ট্রের পুনেতে সেই মজুরি চাইতে গিয়েই একইভাবে মালিকের পোষা ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর হাতে মার খেয়ে মারা যান। স্থানীয় সিপিআই (এম) নেতৃত্ব ও মহারাষ্ট্রে বাম শ্রমিক সংগঠনের  উদ্যোগে- চেষ্টায় তাঁর মৃত‍‌দেহ গ্রামের বাড়িতে ফেরে। কিন্তু অসুখটা কোথায়? ছত্তিশগড়ের দলিত, ওডিশায় হিন্দু বা বাংলার মালদহ-মুর্শিদাবাদ— দুই দিনাজপুরের মুসলিম বাঙালি ভিন রাজ্যে আক্রান্ত, নিহত হচ্ছেন কেন? গোটা ২০২৫ জুড়ে আমরা দেখেছি, বাঙালি পরিষায়ী শ্রমিক ভারতের নানান প্রান্তে, বিশেষ করে বিজেপি বা এনডিএ শাসিত রাজ্যগুলোতে স্রেফ বাংলাভাষায় কথা বলার জন্য ‘বাংলাদেশি’ বলে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাঁদের  মধ্যে অধিকাংশই সংখ্যালঘু মুসলিম হলেও, বাঙালি হিন্দু শ্রমিকরাও হামলা হেনস্তার হাত থেকে ছাড় পাননি। আর সেই হেনস্তায় শুধু সঙ্ঘ পরিবারের বড়-মাঝারি-খুচরো-লেঠেল-পদাতিক-সেনারা নয়— সরাসরি রাষ্ট্র তার পুলিশ-প্রশাসন নিয়ে  শামিল হয়েছে। মালদহের অন্তঃসত্ত্বা সুনালি বিবির মর্মান্তিক আখ্যান তো আমাদের সবারই জানা। সুনালি বিবিকে রাষ্ট্রের তরফে যে চূড়ান্ত  অসহনীয় অসম্মান সইতে হয়েছে তাঁর মতো আরও বহু শ্রমজীবী নারী ও পুরুষকে যে চরম উদ্বেগ, আশঙ্কা, অপমান আজ নির্যাতনের জীবন কাটাতে হয়েছে এবং হচ্ছে তার পেছনে তো অবশ্যই হিন্দুত্ববাদের অনুপ্রবেশের তত্ত্ব আসে। সেই অনুপ্রবেশের সূত্র ধরেই আসে ভারতের জনবিন্যাস পালটে যাওয়ার তত্ত্ব, আর তার ওপরেই তৈরি করে ফেলা হয়, প্রায় ৮৫ শতাংশ হিন্দু নাগরিকের বাসভূমি ভারতবর্ষে হিন্দু-বিপন্নতার এক কল্প-ন্যারেটিভ।
‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়, আর সেজন্যে দায়ী নাকি পুরুলিয়ার বেকারি শ্রমিক, মালদহের কোনও ফেরিওয়ালা, মুর্শিদাবাদের নির্মাণ শ্রমিক, পশ্চিম বা পূর্ব মেদিনীপুরের সোনার গহনার কারিগর অথবা সুনালি বিবির মতো কেউ,  পুরানো-নোংরা কাগজ-আবর্জনা কুড়িয়ে যাদের পেট  চলে! এঁরা সবাই কোনও না কোনও আঞ্চলিক বাংলা ভাষায় কথা বলেন, যার সঙ্গে তথাকথিত ‘বাংলাদেশি’ কথা-ভাষা এতটুকু স্থানিক বা উচ্চারণগত মিল থাকারই কথা নয়। তবে তার চেয়েও বড় কথা, এঁরা আসলে প্রত্যেকেই  গরিব, নিজের গ্রামে, জেলায়, রাজ্যে কাজ না থাকার জন্যেই পেটের দায়ে পরিযায়ী,  সে জন্যই প্রান্তিক  এবং অনিবার্যভাবেই অসংগঠিত ও প্রবলভাবেই অসহায়-অরক্ষিত-দুর্বল— এককথায় যাকে বলা যায় ‘ভালগদেব্‌ল’! আর স্বাধীনতার ৮০ ছুঁইছুঁই ও সাধারণতন্ত্র হিসাবে ঘোষণার ৭৫ বছর পেরিয়েও আমাদের রাষ্ট্র এই প্রান্তিক মানুষগুলোকে কোনও সুরক্ষা দেওয়া তো দূরের কথা, তাঁদের মূলস্রোত থেকে বহিষ্কার বা বর্জনের ফিকির খুঁজছে। আসলে সংখ্যালঘু, দলিত, কিংবা  নারী এই সবগুলো পরিচিতিই ভারতের শ্রমের বাজারে একই ধরনের প্রান্তিকতার চিহ্ন বহন করে। তাই তাঁদের ঠেলতে ঠেলতে বহিষ্কারের সীমান্তে নিয়ে যাওয়াটা অনেক সহজতর প্রক্রিয়া। সেখানে তাই বাংলার  নিহত মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিক আর ছত্তিশগড়ের দ‍‌লিত-হিন্দু রামনারা নামের  শেষ অবধি কোনও ফারাক থাকে না। নামের সঙ্গে জুড়ে থাকা ‘রাম’ এবং নারায়ণের জোড়া উপস্থিতিও তাঁকে হিন্দুত্ববাদের ঘাতক আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে না। বাংলাভাষায় কথা না  বললেও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর তকমাটা তাঁর গাঁয়ে সেঁটে দিতে কোথাও বাধে না।
আসলে অনুপ্রবেশটা তো স্রেফ বাহানা। শেষ অবধি সংঘাতটা তো সঙ্ঘ পরিবারের কেন্দ্রিকতার ধারণার সঙ্গে বাকি ভারতের ‘প্রান্তিক’ অস্তিত্বের আরএসএস’র এই মহান পরাক্রান্ত সর্বরোগহর ‘কেন্দ্র’র মূলে আছে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের সেই অনড় জগদ্দল ধারণা। নাগপুরে সঙ্ঘ-সদরের খিড়কি-দোর থেকে দিল্লিতে ক্ষমতার সিংহদুয়ার অবধিই এই হিন্দিভাষী, হিন্দুত্ববাদী তথাকথিত ‘হিন্দুস্তানের পরিধি বা খাস’ তা কোনও না কোনোভাবে ‘অপর’-সংশয়ের-সন্দেহের-অবিশ্বাসের  ভূমি। ‘অপরায়ন’ বা আদারাইজেসন-এর এই প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দু-মুসলিম থেকে শুরু করে ছত্তিশগড়ের দলিত-আদিবাসী, কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে। কারণ নাগপুরের চিন্তা-চেতনা-সংস্কৃতির মাপকাঠিতে গো বলয়ের নির্ধারিত ডিজাইনড ভারতবর্ষের বাইরে আর সবটাই সন্দেহজনক ও সম্ভাব্য দেশ-বিরোধী বা তথাকথিত ‘অ্যান্টি ন্যাশনাল’। এভাবেই অপরায়ন-এর বৃত্তটা ক্রমশ বড় হতে হতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তাই বিজেপি শাসিত ত্রিপুরার তরুণ ছাত্র অ্যাঞ্জেল চাকমা আর তাঁর দাদা মাইকেলকে আর একটি ডাবল ইঞ্জিন সরকার চালিত রাজ্য উত্তরাখণ্ডের দেহরাদুনের বাজারে, তাঁদের চেহারার কারণে জাতি-বর্ণবিদ্বেষী টীকা টিপ্পুনির মুখোমুখি পড়তে হয়। ম্যানেজমেন্ট পড়ুয়া বছর পঁচিশেক বয়েসের অ্যাঞ্জেল প্রাণপণে সেই ভিড়কে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তিনিও তাদের মতই ভারতীয় নাগরিক, চীন দেশ থেকে আসা কোনও বহিরাগত বিদেশি নন। 
কিন্তু হিন্দি-হৃদয়পুরের গর্বিত রাষ্ট্রবাদী হিন্দুবীরেরা চিরকালই উত্তর-পূর্ব ভারতের মঙ্গোললিয়ন চেহারার মানুষদের স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে ‘চিঞ্চি’ বা চীনা বলেই সম্বোধন করতে অভ্যস্ত। এক দেশ, এক জাতি’-র সাধনায় মগ্ন জাতীয় মূল স্রোত থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দূরে রাখাটাই তো দস্তুর। ত্রিপুরার চাকমা উপজাতীয় তরুণ অ্যাঞ্জেল তাই তার হত্যাকারীদের কিছুতেই বোঝাতে পারেননি যে তিনিও ভারতীয়। তাঁর বাবা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের জওয়ান হিসাবে সেই ভারতের সীমান্তকেই সুরক্ষা দিয়ে থাকেন। তাঁর ঘাতকরা তার পরেও ছুরি আর মুষ্ঠিযোদ্ধার ধাতব আংটির আঘাতে অ্যাঞ্জেলকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। গুরুতর আহত যুবক হাসপাতালে দিন পনেরো লড়াইয়ের পর গত ডিসেম্বরের শে‍‌ষে মারা যান। আর ত্রিপুরার ডবল ইঞ্জিন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বাড়ি পৌঁছাতে সময় লেগে গেছে আরও তিন সপ্তাহ। বিজেপি’র নেতা-মন্ত্রীদের তরফে এমন অসংবেদনশীলতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু ঘটনা হলো নতুন বছরেও এই মৃত্যুমিছিল রক্ত-খরচ আমাদের দেখেই যেতে হচ্ছে। উত্তর-পূর্বের ছেলে যেমন উত্তর ভারত থেকে লাশ হয়ে ফিরছে, উত্তরবঙ্গের কোচবিহারের শিতলকুচির যুবক হিমঙ্কর পাল গণপ্রহারে খুন হয়ে যাচ্ছেন উত্তর-পূর্বের বিজেপি শাসিত রাজ্য আসামে। সেই আসাম, যেখানকার মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, মোদী-যোগীর পর সঙ্ঘ প্রাণিত হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যতন্ত্রের নবতম ‘পোস্টার বয়’ হয়ে ওঠার সাধনায় নিবেদিত আর যথেষ্ট ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী’ না হওয়ার কারণে যিনি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেই তাঁর রাজ্য সীমায় প্রায় নিষিদ্ধ ঘোষণার ফতোয়া দিয়ে দিতে পারেন।
বোড়োল্যান্ড অঞ্চলে সামান্য পথ দুর্ঘটনার সূত্র ধরে দুই আদিবাসী গোষ্ঠী বোড়ো ও সাঁওতালদের মধ্যে জাতিদাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। আর সবটা মিলিয়ে ক্রমশ এটাই প্রমাণ হয়ে যায়, গত ১১ বছরে মোদী-শাহর হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পবিত্র প্রয়াসের এই অমৃতকালে সবচেয়ে বেশি বিপন্নতা বা খতড়ে মে’ কেউ যদি থেকে থাকে সেটা আমাদের সংবিধান। ৭৫ বছর পেরিয়ে আসা আমাদের বৃদ্ধ প্রজাতন্ত্র, তার নাগরিকদের স্বাধীন জীবিকা, উপার্জন, শিক্ষা, জীবন-যাপন, এমন কি জীবনধারণ বা শুধু বেঁচে থাকার সুরক্ষা নিরাপত্তাটুকুও দিতে পারছে না। প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার চোখের সামনে কিংবা সেই ব্যবস্থার পরোক্ষ প্রশ্রয়, মদত, উসকানি কিংবা প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে পরিযায়ী শ্রমিক, কৃষি-মজুর, ছাত্রদের গণতান্ত্রিক, নাগরিক, মৌলিক অধিকার প্রতিদিন লুণ্ঠিত, ধর্ষিত, নিহত হচ্ছে। শুধু ভাষা, ধর্ম, জন্ম বা জাতিগত বৈশিষ্ট্যের জন্য এক রাজ্যের মানুষ অন্য রাজ্যে গিয়ে হুমকি, হেনস্তা, হামলার শিকার হচ্ছেন। বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের মৃতদেহ ফিরছে রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, দিল্লি, ওডিশা কিংবা ঝাড়খণ্ড থেকে। সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে, ধর্ম, জাতি, বর্ণ বা জন্মের ভিত্তিতে কোনও বৈষম্য করা যাবে না। অনুচ্ছেদ ১৯(১)(ছ)-এ স্পষ্ট করে লেখা আছে ভারতের যে কোনও নাগরিকের দেশের যে কোনও জায়গায় চাকরি, ব্যবসা বা জী‍‌বিকা অর্জনের জন্য যে কোনও কাজ করার অধিকার ও স্বাধীনতা আছে। ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নাগরিকের এই অধিকারগুলো যাতে সুরক্ষিত থাকে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অনুচ্ছেদ ২১ যা নাগরিকের ‘জীবনের অধিকার’-এর কথা বলে তার ব্যাখ্যায় দেশের শীর্ষ আদালত জানিয়েছে জীবনের অধিকার, জীবিকার অধিকার, জীবন নির্বাহের জন্য যেটা প্রয়োজন— আর সেটাকে সুরক্ষিত করার দায় কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারে না।
কিন্তু কেন্দ্রের ও বিভিন্ন রাজ্যের হিন্দুত্ববাদী সরকার, এমন কী বিরোধী শাসিত একাধিক রাজ্যেও সঙ্ঘের পারিবারিক শাখা সংগঠনগুলো সংবিধানের এই অনুচ্ছেদগুলোই যেন মুছে দিতে বদ্ধপরিকর। মুসলিম বাঙালি, বৌদ্ধ চাকমা, খ্রিস্টান আদিবাসী যেন ভারতবর্ষের নাগরিকই নন। তাই ইচ্ছে করলেই তাদের জীবিকা, শিক্ষা এমন কি জীবনের অধিকারও কেড়ে নেওয়া যায়। সাংবিধানিক প্রত্যেকটা মৌলিক অধিকদারকে লঙ্ঘন করে। বাংলাভাষী যে কোনও মুসলিম পরিবারকে চাইলেই বেড়াল পাচার করার মতো করে পড়শি দেশের সীমান্তের কাছে ‘নো ম্যান্সস ল্যান্ড’-এ ছেড়ে আসা যায়। পড়শি রাজ্যে কাজ খুঁজতে গিয়ে রাজা আলিদের বে-নাগরিক হওয়া বা না হওয়া, প্রাণ নিয়ে ফেরা বা না ফেরার গ্যারান্টি তাই এখন আর সংবিধান নয়। হন্তারক হামলাকারীরা শুধু ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান বলিয়ে আর ‘হনুমান চাল্লিশা’ পাঠ করিয়েই রেহাই দেবে কিনা, সেটার ওপরে নির্ভর করে। বীরেন্দ্র ব্রহ্মচারীর বাগীস্বরধাম থেকে সাভারকার-গোলওয়ালকর-হেডগেওয়ারদের স্বপ্নের হিন্দুরাষ্ট্রের দূরত্ব এখনও কতদূর আমাদের জানা নেই। তবে মোদী সাম্রাজ্যে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনির এই সংবিধান বহির্ভূত বৈধতা নিশ্চিত হয়ে গেছে। সরকার পোষিত জগন্নাথধাম-দুর্গাঙ্গন-মহাকাল মন্দিরের এই পশ্চিমবঙ্গেও গীতা-পাঠের ব্রিগেডে প্রান্তিক সংখ্যালঘু প্যাটিস বিক্রেতার জীবিকার অধিকার যে সুরক্ষিত নয়, সেটাও প্রমাণ হয়ে গেছে। অন্তত ‘জয় শ্রীরাম’ যাতে সাংবিধানিক অধিকারের ‘স্বদেশি সনাতনি’ বিকল্প হয়ে উঠতে না পারে। সেই লড়াইটাই জোরদার করতে হবে এখনি।

 

Comments :0

Login to leave a comment